ঢাকা, শনিবার 11 February 2017, ২৯ মাঘ ১৪২৩, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও চিরচেনা তালগাছ এখন বিলুপ্তির পথে

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার শহরের সাইলো রোড থেকে ছবিটি তোলা

আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা: তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে- তালগাছ সম্পর্কে এমনভাবে আর কে-ই বা ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া? গ্রাম বাংলার অতি চিরচেনা ফল তাল। আকাশ পানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তালগাছ আর গাছে-গাছে ধরা তালফল ও বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা কত না মনোহর এবং পাখির কলতান কার না ভালো লাগে। তালের আদি নিবাস আফ্রিকা হলেও বাংলাদেশের সব স্থানে ছোট-বড় কম-বেশি তালগাছ এখনও চোখে পড়ে। এমন এক অকৃত্রিম দৃশ্য সত্যিই মানুষের মন ভোলানো দৃশ্য বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার সাইলো রোড। এমন মাটি ও গাছ-পালার দৃশ্য দেখলে সকলের হৃদয়কে নাড়া দেবেই। মনোমুগ্ধকর তালগাছের এমন দৃশ্য দেখে খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিনের সেই কবিতার কথায় মনে করিয়ে দেয়- ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ ঐ আমাদের গাঁ, ঐখানেতে বাস করে কানা বগীর ছা।’ 

তালের চারা রোপণ করে তা থেকে ফল ও সারবান কাঠ আমাদের সব সময় কাজে লাগে। বর্তমানে এ গাছটির চাষ করতে অনেকেরই এখন অনীহা দেখা যায়। তবে এ ব্যাপারে প্রতি বছরই সরকারিভাবে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি পালন করা হলেও নিজ উদ্যোগে এখন আর কেউ তালগাছের চারা রোপণ করতে চায় না। প্রতিবছর বৃক্ষ রোপণ মওসুমে অন্যান্য বৃক্ষচারার সাথে যদি তালগাছের বীজ/চারা বেশি বেশি করে সকলে মিলে রোপণ করা যায় আর নির্বিচারে যদি তালগাছ নিধন না করা হয় তাহলে আমাদের এ দেশে আবারও উপকারী ফল তালগাছ ফিরে পাবে হারানো ঐতিহ্য। তার সাথে নিশ্চিত হবে আগামীর খাদ্য পুষ্টি, অর্থ ও সমৃদ্ধি। এই তাল বৃক্ষটি তার শিশুকাল থেকেই এর রোপণ ও পরিচর্যাকারীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে থাকে।

তালফল ও তালগাছের বহুবিধ ব্যবহার ও পুষ্টি গুণাগুণ বিবেচনায় দেশীয় ফলের মাঝে তালের অবদান শীর্ষে। অজ্ঞতা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজের চাহিদার কারণে দিন দিন যেভাবে তালগাছ নিধন করা হচ্ছে এতে প্রকৃতি পরিবেশ হারাচ্ছে তার অপরূপ সৌন্দর্য। নয়নাভিরাম সারি সারি তালগাছ, গাছে গাছে তাল ফল ও তালগাছে বাবুই পাখির বাসা আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। শুধু এতেই শেষ না, পাখিদের নিরাপদ নিবিড় আবাস গড়বে তালগাছের নিবিড় বনায়ন। তালগাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তার জন্যই তো কারিগরি বাবুই পাখিরা এতসব গাছ থাকতে একমাত্র তালগাছকেই বেছে নিয়েছে বসবাসের নিরাপদ স্থান হিসেবে। 

গুচ্ছ মূলী বৃহৎ অশাখ বৃক্ষ তালগাছের গোড়ার দিক মোটা, উপরের অংশ তুলনামূলক চিকন, কাণ্ডের মাথায় বোঁটা ও পাতা গুচ্ছভাবে সাজানো থাকে ও বোঁটার দু’ধারে করাতের মতো দাঁত আছে, বোঁটা শক্ত ও খুব পুরু। গাছ উচ্চতায় ২০ থেকে ২৫ মিটার হয়ে থাকে এবং দীর্ঘজীবী উদ্ভিদের মাঝে অন্যতম হচ্ছে তালগাছ। ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তুলনামূলকভাবে রোগ বালাইও কম। তালগাছ পুরুষ ও স্ত্রী উভয় লিঙ্গ গাছ, একই গাছে দু’রকম ফুল ফোটে না। পুরুষ গাছে ফুল হয়, ফল হয় না, ফুল জটা নামে পরিচিত। মঞ্জুরির রঙ হলুদ, লম্বা আকৃতির, বসন্তে গাছে ফুল ধরে। পুরুষ তালগাছের রেণু বাতাসে ভেসে অনেকদূর পথ পাড়ি দিয়ে পরাগায়ন ঘটাতে সক্ষম। পুরুষ ও স্ত্রী ফুলের সঠিক পরাগায়নে সৃষ্টি হয় তালের। তালগাছের বৃদ্ধি ধীরগতি সম্পন্ন, বীজ রোপণের ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সে গাছে ফল ধরে।

গাছ প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত ফল ধরে থাকে, তবে এর পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। গাছে কাঁদিতে ফল ধরে, একটি গাছে অনেকগুলো কাঁদি ধরে, ফলের আকার গোলাকার চ্যাপ্টা, প্রতি ফলের গড় ওজন ১ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়, ফলের রঙ প্রথমে হলদে সবুজ, পরিপক্ক ফলের রঙ হলুদ, খয়েরী কালো রঙের হয়। তাল ফলে এক থেকে দু’টি বা তিনটি আঁটির ফল ধরতে দেখা যায়। ফল পাকে ভাদ্র মাসে, তবে কোনো কোনো গাছে বছরের অন্য সময় ফল ধরতে দেখা যায়। পাকা ফলের ঘ্রাণ তিব্র সুগন্ধযুক্ত, স্বাদে মিষ্টি থেকে পানসে মিষ্টি হয়। গাছে পাকা তাল আপনা আপনি ঝরে পড়ে। এ যাবৎ পর্যন্ত তালের কোনো অনুমোদিত জাত নেই, সব জাত স্থানীয়, তবে আকার-আকৃতি স্বাদ-গন্ধ বিবেচনায় উত্তম, মাধ্যম ও নি¤œমানের হয়। আমাদের দেশের সব জেলায় কম-বেশি তালগাছ জন্মে তবে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে ভালো তাল উৎপাদন হয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতে তালগাছ জন্মে। সহজ রোপণ পদ্ধতি, কষ্টসহিষ্ণু, কম যতেœ উৎপাদন ও বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ বেড়িবাঁধ, রেল লাইন, পুকুর পাড়, খালের পাড়, নদীর পাড়, জমির আইল, পতিত জমি ও বসতবাড়ির শেষ সীমানায় তালগাছ রোপণ উপযোগী স্থান। 

উল্লেখ্য, গভীর মূলী ও শাখা-প্রশাখা নেই বলে জমির আইলে রোপণে খাদ্য পুষ্টির প্রতিযোগিতা ও ছায়া দিয়ে ফসলের ক্ষতি করে না। তালের পাতা দিয়ে হাত পাখা, মাদুর, টুপি, ঘরের ছাউনী, চাটাই, ছাতা, লাকড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তালগাছের ফাইবার বা আঁশ থেকে বিভিন্ন রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়, যথা- টুপি, ঝুড়ি,  ব্রাশ পাপোষ, ছোট বাস্কেট, ও মাছ ধরার খলশানীতে ব্যবহৃত হয়। পুরুষ গাছের ফুল বা জটা হতে রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড়, পাটালি, ভিনেগার, পিঠা, বড়া, লুচি, ইত্যাদি তৈরি করা হয়। পাকা তালের রস দিয়ে পিঠা, বড়া, খির, পায়েস তৈরি করা হয়। কচি ও কাঁচা তালের নরম শাঁস মুখরোচক পুষ্টিকর খাবার। এছাড়া গ্রীষ্মের তৃষ্ণা নিবারণে কাজ করে। তালগাছের গোড়ার অংশ দিয়ে ডিঙ্গি নৌকা তৈরি, শক্ত ও মজবুত বলে ঘরের খুঁটি, আড়া, রুয়া, বাটাম, কৃষকের লাঙ্গলের ঈষ তৈরি করা হয়। গাছ শক্ত মজবুত গভীর মূলী বলে ঝড় তুফান, টর্নেডোর বাতাস প্রতিরোধ ও মাটি ক্ষয়রোধে তালের গাছের ভূমিকা অতুলনীয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ