ঢাকা, শুক্রবার 10 February 2017, ২৮ মাঘ ১৪২৩, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা নিয়ে আর কত খেলা

রবিউল আলম : আজ কিছুদিন যাবৎ ফেসবুক খুললেই বীভৎস ছবি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এটা কি কোনো মানুষের কাজ, এভাবে কি কোনো মানুষ হত্যা করতে পারে? ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল আমার, কিন্তু এই নির্যাতনের ধরন দেখে আমার মনে হয়েছে পাকিস্তানিদেরও হার মানিয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সর্বসাধারণ ধর্মীয় বিষয় যদি বিবেচনা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে তবে, আমাকে বলতেই হবে কেন, আর মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে বলবো তাও ভাবনায় আসে না। মানুষ হিসেবে মিয়ানমারে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। সেই আদি যুগে হিংস্র জানোয়ারদেরও হার মানিয়েছে মিয়ানমারবাসী। অপরাধ প্রতিটি রাষ্ট্রেই হয়ে থাকে, অপরাধের বিভিন্ন ধরন আছে, অপরাধীর বিচার আছে, যে কারণে রাষ্ট্রের একটি সংবিধান আছে, পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থার নির্দেশক জাতিসংঘ আছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা তা দেখারও কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওআইসি এবং আরব দেশসমূহ দাবি করেন তারা মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, কুয়েত, আরব আমিরাতসহ খালেদা জিয়াও সোচ্চারনন কেন? আমার মনে হচ্ছে জেরুজালেমে একটি পটকা ফুটেছিল, এই কারণে ঢাকায় দুইশ’ গাড়ি পোড়ানো হয়েছিল, মিয়ানমারে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গা নাম দিয়ে। কোথাও কিছু হচ্ছে না, শুধু জাতিসংঘ বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দিতে বলেছে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আজ মিয়ানমার সরকার ও জনসাধারণকে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছেন, তার পূর্ব ইতিহাসে যেতে হবে। রোহিঙ্গা কারা, কাদের রোহিঙ্গা নাম দিয়ে মিয়ানমার থেকে আলাদা করতে চাইছেন? ১৯৪২ সাল থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারত, পাকিস্তানের সৈন্যরা তৎকালীন বার্মা বর্তমান মায়ানমারে যান, কালক্রমে সেখানেই থেকে যান। ১৯৪৭ সাল থেকে কাজের সন্ধানে একের পর এক পরিবার-পরিজন নিয়ে রেঙ্গুন ও আসামে গিয়ে উঠেন। তৎকালীন সময় আসাম ও বার্মায় কৃষি কাজে লোক না থাকায় এই বাঙালিদের কদর ছিল আকাশছোঁয়া। জমি নিতে কোনো টাকার প্রয়োজন হতো না। আমার দাদা ১৯৩৭ সালে আসাম যান, সেখানে নিয়ম ছিল যে যত জমি ফসল ফলাতে পারবেন সেই জমির জমিদার পাট্টা দিয়ে দেবেন, আপনি শুধু খাজনা দেবেন আর জমি চাষাবাদ করবেন। দাদা তার ভাই, ভাইপোসহ সবাইকে আসাম আসতে উৎসাহিত করলেন। অনেক জমির মালিক ছিলেন তবুও সব ফেলে ১৯৬৩ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে হয়েছিল। সে অনেক কথা, আজ বার্মা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আমাদের জানামতে, একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল বার্মা, আসাম, কলকাতা। পাকিস্তানে যেতে কোনো পাসপোর্ট ভিসা লাগতো না। তাই কাজের সন্ধানে যে কেউ যেকোনো স্থানে আসা-যাওয়ার কোনো বাধা ছিল না। রেঙ্গুন, ঢাকা, গোহাট্টি, কলকাতার মাঝে কোনো বাধা-বিপত্তি ছিল না। দেশগুলোর স্বাধীনতা না থাকলেও মানুষের স্বাধীনতা ছিল। সেই স্বাধীনতা থেকেই সাধারণ মানুষ বার্মায় বসবাস শুরু করলো। ১৯৪২ সালের জেনারেশন এখন আর বেঁচে নেই, এখন যারা মিয়ানমার বাসিন্দা তারা জন্মসূত্রে মিয়ানমার নাগরিক। মুসলমান হওয়া কি অপরাধ? আমি যতটুকু জানি বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ অহিংস হয়। আমরা আমাদের দেশের বৌদ্ধ ধর্মের মানুষদের অনেক সম্মান দিয়ে থাকি। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি বিজয়ী হলে মিয়ানমারে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, এই নেত্রী গৃহবন্দির প্রতিবাদে বাংলাদেশেও মিছিল হয়েছিল, আজ সেই নেত্রীর মুখ থেকে একটা কথাও বের হচ্ছে না। একদিকে মিয়ানমার, অন্যদিকে তুরস্ক যে কান্ড-কারখানায় মেতে উঠেছে এবং নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন তা কোনো সুস্থ নাগরিক ও দেশ সমর্থন করতে পারে না। জানি না আরাকান রাজ্যে শান্তি আসবে কিনা, তবে এই অশান্তি পুরো মিয়ানমারকে বহন করতে হবে। সামরিক জান্তা গণতন্ত্র হরণ করে যা করেছে, সেই মাসুল মিয়ানমার জনগণকে দিতে হয়েছে, এখনো দিতে হচ্ছে। আশা ছিল গণতন্ত্রের মুক্তির স্বাদ মিয়ানমার জনগণ ভোগ করতে পারবে, পৃথিবীর মুক্ত আলো-বাতাস, শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে, দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে, শেখ হাসিনার কাছ থেকে দেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা নেবে, হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকবে, অং সান সুচির বন্দিত্ব জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে। আমাদের সব আশা-আকাক্সক্ষা গুড়েবালি দিয়ে আজ হত্যাযজ্ঞে মাতোয়ারা হয়ে পড়েছে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও সর্বসাধারণ। তাছাড়া যে দেশকে আমরা বর্বর বলে উপাধি দিয়েছি তুরস্কও বৌদ্ধ নিধন শুরু করেছে, এই প্রতিহিংসার শেষ কোথায়? হত্যাকে হত্যা দিয়ে সমাধান করা যায় না এবং হবেও না। তবে যে বিশ্বসমাজ সভ্যতার দাবিদার তারা কোথায়? পাকিস্তান, ইরান, সৌদী আরব আগের মত সোচ্চার নয় কেন? যারা মানুষের অধিকারের কথা বলেন, মানবাধিকারের কথা বলেন, কিন্তু মিয়ানমার জনগণের জন্য মুসলমানদের জন্য তাদের কোনো কথা নাই, কারো জন্য আশ্রয় নাই, সাহায্য নাই। শুধু বাংলাদেশই পারে আশ্রয় দিতে এবং দিয়েছেও। আমরা ’৭১-এ দেখেছি, ভারতে আশ্রয় নিয়েছি, আমরা মানুষের কষ্ট বুঝি, তাই মানুষকে আশ্রয় দিতে হবে, মানুষকে বাঁচাতে হবে। মিয়ানমারে একদিন শান্তি ফিরে আসবে। এই মানুষগুলোই দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে, মিয়ানমার তাদের ভুল বুঝবে, সেদিন হয়তো আর ফিরে পাবে না। তাই বলে ধ্বংসকারীদের উৎসাহ দেয়া যাবে না। বাংলাদেশীদের জন্ম হয়েছে পরের উপকার করতে, আমরা তাই করবো। তবে অন্যের দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কোনো কথা বলবো না। জাতিসংঘের পাশে থেকে মানুষের জন্য কিছু করতে হবে বাংলাদেশকে। তবে বুঝতে হবে ভিনদেশিদের  নোবেল পুরস্কার কাদের দেয়া হয়। আমাদের দেশেও শান্তির নামে সুদের জন্য দেওয়া হয়েছে ড. ইউনূসকে। এখন নোবেল পুরস্কারের ঠেলায় আজ পৃথিবী দিশাহারা। তাই মিয়নমারের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, রোহিঙ্গা নিয়ে আর কত খেলা খেলবেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ