ঢাকা, শুক্রবার 17 February 2017, ০৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছাড়পত্র নেই ১১টির ॥ পুরানো চিমনি দিয়ে চলছে ৮টি খুলনার ইটভাটা মালিকরা নিয়ম মানছেন না

খুলনা অফিস: খুলনায় ১৪২টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এসব ইটভাটার মধ্যে কোন ছাড়পত্র নেই ১১টির আর পুরানো চিমনি দিয়ে চলছে অন্তত ৮টি। নিয়ম লঙ্ঘন ও নীতিমালা উপেক্ষা করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা ক্ষমতা, অর্থ ও আধিপত্যের মাধ্যমে এসব ইটভাটা গড়ে তুলেছে। ইটভাটাগুলোতে আবার বিভিন্ন প্রকার কাঠ ও সীসা পোড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে দূষিত হচ্ছে সংশিষ্ট এলাকার পরিবেশ। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এর বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ ইটভাটাগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয়। আর কাঠ পোড়ানোর পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। তবে একদম বন্ধ হয়নি। খুলনা পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী আবাদ জমিতে বা ভাটার তিন কিলোমিটারের মধ্যে ৫০টি গাছ বা বাগান থাকলে ভাটা স্থাপনের কোনো নিয়ম নেই। লোকালয় থেকে তিন কিলোমিটার দূরে যেখানে জনবসতি নেই এমন জায়গায় ইটভাটা নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু খুলনার উপজেলাগুলোতে কৃষি জমি দখল করে প্রতি বছর গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন নতুন ইটভাটা। একই সাথে ইটভাটার জন্য সর্বোচ্চ তিন একর জমি ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ইটভাটায় এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। নদীপাড় সংলগ্ন এলাকায় প্রভাবশালীরা সরকারি জমি জবরদখল করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ভাটা গড়ে তুলছে।
পরিবেশ অধিদফতরের তালিকা অনুযায়ী খুলনার ৯ উপজেলায় ১৪২টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ইটভাটার মধ্যে ১১টির পরিবেশের কোন ছাড়পত্র নেই আর পুরানো চিমনি দিয়ে চলছে ৮টি। অপরদিকে জেলা প্রশাসকের তালিকা অনুযায়ী খুলনায় লাইসেন্সকৃত ভাটা ১১০টি। এ অবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ইটভাটার তালিকায় ব্যাপক গরমিল রয়েছে।
জানা গেছে, ওই সব ইটভাটাগুলোর মধ্যে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি জেলার ফুলতলা উপজেলার মেসার্স নিউ সুপার ব্রিকস, মেসার্স ইউনাইটেড ব্রিকস, ডুমুরিয়া উপজেলার মেসার্স নূরজাহান ব্রিকস, মেসার্স এবি ব্রিকস, মেসার্স সেতু ব্রিকস, ও মেসার্স আল আমিন ব্রিকসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। বিএসটিআই এর গুণগতমান সনদ অর্থাৎ সিএম লাইসেন্স গ্রহণ না করে ইট বিক্রয় ও বিতরণ করায় এসব মামলা দায়ের হয়।
এছাড়া ডুমুরিয়া উপজেলায় হাসান ব্রিকস, ইয়াজবি ব্রিকস, রাবেয়া ব্রিকসসহ বেশ কয়েকটি ইটভাটার বৈধ কোন অনুমোদন নেই। ওইসব ইট ভাটা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ইট ভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও মালিকরা ২/১ দিন পরই দেদারছে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে এসব ইট ভাটায় বিভিন্ন প্রকার কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজার ও পঞ্চু গ্রামের বাসিন্দা সৈকত হোসেন ও ফারুক মোড়লসহ একাধিক লোকজন জানান, নদীর পাশে প্রভাবশালী যে যার মত করেই ইটভাটা গড়ে তুলেছে। এসব ভাটায় গোপনে কাঠ ও মাঝে মধ্যে সীসা পোড়ানো হচ্ছে। ফলে সংশিষ্ট এলাকার পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ছে।
আনিছুজ্জামান ও আক্তার শেখসহ বেশকিছু কৃষক জানান, ইটভাটার কারণে প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শস্য উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। নারিকেল গাছে নারিকেল ধরলেও তাতে পানি থাকছে না। আম গাছে মুকুল এলেও আম ধরছে না আগের মতো। সুপারি ফলনও কমে যাচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার হাসান ব্রিকস, ইয়াজবি ব্রিকস, রাবেয়া ব্রিকসসহ কয়েকটি ইটভাটার মালিক জানান, বেশিরভাগ ইটভাটা এভাবেই চলে। তবে কাঠ পোড়ানোর পরিমাণ কমে গেছে। আর লাইসেন্স নেয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গুটুদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা সরোয়ার বলেন, অনেক ইটভাটার ট্রেড লাইসেন্স নেয়নি। তাছাড়া পরিবেশের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেই। তবু তারা ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রশাসন নামেমাত্র অভিযান পরিচালনা করলেও ভাটা মালিকরা অধিকতর প্রভাবশালী হওয়ায় সবাইকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করছে। ফলে যত্রতত্র গড়ে উঠছে ইটভাটা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইশরাত জাহান বলেন, খুলনা বিভাগের ২৯৯টি ইটভাটায় পরিবেশের ছাড়পত্র নেই। ২৫৫টি ইটভাটা এখনও ৮০-১২০ ফুট চিমনির রয়েছে। তবে শতকরা ৬৭ ভাগ ইটভাটা ঝিকঝাকে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অবৈধ ইটভাটাগুলোয় নিয়মিত অভিযান করে জরিমানা করা হয়। কাঠ পোড়ানো আগের তুলনায় কমেছে। তবে একদম বন্ধ হয়নি। বর্তমানে খুলনা জেলায় ১৪২টি ইটভাটার মধ্যে ছাড়পত্র নেই ১১টির।
খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে অবৈধ ইটভাটা থাকলে তার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। তবে চলতি মাসেই অবৈধ ইট ভাটার বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ