ঢাকা, বুধবার 8 February 2017, ২৬ মাঘ ১৪২৩, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নিজ ঘরের জঞ্জাল সাফে হিমশিম খাচ্ছে দুদক

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করার প্রায় এক যুগ অতিক্রম করার পরও নিজ ঘরের জঞ্জাল সাফে হিমশিম খাচ্ছে দুর্নীতি বিরোধী রাষ্ট্রীয় একমাত্র প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) । নিজ ঘরের জঞ্জাল সাফে যে দুদককে প্রতিটি কর্মদিবসে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে , সেই দুদকই সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, জনবল নিয়োগ, প্রকল্প গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির ধূসর এলাকা (গ্রে এরিয়া) খুঁজতে শুরু করেছে। তার সাথে উনিশটি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে বিভিন্ন সরকারি দফতরের ওপর কঠোর নজরদারিও চলছে দুদকের। ফলে নির্দিষ্ট জনবল দিয়ে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পাল্লা দিতে গিয়ে দুদকই যেন হাঁফিয়ে উঠছে । কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝেও লেজেগোবরে অবস্থা। তারা একসাথে সব নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলার অবস্থায় ।

এ দিকে , দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে ‘ঘুষের রেইট’ বেড়ে গেছে বলে নানাজনের কাছে অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। এই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত না হলেও বিষয়টি উদ্বেগের বলে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছেন তিনি।

দুর্নীতি ঠেকাতে বিভিন্ন দপ্তরে সম্প্রতি যে অভিযান শুরু করেছে দুদক; গতকালও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা ঘুষের অর্থসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন।

ইকবাল মাহমুদ জানান, “গত এক বছরে কমিশনের অভিযানে চার থেকে পাঁচশ লোক ধরা হয়েছে। তাদেরকে কোর্টে প্রেরণ করে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। “কিন্তু এই অভিযানের ফলে দেখা গেল, আমাকে অনেকেই বলেছে যে, আপনি ড্রাইভ দিচ্ছেন ভালো, কিন্তু এতে রেইট বেড়ে গেছে। যারা দুর্নীতি করছে, তাদের এখন বক্তব্য হচ্ছে, ভাই এখন চারদিকে দুদক, ঝামেলা, ১০ টাকার জায়গায় আপনি এক হাজার টাকা দিবেন। এটা আমার কানে এসেছে।” “এটা সত্য না মিথ্যা তা যাচাই করার দায়িত্ব আমার না, তবে কানে যেহেতু এসেছে তা উদ্বেগের বিষয়,” বলেন দুদক চেয়ারম্যান।

দুদকের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায় , দেশের বিভিন্ন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে দুদকের অনেক নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমনে বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে এখন। প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে, অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় দেশের বড় দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সব অর্জনই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুর্নীতির কারণে। মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না যে, দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে। আমরা সেই রকম কাজ করতে পারিনি বলেই এই বিশ্বাসহীনতা, এটা স্বীকার করতে আমার লজ্জা নেই, এটাই সত্য।’

অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়, প্রকৃত অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে চার্জশিটভুক্ত করা, ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি করা, চেক জালিয়াতি, অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, দুদকের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণার পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও ফেনসিডিলসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতারসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অন্তত শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছে।

এরই মধ্যে কিছু কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে বাধ্যতামূলক অবসর পাঠানো হয়েছে বা কাউকে পদ-অবনমন করা হয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণের দায়ে বিগত ৬ থেকে ৭ বছরে দুদক দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। বর্তমানে ১৫ জনের বিভাগীয় মামলা চলমান । আর প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি দুদকের অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতিতে অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন- প্রতিরোধ ও গণসচেতনতা বিভাগের উপপরিচালক সামিউল মাসুদ ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী পরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত দিনে প্রশাসন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতিসহ নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছেন। এসব অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ অফিসিয়াল নথিপত্রে রয়েছে। এই অবৈধ কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা অবসরে গেছেন। এর মধ্যে সদ্য অবসরে যাওয়া দুদক মহারিচালক (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামানেরও নাম রয়েছে।

অনুসন্ধান চলছে দুদকের চট্টগ্রামের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ আহমেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঠিকাদারের যোগসাজশে ভুয়া বিল ভাউচার, মাস্টার রোল ও কোটেশনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সিআরপিএআর প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে কোটি টাকা উৎকোচ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দুদক পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ওই অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন।

ভয় দেখিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নির্মাণ সমাগ্রী নিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চট্টগ্রামের উপসহকারী পরিচালক রইস উদ্দিনের বিরুদ্ধে চলছে আরো একটি অভিযোগ। দুদক উপপরিচালক মো. মফিদুল ইসলাম ওই অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন।

দুর্নীতির দায়ে এর আগে উপপরিচালক শফিকুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে উপপরিচালক আহসান আলীকে। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা ও জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সহকারী পরিদর্শক হাফিজুল ইসলামকে অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত করা হয়, উপপরিচালক ঢালি আবদুস সামাদকে।

ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ে উপপরিচালক রামমোহন নাথ, উপপরিচালক এস এম শাহিদুর রহমান ও কোর্ট সহকারী ওবায়দুল্লাহ খালেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

এ ছাড়া দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ছয় কর্মচারীকে। তারা হলেন- সহকারী পরিচালক সাঈফ মাহমুদ, সহকারী পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান, মো. কামরুজ্জামান, কনস্টেবল জামিল মোহাম্মদ খান ও ফারুক আহমেদ।

দুর্নীতির দায়ে চাকরি থেকে অপসৃত নয় কর্মচারী হলেন- ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর আবদুর রহমান, কনস্টেবল ফরহাদ হোসেন, এস এম গোলাম কিবরিয়া, আবু বকর সিদ্দিক, আবদুল মোতালিব মিয়া, গোলাম রব্বানী, আলমগীর হোসেন, অমিত কুমার দাস ও গাড়িচালক গোলজার হোসেন ভূঁইয়া।

অভিযুক্তদের কারো কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে। এর মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক খন্দকার আখেরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার প্রকৃত অপরাধীকে অর্থের বিনিময়ে কৌশলে ছেড়ে দিয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তিকে চার্জশিটভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।

মানি-লন্ডারিংয়ে অভিযুক্ত আসামীকে ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালক শাব্বির হাসানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক কে এম মিছবাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে বদলি আদেশ বাতিলের জন্য বেসরকারি খাতের ব্যক্তির মাধ্যমে কমিশনে তদবির করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের তদন্ত চলছে।

ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবু ইউসুফ শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতির অভিযোগে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন । অভিযোগ-সংক্রান্ত ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরির অভিযোগ রয়েছে প্রধান কার্যালয়ের কনস্টেবল খসরু জাহানের বিরুদ্ধে। দুদকের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে প্রধান কার্যালয়ের কনস্টেবল আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে কমপ্লেইন রেজিস্টার (সিআর) মামলা করা হয়েছে। ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার হওয়ায় ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে পটুয়াখালী জেলা কার্যালয়ের কনস্টেবল ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে। এক ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রধান কার্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী হায়দার হোসেনের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগটির তদন্ত চলমান।

দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে বলেন, 'দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে মনিটরিং ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিন্দুমাত্র অনুকম্পা দেখানো হবে না।’

সরকারি দফতরে দুদকের নজরদারি

উনিশটি বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে বিভিন্ন সরকারি দফতরের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে দুদক। ফলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিহ্নিত ঘুষ খোর ও দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়েছে।

দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ১১ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন, ঘুষখোর আর দুর্নীতিবাজদের জন্য এক আতঙ্কের বছর হবে ২০১৭ সাল। এরপরই ২৩ জানুয়ারি দুদকের ৮ পরিচালকের নেতৃত্বে সরকারি বিভিন্ন দফতরের কার্যক্রম নজরদারির জন্য ১৯টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করা হয়। এরমধ্যে ৫ পরিচালকেই ৩টি করে প্রাতিষ্ঠানিক টিমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া এক পরিচালকে ২টি টিম এবং অপর ২ পরিচালকের নেতৃত্বে রয়েছে ১টি করে প্রাতিষ্ঠানিক টিম। এছাড়াও প্রত্যেক টিমে রয়েছে একজন পরিচালক একজন উপ-পরিচালক ও একজন সহকারী পরিচালক।

টিমের দায়িত্ব বণ্টনে দেখা যায়, পরিচালক একেএম জায়েদ হোসেন খানের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো হচ্ছে, তিতাস গ্যাস, রেলপথ বিভাগ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ( পোর্ট অর্থরিটি)। পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো, সিভিল এভিয়েশন অর্থরিটি অব বাংলাদেশ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও পরিবেশ অধিদফতর। পরিচালক মীর মো.জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো হচ্ছে, কাস্টমস, ভ্যাট অ্যান্ড এক্সাইজ,আয়কর বিভাগ, স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষ (দেশের সব স্থল বন্দর)। পরিচালক মো. বেল্লাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো হচ্ছে, ওয়াসা,মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর,ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। পরিচালক শফিউল আলমের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, গণপূর্ত অধিদফতর, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সাব-রেজিস্ট্রার কমপ্লেক্স ঢাকা ( দেশের সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিস), ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এল এ) ও রাজস্ব শাখা (এসএ)।

পরিচালক মনজুর আহম্মদের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানিগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। পরিচালক মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানি হচ্ছে, মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (এজি)। এছাড়াও দুদকের আট পরিচালকের নেতৃত্বে আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, লোপাট, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান রয়েছে। এরমধ্যে দুদক পরিচালক মীর মো.জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে রাজধানীতে সরকারি ও বেসরকারি স্বনামধন্য ১৫টি স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্যসহ নানা হয়রানির অভিযোগের অনুসন্ধান এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। দুদকের এ বিশেষ টিমের কাজ হচ্ছে সরকারি দফতরে জনবল নিয়োগে অনিয়ম, ক্রয়-বিক্রয়, সংস্কার, নির্মাণের টেন্ডারে অনিয়মসহ লোপাটের তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রতিবেদন দাখিল করা।

এদিকে দুদকের এ ১৯টি টিমের সদস্য ইতোমধ্যে নির্ধারিত দফতরের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। অনেকে আবার ওইসব দফতরের কার্যক্রমের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাফতরিক রেকর্ডপত্রও চাচ্ছেন।

সরকারি দফতরে দুদকের বিশেষ টিমের পদচারণায় রীতিমতো আতঙ্ক শুরু হয়েছে। দুদক টিমের সদস্যদের উপস্থিতিকে অনেকেই অভিযান মনে করছেন।

তবে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা উপ পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, দুদক টিমের সদস্যদের সরকারি দফতরে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য যাওয়াকে অভিযান বলা যাবে না। এটা অভিযান না, এতে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। তিনি বলেন, দুদক টিমের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি দফতরগুলোতে দুর্নীতির উৎস ও কারণসমূহ চিহ্নিত করা। দুর্নীতি বন্ধে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে সুপারিশমালা প্রণয়ন করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অনুসন্ধানের সুপারিশ করা।

দুর্নীতির ধূসর এলাকা খোঁজা শুরু

সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, জনবল নিয়োগ, প্রকল্প গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির ধূসর এলাকা (গ্রে এরিয়া) খোঁজা শুরু করেছে দুদক। এজন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সরকারি ক্রয়, জনবল নিয়োগ এবং প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রকোপ থাকায় এসব বিষয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রো-এ্যাকটিভ মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন দফতরগুলোর আওতাধীন দুর্নীতির ধূসর এলাকা (যদি থাকে) শনাক্ত করে দুর্নীতি দমন কর্মসূচির আওতাভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।

গত ১৭ জানুয়ারি এ চিঠি দেওয়া হয়। তার আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ সফিউল আলমের কাছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতির ধূসর এলাকা খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।

পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একটি সুত্র জানায়, গত ৩০ জানুয়ারি দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রো-এ্যাকটিভ মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিকল্পনা বিভাগের সমন্বয় শাখা থেকে সবগুলো সংস্থকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় যেসব সংস্থায় চিঠি দেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক, পরিকল্পনা কমিশনের সব বিভাগের প্রধান, পরিকল্পনা বিভাগের যুগ্ম-সচিব, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং পরিকল্পনা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিবকে।

সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বর দেওয়া এক চিঠিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি। জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রতিবন্ধক। ফলে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছেনি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারলে দেশের জিডিপি প্রতিবছরে প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ কারণে বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমনে বদ্ধপরিকর। রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের পর্যায়ে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কর্মসূচি ও নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি ওই চিঠিতে আরও বলেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া, জনবল নিয়োগ, প্রকল্প গ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রো-এ্যাকটিভ মনিটরিং-এর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি জানান, দুর্নীতি দমনে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের যে কোন পদক্ষেপে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে। দুদক ও মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রয়াসে দুর্নীতির মূলোৎপাটিত হবে বলে বিশ্বাস করি।

সূত্র জানায়, তার আগে গত বছরের ৩১ অক্টোবর দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একটি চিঠি দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে। সেখানে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ করে বৈষম্য কমিয়ে আনতে দুদকের দুর্নীতি বিরোধী উদ্যোগের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের চলমান ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করা আবশ্যক। তাই মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর ও সংস্থাসমূহকে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ