ঢাকা, সোমবার 13 February 2017, ০১ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সমীক্ষা সম্ভাবনায় নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ

মো. আবুল হাসান/খন রঞ্জন রায় : আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিম-লে ‘রোল মডেল’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পারকিনসন ও নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফালান্ড বাংলাদেশকে উন্নয়নের পরীক্ষাগার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমীক্ষায় বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ‘নেক্সট ইলেভেন’ সম্মিলিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। লন্ডনের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা লিখেছে, ২০৫০ সালে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। বিশ্বের নামকরা রেটিং বিশেষজ্ঞ সংস্থা মুভিস ও স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশকে সন্তোষজনক অর্থনৈতিক রেটিং দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনের দি ইকোনমিস্টের মতে, বাংলাদেশের সূচকগুলো এতই ইতিবাচক যে, তা ধরে রাখতে পারলে অনুন্নয়ন ও দারিদ্র্য কাটিয়ে উঠতে পারবে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ বেশি এগিয়েছে।
নানারকম প্রতিবন্ধকতা ও সঙ্কটের মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদীয়মান অর্থনীতির সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির ইতিবাচক গতিধারায়। রপ্তানি বাণিজ্যে গড়েছে নতুন মাইলফলক। বাংলাদেশ রপ্তানি বাণিজ্যের ইতিবাচক কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মোকাবেলা করে অগ্রগতি, উন্নয়ন চলমান রেখেছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বঅর্থনীতিতে একটি ঈর্ষণীয় ইমেজ তৈরি করেছে। পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক ট্রেড পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী তৈরি পোশাকখাতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব হলো ৫০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ৫.১ শতাংশ। এক্ষেত্রে চীনের অংশীদারিত্বের পরিমাণ ৩৮.৬ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ও ভারতের অংশীদারিত্ব হলো ৩.৭ শতাংশ। বর্তমানে উৎপাদন ব্যয়ের আধিক্য ও দক্ষজনশক্তির অভাবে চীনের পোশাকখাতের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। চীনের এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বাজার আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছানোর গতিময়তায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে।
বিশ্বের নামকরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় এবং আমদানি বৃদ্ধির কারণে এদেশের পোশাক শিল্পের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। শ্রম দক্ষতা, বাজার সম্প্রসারণ, পোশাক ডিজাইনের বৈচিত্র্যময়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রপ্তানিতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রায় অনেকাংশ তৈরি পোশাক রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। অন্যান্য খাতগুলোর গত অর্থ বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, চামড়া, উল এবং উল পণ্য, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, চা, প্লাস্টিক পণ্য, হ্যান্ডিক্র্যাফট, সিল্ক এবং বাই সাইকেল। তবে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি গত বছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৫৫.৮১% পাট ও পাটজাত পণ্য ৫.৮৮% ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাক্টস ১৪.১০%, ফার্নিচার ১৮.৮০% হারে রপ্তানি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া সরকার কৃষিজাত পণ্য, ঔষধ, আইসিটি, জাহাজসহ নতুন নতুন পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতোসব উন্নয়ন ভাবনার মধ্যেও ছেদ পড়ে অশুভ শক্তির উত্থান। দেশের স্থিতিশীল পরিবেশকে বিঘিœত করে গুলশান ট্রাজেডির মন্দ প্রভাব। এটা একটা দেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য চরম অভিঘাত। এতে গতিশীল অর্থনৈতিক ধারা ব্যাহত হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকত তাহলে উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত ও টেকসই হতো। অর্থনীতির পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রত্যাশার চেয়ে অকল্পনীয়ভাবে অনেক বেশি এগিয়েছে। শিল্প, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ বাংলাদেশের অনেক সেক্টরই এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। মাত্র ছাপান্ন  হাজার বর্গমাইলের এই দেশটিতে এখন বছরে চার কোটি টন চাল উৎপন্ন হয়। দুই বছর আগেও যা ছিল সাড়ে তিন কোটি টনের নিচে। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনের ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। পরিসংখ্যান অনুসারে শুধু কৃষিখাতে জিডিপির অবদান ২১ শতাংশ। আর কৃষিশ্রমে ৪৮ শতাংশ। কৃষির সাব-সেক্টরসহ এ পরিসংখ্যান ৫৬ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ। আর আলু উৎপাদন কৃষি খাতের সাফল্যের এক বিস্ময়। এক দশক আগেও উৎপাদন ছিল ৫০ হাজার টনের নিচে। এখন তা এগোচ্ছে কোটি টনের দিকে। এ সাফল্য বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের কাতারে। এ স্বীকৃতিটি দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮২ লাখ ১০ হাজার টন উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে অষ্টম স্থানে। যোগাযোগ খাতে বঙ্গবন্ধু সেতু মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ হলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। রাজধানীর যানজট নিরসনে মহাখালী, খিলগাঁও, গুলিস্তান ও কুড়িল ফ্লাইওভারও বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এদিকে মালিবাগ মৌচাকে ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হবে শিগগির। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বড় বড় প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি নৌপথ সচল করতে দেশের ৫৩টি নদীর খনন কাজ চলছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যাংকিংসহ নানা কাজে এখন ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে। নিমিষেই তথ্য জানতে বা জানাতে পারছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। রাষ্ট্রীয় অনেক সেবা পাওয়া যাচ্ছে সহজে।
যোগাযোগ প্রযুক্তিতে উন্নতির শিখরে। তথ্যপ্রযুক্তিতেও বাংলাদেশ এখন বিশ্ব  সভায় প্রতিনিধিত্ব করছে। টানা দ্বিতীয়বারের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। দ্রুতই বিকাশ ঘটছে ই-শিল্প বাণিজ্যে। দেশের প্রায় ১১শ প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার তৈরি করছে। এই শিল্পে বহু তথ্যপ্রযুক্তিবিদ কাজ করে যাচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ সফটওয়্যার শিল্পে এক লাখের বেশি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ কাজ করবে। এখন এই শিল্প থেকে প্রতিবছর এক শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় হচ্ছে। ২০১৮ সালের মধ্যে এ দেশ সফটওয়্যার রফতানি করে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে প্রযুক্তি। এ জন্য এক হাজার ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চালু করা হয়েছে কৃষি ও কমিউনিটি রেডিও। ২০২১ সালে যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হবে, তখন বাংলাদেশ হবে বিশ্বের মধ্যে উদাহরণ সৃষ্টিকারী একটি রাষ্ট্র। ইতিমধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি সই হয়েছে। এক হাজার ১৩৮ দশমিক ৫ কোটি ডলারের এ ঋণচুক্তি সই হয়। এতে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি মিটবে পর্যায়ক্রমে ৪ হাজার মেগাওয়াট।
বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসডিজি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর জন্য ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়/বিভাগওয়ারি চূড়ান্ত-লক্ষ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এসডিজি বাস্তবায়নের নিমিত্তে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ চলমান থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে  উন্নত দেশে পরিণত করার মহাপরিকল্পনার সমর্থনসূচক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘মার্চিং টুওয়ার্ডস গ্রোথ, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইক্যুইট্যাবল সোসাইটি’। উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কৌশল হিসেবে চারটি বিষয়ের ওপর মূলত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মাথাপিঁছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) বিকাশ বৃদ্ধি করা, উচ্চতর উপার্জনের মুনাফা আরো সর্বসমেত (ইনক্লুসিভ) করা এবং টেকসই ও পরিবেশ-বান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা দিয়ে যে বাজেটের শুরু হয়েছিল সেই বাজেটের আকৃতি এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায়। ‘জন-নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা’ খাতকে শক্তিশালী করার জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫০ হাজার নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে এবং পুলিশ বাহিনীতে লোকবল নিয়োগ করার কথা বাজেটে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে ১০০ জন নারী সদস্য নিয়োগ দেয়া হবে।
তারুণ্যের শক্তি বড় শক্তি। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের বিপুল বিজয় দেখে অনেকেই সরল মন্তব্য করেছিলেন যে তরুণেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আন্দোলিত হয়ে ‘নৌকার’ পক্ষে বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চের শুরুর দিকে যে গণজোয়ার দেখা গিয়েছিল, মনে হয়েছিল তরুণেরা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের চেতনাকে শাণিত করেছেন। বিপরীতে আমরা কী দেখি? গত চল্লিশ-পয়ঁতাল্লিশ বছরে তরুণদের একটা অংশ রীতিমতো উচ্ছন্নে গেছে। লেখাপড়ার বদলে অস্ত্রবাজিই তাঁদের কাজ। কিন্তু তাঁরা আসলে দাবার ঘুঁটি, ফুট সোলজার। তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন যাঁরা, সেই সব কুশীলব নেপথ্যেই থেকে গেছেন। সফেদ পাঞ্জাবি কিংবা ভাঁজহীন সাফারি পরা নাটের গুরুরা আড়ালেই থেকে যান। দলের মধ্যে ক্ষমতাশালী এসব ‘বড় ভাই’ এর কথা মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে চাউর হয়। কিন্তু তাঁরা থেকে যান বিচারব্যবস্থা বাইরে।
আমাদের ভাবনা ও দুর্ভাবনা ওখানেই। আমাদের সম্পদ সীমিত, তবে এই সীমিত সম্পদের মূল্য সংযোজন সবচেয়ে বেশি হবে যদি তা মানবসম্পদের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। এ জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের মানব সম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদদের নিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সেমিনার হয়েছে। এর মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষায় যে নানা রকম পরিবর্তন ও পরীক্ষণ করা হয়েছে, জাপান, কোরিয়া কিংবা ভিয়েতনাম শিক্ষাকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপ থেকে মাথা তুলে অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, সেই তুলনায় আমাদের উদ্যোগ কেবলই বাজেট বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দেশের কিশোর ও তরুণদের নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ আছে। কৈশোর ও তারুণ্যের চাহিদা পূরণে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থতা ঘটছে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এতে হতাশা ও জন্মাচ্ছে, ক্ষোভও তৈরি হচ্ছে। আমাদের তরুণরা আজ বিপদগামী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাজে অংশ গ্রহণ করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ইতিহাসের শতাব্দীর জোয়ার-ভাটা পাড়ি দিয়ে আমরা বাংলাদেশের ঘাটে আমাদের তরি ভিড়িয়েছি। এখন বাংলাদেশের ঐতিহ্য আর অস্তিত্ব রক্ষার গুরুদায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা, ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আমাদের সামনে রয়েছে কণ্টকাকীর্ণ পথ।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে গেল। তারা আমাদের ভালো চায়নি। যাওয়ার আগে এমন সূক্ষ্ম চাল দিল, যাতে দুই প্রধান ধর্মের লোকেরা মিলেমিশে থাকতে না পারে। রেখে গেলে অ্যাপেল ও অব ডিসকর্ড শিক্ষা ব্যবস্থা। তারা তরুণদের কর্মক্ষম করার প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা শিক্ষাকে শত দ্বারায় বিভক্ত করে। সৃষ্টিশীল কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টির পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে গেছে। শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ যেকোনো দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বর্তমান সময়ে শুধু কায়িক শ্রমের মূল্য প্রায় নেই বললেই চলে। নূন্যতম কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা থাকলেই শুধু কারো পক্ষে শ্রমবাজারের বর্তমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব। আমাদের দুর্ভাগ্য, মানবসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্রের সীমাহীন অবহেলা। বর্তমান সরকার এই অতি জরুরি দিকটিতে কিছুটা হলেও দৃষ্টিপাত করেছে। আর তার ফলও ফলতে শুরু করেছে। সাত বছর আগে যেখানে দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ, সেখানে এখন এই হার ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই ধারায় মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকার নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। তারই একটি হচ্ছে ১০০টি উপজেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। এক হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা মানসম্মত না হলে শিক্ষার মূল্য উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। আমাদের ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটগুলোর মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সমালোচনার অন্ত নেই। আমাদের ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটগুলো ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং বা বৈশ্বিক বা বৈশ্বিক মান বিচারে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। এর একটি প্রধান কারণ শিক্ষার ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া। ডিপ্লোমা শিক্ষার মানোন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আমাদের ডিপ্লোমা শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমাগতভাবে পেছনে ঠেলেছে। আধুনিক ডিপ্লোমা শিক্ষার জন্য উন্নত দেশে যেসব সরঞ্জাম ও পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় সেগুলো আমাদেরকে সহজলভ্য করতে হবে।
ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা হলো আধুনিক প্রযুক্তির ধারক-বাহক। প্রতিবছর গড়ে ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর অর্ধেক তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেরিনারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাবার, মোবাইল ব্যাংকিং, এয়ারহোস্টেজ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, বিমান পরিচালনা, সাবমেরিন, মহাকাশযান, নিউক্লিয়াস ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সসহ সকল পণ্য ও পেশায় কমপক্ষে ৫০০ (পাঁচশত) নতুন ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে বিদেশীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর জাতীয়ভাবে ‘জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস’ পালনের নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। আর তা হলে বাংলার মাটি থেকে বেকার সমস্যা চিরতরে দূর করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করতে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রশাসনিক ৮টি বিভাগে ৮টি ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার আইন পবিত্র জাতীয় সংসদে পাস করতে হবে।
এজন্য আরেকটি শিক্ষাযুদ্ধে আমাদের অবতীর্ণ হতে হবে। এই যুদ্ধ হলো প্রতিটি গ্রামে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শ্লোগান বাস্তবে পরিণত করা। অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করার চ্যালেঞ্জই উন্নত দেশের কাতারে অবস্থানের সংকেতেপূর্ণ নির্দেশনা দিবে বাংলাদেশকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ