ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 February 2017, ০৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পণ্যমূল্যের চাপে দিশেহারা মানুষ

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের দামই কমছে না বরং বেড়ে চলেছে অবিশ্বাস্যহারে। বিশেষ করে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই হঠাৎ বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম। মাত্র মাসখানেকের ব্যবধানে প্রতিকেজিতে বেড়েছে দুই থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্তও। শুধু তা-ই নয়, রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলোতে একই চাল বিক্রি হচ্ছে দু-তিন টাকা কমবেশি দরে। যেমন বাবুবাজারে যে মিনিকেট চাল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সে একই চাল কারওয়ানবাজারে কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দিয়ে। বি আর-২৮ চালের ক্ষেত্রেও দুই বাজারের দামে পার্থক্য রয়েছে। চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা মিলারদের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, মিলাররা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে চলেছে। এখানে পাইকারি বা খুচরা ব্যবসায়ীদের করার কিছু নেই। দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ওদিকে চালের পাশাপাশি অন্য সব পণ্যের দামও বেড়ে চলেছে। পেঁপে ও আলুর মতো দু-একটি ছাড়া এমন কোনো সবজির নাম বলা যাবে না- প্রতিকেজিতে যার দাম ৫০/৬০ টাকার নিচে রয়েছে। মাছের বাজারে সাধারণ মানুষ তো যাওয়ারই সাহস পাচ্ছে না। যে কোনো মাছ কিনতে গেলে কম করে হলেও চার-পাঁচশ’ টাকা গুনতে হচ্ছে। আকারভেদে প্রতিকেজি রুইয়ের দাম পৌঁছে গেছে তিন থেকে পাঁচশ’ টাকায়। গোশতের বাজারের কথা না বলাই ভালো। কারণ সেখানেও আগুনই জ্বলছে। এতদিন তবু ৪৮০-৫২০ টাকা কেজি দরে গরুর গোশত পাওয়া যেত কিন্তু চাঁদাবাজির প্রতিবাদে গোশত ব্যবসায়ীরা গত মঙ্গলবার থেকে ধর্মঘট শুরু করেছেন। এর ফলে বাজারে কোনো গোশতই পাওয়া যাচ্ছে না। ধর্মঘটের কারণে অনেকে সুপার শপগুলোতে যাচ্ছেন কিন্তু সেখানেও গোশত দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। গোশতের সংকটে বিরিয়ানির ব্যবসা লাটে ওঠার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিপদে পড়েছেন বিশেষ করে তারা, যাদের পরিবারে কারো বিয়ে-শাদী হচ্ছে। খবরে জানা গেছে, গোশত ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের সুযোগ নিয়ে দেশী মুরগি এবং ব্রয়লার মুরগির দামও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি বেড়ে গেছে ডিমের দামও।
সব মিলিয়েই বাজারের পরিস্থিতি এমন হয়ে পড়েছে যে, বাজারে গিয়ে জিহ্বা বেরিয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের। কথা শুধু চাল, সবজি ও গোশতের কারণে ওঠেনি। এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একযোগে বেড়েছে বাস, রিকশা ও সিএনজিসহ যানবাহনের ভাড়া। ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত হারের তোয়াক্কা করছেন না মালিকরা। অন্তরালে চাঁদাবাজি ও কমিশনের মতো গোপন কিছু ব্যাপার থাকায় টাউট ও অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। এমন অবস্থারই কুফল সইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এভাবে সব মিলিয়েই দামসহ নিত্যপণ্যের বাজার অত্যন্ত ভীতিকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে এসবের তুলনায় আয় তো বাড়ছেই না, অনেকের রোজগার বরং কমে যাচ্ছে। দিনমজুররা দৈনিক কাজ পাচ্ছে না। ফলে শ্রমজীবী মানুষের তো নাভিশ্বাস উঠেছেই, মধ্যবিত্তরাও আজকাল চোখে অন্ধকার দেখছেন। কোনো একটি প্রসঙ্গেই এখন আর শতকরা হিসেবে হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও মানুষকে বাজারে যেতে হচ্ছে। কারণ, তিন বেলা না হলেও দু’ বেলা তো খেতে হবে, স্ত্রী-সন্তানদেরও খাওয়াতে হবে। সুতরাং সাধ্য না থাকলেও বাজারে না গিয়ে পারছেন না তারা।
এমন অবস্থায় সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, দেশে আদৌ কোনো সরকার রয়েছে কিনা। কারণ, কোনো পণ্যের দামই রাতারাতি বাড়েনি। বেড়ে আসছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কিন্তু মাঝে-মধ্যে ধমক দেয়ার এবং লম্বা আশ্বাস শোনানোর বাইরে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি বর্তমান ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও সরকারকে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে শোনানো হয়েছে, সরকার নাকি ‘কঠোর নজরদারি’ করবে! অন্যদিকে ভুক্তভোগী মানুষ কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের তথা সরকারের অতি চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে বলেই কোনো ধমকে কান দিচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। আর অতি চমৎকার ওই সম্পর্কের পেছনে চাঁদা ও কমিশনই যে প্রধান ফ্যাক্টর বা নির্ধারকের ভূমিকা রাখছে- সে কথাটাও কাউকে বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে না।
বলা দরকার, এসবের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে বাড়ি ভাড়াও। অর্থাৎ সবদিক থেকেই সর্বাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সাধারণ মানুষ- যাদের জনগণ বলা হয়। অভিযোগ উঠেছে, চাঁদা ও কমিশনসহ সহজবোধ্য কিছু কারণে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেই ব্যবসায়ীরাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে নিজেদের ইচ্ছেমতো। সে কারণে পরিস্থিতি চলে গেছে জনগণের নাগালের অনেক বাইরে। স্বীকার করতেই হবে, নিত্যপণ্যের মূল্য থেকে যানবাহনের ভাড়া পর্যন্ত কোনো একটি বিষয়েই সফলতা দেখাতে পারেনি সরকার। সুচিন্তিত ঔদাসীন্যের আড়ালে সরকারের প্রশ্রয় বরং পরিস্থিতিকে দুর্বিষহ করে তুলেছে- যার মাশুল গুনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের তো বটেই, এমনকি নাভিশ্বাস উঠছে মধ্যবিত্তদেরও।
আমরা মনে করি, জনগণের জন্য সামান্য সহানুভূতি থাকলেও সরকারের উচিত টাউট ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় ও সহযোগিতা দেয়ার পরিবর্তে অবিলম্বে পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। চালের বাজার স্থিতিশীল করতে হলে মিলারদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। গোশত ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য অবিলম্বে প্রতিহত করতে হবে। বাসা ও যানবাহনের ভাড়াসহ জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্য সকল বিষয়েও সরকারকে তৎপর হতে হবে। একথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সম্ভবত প্রয়োজন নেই যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া মানুষের আর কোনো উপায় থাকে না। জনগণের পিঠ কিন্তু এরই মধ্যে দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের নাভিশ্বাসও উঠেছে। সুতরাং সরকারের উচিত প্রতিটি বিষয়ে এখনই তৎপর হওয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ