ঢাকা, বুধবার 15 February 2017, ০৩ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দিশেহারা মধ্যআয়ের মানুষ

এইচ এম আকতার: মিলারদের সিন্ডিকেটের কারণেই ঊর্ধ্বমুখী চালের বাজার। উৎপাদন ও সরবরাহে সংকট না থাকলেও ক্রমেই অস্থির হচ্ছে চালের বাজার। বেশ কিছুদিন ধরেই দাম বাড়ছে প্রায় সব ধরনের চালের। এতে করে বিপাকে পড়েছে মধ্য আয়ের মানুষরা। এ জন্য সরকারের বাজার মনিটরিংকে দায়ী করলেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেছেন মোট চালের দাম বৃদ্ধির কারণেই সার্বিক মূল্যসূচক বেড়েছে।

মাসখানেকের ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি বেড়েছে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিলারদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তবে আসছে বৈশাখে দাম কমবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। 

শুধু তাই বাজারে চারের দামের সাথে সাথে বেড়েছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও। একইসাথে বেড়ে সকল শিক্ষা উপকরণের দামও। এতে করে বিপাকে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্য আয়ের মানুষ। এ নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও সরকার কার্যকরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

গেল বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রধান নিত্যপণ্য চালের বাজার। বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা করলেও সার্বিকভাবে দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহতই আছে। এ অবস্থায় আবারো চালভেদে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ২-৪ টাকা এবং খুচরায় বেড়েছে ২-৫ টাকা পর্যন্ত।

পুরান ঢাকার বড় পাইকারি বাজার বাবুবাজার ঘুরে দেখা যায় প্রতি কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬-৪৮ টাকায় আর ২ টাকা বেড়ে বি আর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৩৯-৪১ টাকায়। তবে বিভিন্ন মানের নাজির শাইল চালের দাম কিছুটা অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগের তীর বড় মিল মালিকদের দিকে।

কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাবু বাজারের চেয়ে এখানে চালের দাম কিছুটা বেশি। এ বাজারে মিনিকেট প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, বি আর-২৮ ৪১-৪৪ টাকায় আর বিভিন্ন মানের নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৬৬ টাকা পর্যন্ত।

গেল বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম। বাবু বাজারে এটি প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৪ টাকায় আর কারওয়ান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকা পর্যন্ত। আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৪-৪০ টাকায়। দেশের মধ্য আয়ের মানুষরা এ চাল বেশি খেয়ে থাকেন।

জানা গেছে নি¤œ আয়ের মানুষদের জন্য সরকার ট্রাক সেল এবং জেলা উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে ১০ টাকা দরে চাল। কিন্তু তাতে বাজারে চালের দামে কোনো প্রভাব পড়ছে না। রাজধানীর ট্রাক সেলে চাল বিক্রি হয়ে থাকে ১৫ টাকায় আর আটা বিক্রি হয়ে থাকে ১৭ টাকায়। নি¤œ আয়ের কিছু মানুষ এ চাল সংগ্রহ করে থাকলেও নি¤œমধ্য আয়ের মানুষরা তা কিনতে পারছে না। তাছাড়া এ চাল অনেক সময় গন্ধ ও পোকা পাওয়া যায়। যা কোনোভাবেই খাওয়ার উপযোগী নয়। আর এ কারণেই বেশি দামে চাল কিনতে অনেকেই বাধ্য হন।

চাল নিয়ে কারসাজি নতুন নয়। কিন্তু সরকার কোনোভাবেই এ সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না। সরকার একাধিকবার ব্যবস্থা নিতে চাইলেও সফল হয়নি। কারণ সরকার ব্যবস্থা নিতে চাইলেই তারা একজোট হয়ে চাল বিক্রি বন্ধ করে দেয়। 

চাল উৎপাদন ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকলেও বাজারে দাম বৃদ্ধির অস্বাভাবিক ধারায় অসন্তুষ্ট ক্রেতারা। তাদের মত, কার্যকর নজরদারির অভাবেই একটি অসাধু চক্র এর সুবিধা নিচ্ছে।

সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, মূলত সরকারের নজরদারি না থাকার কারণেই নিজেদের ইচ্ছামতো বাড়তি দামে চাল বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। কোনো অজুহাত ছাড়াই বাড়ছে চালের দাম। এতে করে বিপাকে পড়ছে মধ্যআয়ের মানুষরা।

 জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে দফায় দফায় চালের দাম বেড়েছে। মাঝপথে কিছুটা কমলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে আমন ধানের চাল বাজারে এসেছে। কিন্তু দাম কমেনি।

ব্যবসায়ীরা জানান, আমনের বড় অংশই কৃষকের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে ফড়িয়া ও মিলাররা। তারা এগুলো চাল করে বাজারে ছাড়ার কথা। কিন্তু তারা বাজারে না ছেড়ে নিজেদের আড়তে মজুদ রেখেছেন। ফলে বিভিন্ন মিলারদের কাছ থেকে বাজারে নতুন চালের সরবরাহ আসছে না। এ কারণে বাজারে নতুন চালের সংকট দেখা দেয়ায় দাম বেড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মিল মালিকরা চালের দাম বাড়ানোর ইচ্ছা করলেই চাল বিক্রি বন্ধ করে তা মজুদ রাখেন। এতে করে বাজার চাহিদা বেড়ে যায় এবং সরবরাহ কমে যায়। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই চাল দাম বাড়িয়ে থাকেন পাইকারি আড়তদাররা। আর এর প্রভাব পড়তে থাকে খুচরা বাজারে।

এদিকে চালের দাম বাড়ার জন্য খুচরা, পাইকারি ও মিলাররা একে অপরকে দায়ী করছেন। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ার কারণে তারাও বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। আবার পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল মালিকরা চালের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন, একইসঙ্গে দামও বাড়িয়েছেন। ফলে তাদের কাছ থেকে বেশি দামে চাল কেনার কারণে বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাবু বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা ঢাকা রাইস সিন্ডিকেটের মালিক মনির হোসেন বলেন, গ্রামে এখন ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সব ধান বড় বড় কোম্পানিগুলো কিনে গুদামজাত করেছে। যে কারণে মিলাররা ধান কিনতে পারছে না। ধানের সংকটের কারণে বাজারে চালের দাম বেড়েছে।

তিনি আরও জানান, গত দু’ সপ্তাহ আগে মিনিকেট ধানের (৭৫ কেজির) বস্তা ছিল ১ হাজার ৯০০ টাকা। বর্তমানে ২ হাজার ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিবস্তায় বেড়েছে ২০০ টাকা। আটাশ জাতের ধানের বস্তা ১ হাজার ৮০০ টাকা ছিল, বর্তমানে ২ হাজার। ১ হাজার ৪০০ টাকার গুটি (মোটা) চালের বস্তা এখন ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া বাসমতি চালের ২০ কেজির বস্তা আগে ১ হাজার ৯০০ টাকা ছিল। বর্তমানে ২ হাজার ১০০ টাকা।

টিসিবি বলছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে তারা নিয়মিত ট্রাক সেল করছে। আর ট্রাকের চালের দাম আগের চেয়ে অনেক কমেছে। আগের মোটা চাল বিক্রি হতো ২৩ টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। চালের মান ভালো হলে গ্রাহক অনেক থাকেন, আর মান খারাপ হলে গ্রাহক কমে যায়। তবে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ