ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 February 2017, ০৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানো আর নয়

ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সদস্যদের কিছু তৎপরতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে দৈনিক সংগ্রামে। ইসলামের সচেতনতা সপ্তাহে তারা অনেকগুলো ইভেন্টের আয়োজন করেছে। এর একটি হলো হিজাব। এই ইভেন্টের নামকরণ করা হয়েছে ‘হিজাব-১০১’। এর লক্ষ্য হিজাবের সত্যিকারের প্রকৃতি সম্পর্কে অমুসলিমদের অবহিত করা। এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বায়োমেডিকেল সায়েন্সের প্রধান মোনাজাহ বাগদাদী এ প্রসঙ্গে জানান, আমাদের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে এ কথা বোঝানো যে, মুসলিম মেয়েরা মাথায় যে স্কার্ফ বা হিজাব পরিধান করে তা কখনোই নিপীড়নের প্রতীক নয়। বরং এটি নারীবাদের একটি প্রতীক। তিনি আরো বলেন, হিজাব পরা মুসলিম নারীদের জন্য একটি ঐচ্ছিক বিষয় বলে কিছু অমুসলিম মনে করেন। কিন্তু এটি ইসলামের মূল বিশ্বাসের পরিপন্থী। প্রসঙ্গত বাগদাদী বলেন, এই হিজাবের পেছনে মূলত লুকিয়ে আছে সাহসের বিষয়টি এবং আমাদের কর্মসূচিতে সেটিই দেখানো হবে। প্রত্যেকদিন সকালে একটি মেয়ে যখন ঘুম থেকে জেগে উঠে তার হিজাব পরিধান করেন তখন তিনি এর মাধ্যমে নিজের ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। মার্কিন সমাজে হিজাবের বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এটি আসলে ইতিবাচক বিষয়। আমাদের ইভেন্টের মাধ্যমে হিজাব পরিহিত মুসলিম নারীরা বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তারা তাদের অভিজ্ঞতা মানুষের সঙ্গে শেয়ার করবেন। এভাবে শিক্ষার্থীরা হিজাব পরা সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন।
এসোসিয়েশনের ইসলাম সচেতনতা সপ্তাহ শুক্রবারের জুমার নামাযের পরে শুরু হবে। শুক্রবার ইসলামের অনুসারীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর শুক্রবার হচ্ছে মুসলিমদের জন্য সমাবেশের দিন। সপ্তাহব্যাপী এই ইভেন্টের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান বৃদ্ধি করা। সম্প্রতি সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিবাসন নিষেধাজ্ঞার কারণে কারো কারো কাছে ওই কর্মসূচি কৌশলগত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে বিষয়টি তেমন নয় বলে জানান মোনাজাহ বাগদাদী। তিনি বলেন, আমাদের এই কর্মসূচি নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই আমরা এ রকম কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকি। এর লক্ষ্য আসলে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সদস্যরা যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। প্রশ্ন জাগে, ভিন দেশে বৈরি পরিবেশে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা ইসলামের পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে যে সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, মুসলিম দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা ইসলামের পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে সেরকম সচেতন আছেন কি? বরং অনেককে লক্ষ্য করা যায় ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে। এটি আসলে হীনমন্যতার উদাহরণ। পরানুকৃতির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা জাতি সমৃদ্ধ হতে পারে না। বরং আপন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার মাধ্যমেই ব্যক্তি ও জাতি এগিয়ে যেতে পারে। এটিই ইতিহাসের সত্য। পাশ্চাত্য সভ্যতার ভোগবাদী চেতনা মানবজাতিকে যে বিপর্যয়ের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে, তা মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীকে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ যথার্থ উপলব্ধি মানুষকে আত্ম-সমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের পথে চলতে সাহায্য করতে পারে। বর্তমান সময়ে এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মুসলিম প্রধান দেশের নাগরিক হিসেবে মুসলমানরা সহজে নিজেদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের আলোকে জীবনযাপন করতে পারেন। এছাড়া বর্তমান ভোগবাদী সভ্যতা এবং এর মন্দ প্রভাব সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এক্ষেত্রে মুসলমানদের ভূমিকা তেমন আশাপ্রদ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে ‘ভ্যালেন্টাইন-ডে’ বা ‘ভালবাসা দিবসের’ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা তো জানি, মানুষ স্রস্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শরীর, মন ও আত্মা নিয়ে মানুষ। মানুষের এসব উপাদান নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, গবেষণা হয়েছে, তবুও মানবরহস্যের অনেক কিছুই এখনও রয়েছে অজানা। মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে চর্চা করে তার একটি হলো ‘ভালবাসা’। এর বাইরে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরো বিষয়। মানুষের মধ্যে যে ভাব-অনুভাব আছে তা সৃষ্টি করে নানারস। এই রসবোধের কারণে মানুষ সক্রিয় থাকে এবং আমাদের পরিবার ও সমাজে এর প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। মানুষের মধ্যে বীর রস আছে, আছে করুণ রসও। হাস্য, শান্ত, বাৎসল্য, ভক্তি ছাড়াও আরো রস রয়েছে। তবে বর্তমান সভ্যতায় শৃঙ্গার রসের চর্চাটাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। আমরা জানি, ভালবাসার নানা রূপ রয়েছে। তবে শৃঙ্গারজাত ভালবাসার বিষয়টি খুবই নির্দিষ্ট। দেহজ কামনা-বাসনার বিষয়টি এখানে মুখ্য। প্রসঙ্গত এখানে ‘ভ্যালেন্টাইন-ডে’ বা ‘ভালবাসা দিবস’-এর কথা উল্লেখ করা যায়। এই দিবস নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক আলোচনা হয়েছে। দিবসটির মাহাত্ম্য বর্ণনায় কিছু ঘটনা, কিছু কুসংস্কার ও কিছুও মিথ্যের মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তবে এসব বর্ণনা বর্তমান সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক বা গ্রহণযোগ্য সেই প্রশ্ন তো আছেই। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেন্টাইন-ডে’ উদযাপন করতে দেখা যায়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেই এর সমারোহ বেশি। দিবসটিকে কেন্দ্র করে অনেক ব্যবসা হয়, বাণিজ্যও হয়। ফলে দিবসটিকে জনপ্রিয় করতে বাণিজ্যবুদ্ধি সক্রিয় থাকে। তবে এসব কর্মকাণ্ড থেকে মানুষ কতটা উপকৃত হয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কতটা সমৃদ্ধ হয়, তা পরখ করে দেখা এখন জরুরী হয়ে উঠেছে। আর মুসলিম প্রধান দেশের মুসলমানরা যখন ভ্যালেন্টাইন-ডে’র গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়, তখন তাদের ঈমান-আকিদা, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং কাণ্ডজ্ঞান সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় যে, মুসলিম প্রধান দেশ পাকিস্তানে এবার ভ্যালেন্টাইন-ডে উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভালবাসা দিবসের সাথে ভোগবাদী চেতনার ঐকতান লক্ষ্য করা যায়। ফলে এই দিবসকে কেন্দ্র করে কিছু অজাচার, অনাচারও হয়। এসব ঘটনায় নারী অবমাননা হয়, পুরুষ নেমে যায় পশুর স্তরে। এইসব কর্মকাণ্ড মানব সমাজে চলতে পারে না। ভালবাসা তো পবিত্র বিষয়, উন্নত বিষয়। তাই ভালবাসার চর্চায় প্রয়োজন হয় মানবিক যোগ্যতা। পাশবিক চেতনায় ভালবাসা চর্চা করা যায় না। পবিত্র হৃদয় ও উন্নত মনন যার, ভালবাসার অধিকারও তার। প্রসঙ্গত এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। মানব-মানবীর একান্ত যে ভালবাসা তা কি প্রদর্শনযোগ্য কোন বিষয়? বিষয়টি উপলব্ধির ক্ষেত্রে দৈন্য থাকায় কেউ কেউ একান্ত ভালবাসার বিষয়টিকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করে আধুনিক হতে চান। মূর্খতাপূর্ণ এমন আচরণে বেপরোয়া ভাব থাকলেও কোন শুভবুদ্ধির পরিচয় থাকে না। শিল্পের ক্ষেত্রে যেমন পরিমিতিবোধ প্রয়োজন, ভালবাসার ক্ষেত্রেও তা অনিবার্য। ভালবাসা তো একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং মানব অস্তিত্বেই ভালবাসার বীজ বপিত রয়েছে। তাই ভালবাসার বিকাশে ভ্যালেন্টাইন দিবসের মত বিশেষ কোন দিবসের প্রয়োজন নেই। ভালবাসা তো প্রতিদিনের বিষয়।  আর এখানে বলে রাখা ভাল যে, নব্য এই দিবসের বহু আগেই মানব মানবীকে ভালবেসে বলে গেছেন- ‘শুধু তোমার জন্য ওই অরণ্যে পলাশ হয়েছে লাল’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ