ঢাকা, সোমবার 13 February 2017, ০১ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব

সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটার বিপুল সম্ভাবনা থাকা স্বত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা আজও সম্ভব হয়নি। অথচ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শিলাইদহের কুঠিবাড়ী এবং বাউল সম্রাট লালনের সাধনভূমি ছেউড়িয়াকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের যুগযুগ ধরে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে চলেছে। এর বাইরে প্রখ্যাত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা, কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতিচিহ্ন, টেগরলজ, মোহিনী মিল, রেণউইক যজ্ঞেশ্বর বাঁধ, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ, দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্পের প্রধান পাম্প হাউস, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং লালন শাহ সেতুকে ঘিরে সব সময় মুখরিত থাকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণা। কুষ্টিয়া শহর থেকে ১ ঘণ্টারও কম সময়ে যাওয়া যাবে কুঠিবাড়ি। চারদিকে বাগান বেষ্টিত এ মনোরম পরিবেশে সারাদিন থাকতে ইচ্ছা করবে। কুঠিবাড়ীর ভেতরে কবিগুরুর ব্যবহার্য বিভিন্ন আসবাবপত্র, বাইরে বকুলতলার পুকুরঘাট এবং পার্শ্ববর্তী পদ্মার পাড়ও আপনাকে মুগ্ধ করবে। ইচ্ছে করলে কুঠিবাড়ি সংলগ্ন খোরশেদপুরে গ্রামের কামেল কিংবদন্তি পুরুষ হজরত খোরশেদ উল মৌলুকের মাজারও ঘুরে আসা যায়। শহরসংলগ্ন কালিগঙ্গা নদীর তীরে লালনের সাধনভূমি ছেউড়িয়া গ্রাম। এখানেই লালন শাহ এবং অন্য সাধুর মাজার ও লালন মিউজিয়াম। এখানে বসে বাউলের গান শুনে প্রাণ জুড়িয়ে নেয়া যায়। উনিশ শতকের অন্যতম মুসলিম সাহিত্যিক, 'বিষাদ সিন্ধুর' রচয়িতা মীর মোশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা লাহিনীপাড়ার দুরত্ব মাত্র ২০ মিনিটের। ১৮৪৭ সালে জন্ম নেয়া মহান এ সাহিত্যিকের শৈশবের অনেক স্মৃতিই খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে। শহর থেকে ৪০ মিনিটের দূরত্ব কুমারখালী উপজেলা। এ উপজেলা শহরের মধ্যখানে অবস্থিত। কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র 'গ্রামবার্তা' প্রকাশিকা'র সম্পাদক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি 'কাঙ্গাল কুঠির'। ১৮৬৩ সালে কুমারখালীর বাংলা পাঠশালার প্রধান শিক্ষক কাঙ্গাল হরিনাথ এমএন প্রেস থেকে এই পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন। গাছ-গাছালিতে ভরপুর এই কাঙ্গাল কুঠিরে কাঙ্গালের শেষ স্মৃতিচিহ্ন, যা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে নিঃশেষ হতে চলেছে। এই গ্রামবার্তা প্রকাশিকাতে এক সময় নীলকরদের বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারী জমিদার ও লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে কাঙ্গাল হরিনাথ কলম ধরেছিলেন। কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান টেগর অ্যান্ড কোম্পানির এ দেশীয় শাখা অফিস টেগর লজ। কবিগুরু কলকাতা থেকে শিলাইদহে আসার পথে এই টেগর লজে বিশ্রাম নিতেন। লাল টকটকে দ্বিতল এ ভবনটির পেছনেই রয়েছে অবিভক্ত বাংলার প্রথম ও প্রধান বস্ত্রকল 'মোহিনী মিলস'। শহরের গড়াই নদী সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আখ মাড়াই কলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছিল রেণউইক অ্যান্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি। ছায়াঘেরা সুন্দর পরিবেশের এ কোম্পানির শেষ প্রান্তে নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে শহর রক্ষা 'রেণউইক বাঁধ'। শত শত মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। ইচ্ছা করলে নদীতে একটু নৌকা ভ্রমণ করা যায়। দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন কুষ্টিয়া ঝাউদিয়া জামে মসজিদ। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের জমিদার আহমেদ আলী সুফী নিজ বাড়িতে এ ঐতিহাসিক শাহী মসজিদটি নির্মাণ করেন। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বৃত্তিপাড়া থেকে পায়ে হেঁটেও এ মসজিদে যাওয়া যায়। আজও এর স্থাপত্যকলা ও নির্মাণ কৌশল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এছাড়াও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভেড়ামারা পাম্প হাউস ও লালন শাহ সেতুর অবস্থান প্রায় একই স্থানে। শহর থেকে ২৫ কি.মি. দূরে কুষ্টিয়া-পাবনা জেলার মধ্যবর্তী পদ্মাপাড়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় এ তিনটি স্থাপনা। পূর্বানুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্পের (জিকে) প্রধান পাম্প হাউসে। এর পাশাপাশি পাবনা এবং কুষ্টিয়া জেলাকে একত্রিত করে রেখেছে যে দুটি অনন্য স্থাপনা, তা হচ্ছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন সেতু।
‘বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, পৃথিবীর রূপ আর দেখিতে চাই না’ রূপসী বাংলা সম্পর্কে কবির বিখ্যাত উক্তির সত্যতা মেলাতে আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে ঘর-সংসার ত্যাগ করে, ব্যাপারটি তা নয়। তবে সুযোগ খুঁঁজতে হবে। প্রকৃতির লীলাভূমি অবলোকনে আগ্রহ থাকতে হবে। সময় সুযোগে স্বল্প সময়ের জন্য ঘরছাড়া হতে হবে। অন্বেষণ করতে হবে বাংলার বুকে ধারণ করা লুকায়িত সৌন্দর্য। ইচ্ছে করলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন।
ঘুরে আসুন দর্শনীয় স্থান : শিলাইদহ কুঠিবাড়ী ও লালন শাহের মাজার ছাড়াও কুষ্টিয়াতে পর্যটন দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
মীর মশাররফের বাস্তুভিটা : উনিশ শতকের অন্যতম মুসলিম সাহিত্যিক, ‘বিষাদ সিন্ধুর’ রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা লাহিনীপাড়ায়। গড়াই সেতুর সন্নিকটেই তার বাস্তুভিটা।  শহর থেকে দূরত্ব মাত্র ২০ মিনিটের। ১৮৪৭ সালে জন্ম নেয়া মহান এই সাহিত্যিকের শৈশবের অনেক স্মৃতিই খুঁজে পেতে পারেন এখানে। প্রতি বছর উৎসব হয় এখানে।
কাঙাল কুঠির : শহর থেকে ৪০ মিনিটের দূরত্ব কুমারখালী উপজেলা। এই উপজেলা শহরের মধ্যখানে অবস্থিত। কুষ্টিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্তা’ প্রকাশিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি ‘কাঙাল কুঠির’। ১৮৬৩ সালে কুমারখালীর বাংলা পাঠশালার প্রধান শিক্ষক কাঙাল হরিনাথ এমএন প্রেস থেকে এই পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন। গাছগাছালিতে ভরপুর এই কাঙাল কুঠিরে আপনি দেখতে পাবেন কাঙালের শেষ স্মৃতিচিহ্ন, যা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নিঃশেষ হতে চলেছে। এই গ্রামবার্তা প্রকাশিকাতে এক সময় নীলকরদের বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারী জমিদার ও লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে কাঙাল হরিনাথ কলম ধরেছিলেন। টেগোর লজ ও মোহিনী মিলস : কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান টেগর অ্যান্ড কোম্পানির এদেশীয় শাখা অফিস টেগর লজ। কবিগুরু কলকাতা থেকে শিলাইদহে আসার পথে এই টেগর লজে বিশ্রাম নিতেন। লাল টকটকে দ্বিতল এই ভবনটির পেছনেই রয়েছে অবিভক্ত বাংলার প্রথম ও প্রধান বস্ত্রকল ‘মোহিনী মিলস’। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা এই মোহিনী মিলও আপনি ঘুরে দেখতে পারেন। কথিত আছে, মোহিনী মিলের হুইসেলের শব্দ শুনে এলাকাবাসী তাদের প্রাত্যহিক কাজকর্ম শুরু করতেন।
রেনউইক বাঁধ : শহরের গড়াই নদী সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আখ মাড়াইকলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছিল রেনউইক অ্যান্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি। ছায়াঘেরা সুন্দর পরিবেশের এই কোম্পানির শেষ প্রান্তে নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে শহর রক্ষা ‘রেনউইক বাঁধ’। শত শত মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। ইচ্ছা করলে নদীতে একটু নৌকা ভ্রমণ করা যায়।
ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ : দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া জামে মসজিদ। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের জমিদার আহমেদ আলী সুফী নিজ বাড়িতে এই ঐতিহাসিক শাহী মসজিদটি নির্মাণ করেন। কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বৃত্তিপাড়া থেকে পায়ে হেঁটেও এ মসজিদে যাওয়া যায়। আজও এর স্থাপত্যকলা ও নির্মাণ কৌশল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
একের ভেতরে তিন : হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভেড়ামারা পাম্প হাউস ও লালন শাহ সেতুর অবস্থান প্রায় একই স্থানে। শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া-পাবনা জেলার মধ্যবর্তী পদ্মাপাড়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় এই তিনটি স্থাপনা। পূর্বানুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্পের (জিকে) প্রধান পাম্প হাউসে। এর পাশাপাশি পাবনা এবং কুষ্টিয়া জেলাকে একত্রিত করে রেখেছে যে দুটি অনন্য স্থাপনা, তা হচ্ছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন সেতু। দুই সেতুর মধ্যবর্তী পদ্মা পাড়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন।
কীভাবে যাওয়া যাবে : ঢাকা থেকে হানিফ, বিআরটিসি, শ্যামলী এবং লালন পরিবহনের বাস টেকনিক্যাল মোড় থেকে ছাড়ে। এ বাসগুলো যায় আরিচা- পাটুরিয়া হয়ে। এভাবে গেলে কুমারখালী নেমে শুরুতেই আপনি দেখে নিতে পারেন কাঙাল হরিনাথের বাড়ি। তারপর এখান থেকে বাসে মীর মশাররফের বাড়ি হয়ে লালনের আখড়া। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া এসবি পরিবহন (এসি/ননএসি), শ্যামলী পরিবহন (এসি/ননএসি), সফি ফাতেমা-এ বাসগুলো বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে যায়। এভাবে গেলে কুষ্টিয়া শহরে নেমে প্রথমে লালনের আখড়া, মীর মশাররফ হোসেনের বাড়ি, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি, তারপর হরিনাথের বাড়ি। সময় ২ দিন হলে ভালো হয়। যারা অন্য শহর থেকে আসবেন তারা কুষ্টিয়া শহরে নেমে একইভাবে যেতে পারেন, আবার কুমারখালী নেমে যেতে পারেন। সঙ্গে যদি গাড়ি থাকে তাহলে তো ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারেন।এ ছাড়াও কবি দাঁদ আলীর মাজার, করম আলী শাহের মাজারসহ বিভিন্ন দর্শনয়ি স্থান।
কোথায় থাকা যাবে : কুষ্টিয়ায় থাকার অনেক হোটেল আছে। হোটেল পদ্মা, হোটেল জুবলি, গোল্ডেন স্টার (এসি, ননএসি)। ভাড়া পড়বে ২০০-৬০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া অনুমতি নিয়ে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় থাকা যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ