ঢাকা, বুধবার 15 February 2017, ০৩ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিআরটিএ’র দায় চাপানো হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষকদের ঘাড়ে

নাছির উদ্দিন শোয়েব: স্কুল-কলেজ, মাদরাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পিকনিক ও শিক্ষা সফরে গিয়ে বাস দুর্ঘটনার শিকার হলে এর দায় কার? শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্যেই প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ধরনের আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করে। কিন্তু পিকিনিক ও শিক্ষা সফরে যাওয়া নিয়ে সরকারের নতুন নিয়মে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। পিকনিকে যেতে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতি নেয়ার বিষয়ে শিমন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারির ঘটনাকে সরকার উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও চালকদের ভুয়া লাইসেন্সের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বিআরটিএ’র। অথচ পরিপত্রের বর্ণনা অনুযায়ী এর জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই যেন দায়ী! 

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ ধরনের অনুমতি চাওয়া বা অনুমতি পাওয়া অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠবে না। এছাড়াও নিদিষ্ট স্পটে যথা সময়ে যেতে না পেরে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে সফরে যাওয়া সম্ভব হবে না। এ কারণে আবহমানকাল থেকে চলে আসা শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক সফরের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। 

শিক্ষাসফরে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্র জারি করে। এতে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পূর্ব অনুমতি ছাড়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফর বা পিকনিকে যেতে পারবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করলে শিক্ষার্থী বহনকারী গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স সম্পর্কে অবশ্যই বিআরটিএ’র প্রত্যয়ন নিতে হবে। শিক্ষা সফর, পিকনিক বা দলগত ভ্রমণের যাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ৭ দফা নির্দেশনা দেয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহনের চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের? লক্করঝক্কর গাড়ি বা লাইন্সে বিহিন চালকদের আইনের আওতায় আনার জন্য বিআরটিএ রয়েছে। রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-ভ্রাম্যামাণ আদালত। পরিবহন বা চালকদের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনার কারণে শিক্ষা সফরে বা পিকনিকে যেতে অনুমতি চাওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার ঘটনা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে শিক্ষা সফর ও পিকনিকে যেতে অনেকেই উৎসাহ হারাবেন। সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি পেতে ধর্ণা দেয়া বা ঝামেলা মনে হওয়ায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা সফরে যাবে না। ফলে শিক্ষার্থীদের এই আনন্দ ভ্রমণের রীতি নিরানন্দে পরিণত হবে। 

মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে আরো বলা হয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা সফর, পিকনিক বা কোনো উৎসব অথবা এ জাতীয় কোনো আনন্দ ভ্রমণে যাতায়াতের সময় পরিবহনজনিত দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা পরিহারের জন্য অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পরিপত্রে ৭ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, শিক্ষা সফরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ডিসি বা ইউএনওর অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন নেয়ার আগে শিক্ষার্থীদের বহনকারী গাড়ির ফিটনেস ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ অফিসের প্রত্যয়ন নিতে হবে। পিকনিক বা শিক্ষা সফরে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই অভিভাবকদের কাছ থেকে সম্মতিপত্র নিতে হবে। এতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা সফর বা পিকনিক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের আগেই ধারণা দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিতে হবে। ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার পূর্বে স্থানীয় প্রসাশন ও পুলিশ প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হবে। স্থানীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত যেসব বিধি-বিধান আছে তা সবাইকে যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় যখন-তখন বিকল হয়ে পড়া ও চালকের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দেখভাল না করার কারণে দেশের পরিবহন খাতে চরম নৈরাজ্য চলছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে দুর্ঘটনায় একই সঙ্গে অনেক যাত্রীর প্রাণহানির পর প্রায়ই বিষয়টি সামনে আসে। এরপর এগুলো বন্ধের কথা বলে সরকার। ঢাকঢোল পিটিয়ে নানা সময় চলে অভিযান। কিন্তু কদিন পর আবার আগের জায়গায় ফিরে যায় সব। দুইয়ে মিলে যেন গাড়ির ফিটনেসের চক্রে পড়েছে যাত্রীরা। 

সূত্রমতে, যারা এসব দেখবে সেই সরকারি সংস্থা বিআরটিএ আর পুলিশের দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা। গাড়ির ফিটনেস ঠিক নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেই চলাচলের অনুমোদন। অনেক চালকের লাইসেন্স ভুয়া। দক্ষতার প্রশ্ন তো অসার। মাঝেসাজে শুরু হয় সাঁড়াশি অভিযান। মোড়ে মোড়ে পুলিশ, রেকার। পাশেই প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল পেতে বসে যান ভ্রাম্যমাণ আদালতও। ফিটনেসে একটু হেরফের হলেই আর ছাড় নেই। হয় মামলা আর না হয় সোজা ডাম্পিং। মোটরযান আইন অনুসারে, যতদিন ফিটনেস থাকবে, ততদিন একটি গাড়ি চলতে পারবে। তবে নির্বাহী আদেশে রাজধানী ঢাকায় বাসের ২০ এবং ট্রাকের জন্য ২৫ বছরের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ২০ বছরের অধিক পুরোনো বাসও ঢাকার রাস্তায় চলছে।

বিআরটিএর হিসেবে, বর্তমানে সারাদেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ৪১ শতাংশ বা প্রায় ২৫ হাজার। অবশ্য ফিটনেস সনদ হালনাগাদ না করলেও তা ফিটনেসবিহীন গাড়ির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, ফিটনেসবিহীন যানের সংখ্যা পাঁচ হাজারের মধ্যে থাকলে বলতে হবে পরিবহন ব্যবস্থা ঠিক আছে। বুয়েটের একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, একটা যানবাহনের ফিটনেস দিতে ৪২টি পরীক্ষা করার নিয়ম। কিন্তু সেগুলো করা হয় না। সরকারি সংস্থাগুলো নিজেরা এই কাজ পারছে না। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া উচিত।

তবে মাঝে মধ্যেই মহাসড়কগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনা, প্রাণহানির ঘটনার পর দেশের সড়ক বিভাগ নড়েচড়ে বসে। সচেতন সমাজও সোচ্চার হয়। এ বিষয়ে গত বছর ৩ আগস্ট আদালত এক নির্দেশনায় বলেছে, সারাদেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আর চলবে না। এটা বন্ধ করতে বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় ১৯ লাখ ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জব্দ করে ওইসব চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে বলেছেন আদালত। 

উল্লেখ্য, গত ২৫ জানুয়ারি যশোরের চৌগাছার বর্ণি রামকৃষ্ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীতে পিকনিকে যাওয়ার পথে তাদের বহনকারী বাস উল্টে যায়। এতে স্কুলের সহকারী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম, ছাত্রী সুমাইয়া, সাথীসহ ৫ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়। এর আগে ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি যশোরের বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা মেহেরপুরের মুজিবনগরে শিক্ষা সফর থেকে ফেরার পথে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই চার ছাত্রী ও তিন ছাত্র নিহত হয়। আহত হয় অর্ধশতাধিক। এভাবে সারাদেশে প্রায়ই পিকনিক বা শিক্ষা সফরে আসা-যাওয়ার পথে বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ