ঢাকা, শনিবার 18 February 2017, ০৬ ফাল্গুন ১৪২৩, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকারি স্থাপনায় রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার বেড়েই চলেছে

স্টাফ রিপোর্টার: সরকারি ভবন বা স্থাপনাতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার দিনদিন বেড়েই চলেছে। সারাদেশে সরকারি ভবন তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা একের পর এক ফাঁস হলেও এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কটাক্ষমূলক মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অবস্থা এমন যে, সরকারই যেন এর বৈধতা দিয়েছে। সরকারের মন্ত্রীরাও বাঁশ ব্যবহারের পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন। একের পর এক ভবন ও স্থাপনায় বাঁশ ব্যবহারের কারণে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। যে কোনো সময় এসব স্থাপনা ভেঙ্গে পড়ে অসংখ্য মানুষের হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভবন নির্মাণ কিংবা রেল স্লিপার রক্ষায় বাঁশ কখনই লোহার বিকল্প হতে পারে না। কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত লাভের জন্য সাধারণ মানুষকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি তারা দেখছেন নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে। এ অবস্থায় বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সূত্র মতে, গত প্রায় এক বছর আগে সরকারি স্থাপনায় রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহার ধরা পড়ে। তখন এটা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তেমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা এলেও এসব কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো নেয়া হয়নি। গত এক বছরে এ রকম অন্তত চারটি ঘটনা উন্মোচিত হলেও শুধু একটির প্রকল্প পরিচালকসহ দুই কর্মকর্তাকে ‘শাস্তিমূলক বদলি’ করা হয়। আরেকটি ঘটনায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের এক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া দু’টি ঘটনায় দুদকের করা মামলায় দু’জন ঠিকাদার জামিনে রয়েছেন।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বদলিকে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ধরা যায় না। ছোটখাটো অপরাধের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দুর্গম কোনো স্থানে বদলির বিষয়টি প্রথা হিসেবে চালু আছে। কিন্তু বিধি অনুসারে এটা শাস্তি হিসেবে গণ্য নয়। তিনি বলেন, এটা একটা গুরুতর অপরাধ। এসব ঘটনা প্রচুর মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

সূত্র মতে, এই সময়ের মধ্যেই রেলের স্লিপার রক্ষায় বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ি ব্যবহারের আরও দু’টি ঘটনা উন্মোচিত হলেও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বদলে এর পক্ষে সাফাই গেয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি রেলমন্ত্রী বলেছেন, রেল লাইনে বাঁশ ব্যবহার অপরাধ নয় বরং এটি উপকারী। 

এ বিষয়ে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, বাঁশের সমস্যা হলো, এটা পানি শোষণ করে। যে কারণে এটার আয়তন বাড়ে। এ জন্য কংক্রিট ভেঙে যায়। জামিলুর রেজা চৌধুরী আরও বলেন, আমি এটাকে চুরি করা বলবো। মুনাফা বেশি করার জন্য বাঁশ দিয়ে দিয়েছে। এটা বাংলাদেশে বহু জায়গায় হয়ে আসছে। যারা এটা তদারকি করেন, তাদেরও যোগসাজশ থাকতে পারে। সবাই মিলে টাকাটা হয়তো ভাগাভাগি করে নেয়। এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে।

ইস্পাতের রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি উন্মোচিত হয় চুয়াডাঙ্গা জেলায়। গত বছরের এপ্রিল মাসে জেলার দর্শনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্মাণাধীন একটি ভবনে রডের পরিবর্তে বাঁশের চটা ব্যবহারের ঘটনা জানাজানি হলে কাজ বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। পরে ওই প্রকল্প পরিচালক সাদেক ইবনে শামছসহ আরও দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। সাদেক ইবনে শামছকে প্রথমে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হলেও সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা সেখানে তার যোগদানের বিরোধিতা করলে তাকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ তদারকি ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা মেরিনা জেবুন্নাহার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয় ইন্টারন্যাশনালের মালিক মণি সিং, তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুস সাত্তার, প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ আইয়ুব হোসেন ও অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেনকে আসামি করে দামুড়হুদা থানায় একটি ফৌজদারি মামলা করেন। এছাড়া জয় ইন্টারন্যাশনালকে কালো তালিকাভুক্ত করে অধিদপ্তর। পরে চুয়াডাঙ্গার আমলি আদালত মামলার তদন্তভার দুদকে ন্যস্ত করেন। এ ঘটনায় মণি সিংকে গ্রেফতার করা হলেও তিনি এখন জামিনে আছেন।

একই মাসে গাইবান্ধায় মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার (ওয়াশ ব্লক) নির্মাণ কাজেও ইস্পাতের রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের খবর আসে গণমাধ্যমে। এ ঘটনায় জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী আল আমিনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী আরিফ বিল্লাহকে। পরে দুদকের করা মামলায় তিনিসহ ওই কাজের ঠিকাদার আবদুল খালেক সাময়িক কারাভোগের পর বর্তমানে জামিনে আছেন। গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের আরেকটি ঘটনা প্রকাশ পায়। এদিন নতুন ভবনের তৃতীয় তলার লিফটের সামনের অংশের টাইলস খুলে বাঁশ বেরিয়ে আসে। তবে এ ঘটনায় গণপূর্ত অধিদফতরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ঘটনা প্রকাশের দেড় মাস পর ১৯ ডিসেম্বর দুদকের রাজশাহীর উপপরিচালক শেখ ফাইয়াজ আলমের নেতৃত্বে প্রাথমিক তদন্তকাজ সম্পন্ন হয়। এর আগে ১৮ নবেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হারুন-অর-রশীদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি তদন্তে আসে। এখনো তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে পাবনার সুজানগর উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের বিন্যাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের দু’টি কক্ষের দরজার ওপরের ঢালাই ভেঙে বাঁশের লাঠি বেরিয়ে আসে। এ ঘটনার পর বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সেখানে ক্লাস না করানোর জন্য লিখিত নির্দেশ দেয় উপজেলা শিক্ষা বিভাগ। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কর্তৃপক্ষ ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা এখন বিদ্যালয়ের বাইরে খোলা মাঠে ক্লাস নিচ্ছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম বলেন, ‘এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যালয় পরিদর্শন করে মৌখিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে লিখিত চাওয়া হলেও তিনি তা দেননি।’

গত বছর ৭ মে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভবন তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারে অনিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রকৌশলীদের নির্মাণ কাজের ‘কোড অব এথিক্স’ মেনে চলার আহ্বান জানান। এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি উপস্থিত প্রকৌশলীদের উদ্দেশে বলেন, এতে একদিকে যেমন জনগণের টাকার অপচয় হচ্ছে, তেমনি জনভোগান্তিও বাড়ছে। এছাড়া কিছু অসাধু লোকের জন্য আপনাদের সুনামও হানি হচ্ছে। দেশে-বিদেশে আপনাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছে। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, তবে এখানে বলতে চাই, আপনারা যদি বৈজ্ঞানিক কোনো প্রযুক্তি বের করতে পারেন, যাতে বাঁশ লোহার চেয়ে শক্তিশালী (হবে), তাহলে কোনো কথাই হবে না।

রেলসেতুতে স্লিপার রক্ষায় বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি নজরে আসে গত বছর ডিসেম্বর মাসের শেষে। তথ্য অনুসারে, সিলেট-আখাউড়া রেলপথের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ২০৬ নম্বর মনু রেলসেতুর শতাধিক নষ্ট স্লিপার স্থানচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে ফালি করা বাঁশ বসিয়ে পেরেক ঠুকে রাখা হয়। যে সেতুটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন বা কেপিআই) হিসেবে চিহ্নিত এবং যার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করে। পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মনু রেলসেতু থেকে বাঁশের ফালি অপসারণ করলেও এ ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের উলিপুর পাঁচপীর স্টেশনের কাছে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সংলগ্ন মুক্তারাম ত্রিমোহনী এলাকায় ও টগরাইহাট স্টেশনের কাছে জোতগোবর্ধন এলাকার প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ রেলসেতুর ওপর কাঠের স্লিপার পোক্ত করতে আড়াআড়ি বাঁশের ফালির ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া কোথাও কোথাও স্লিপার ঠিক রাখতে কাঠের গুঁড়ি ও সাইকেলের টায়ার ব্যবহারও চোখে পড়ে।

এ নিয়ে দুর্ঘটনার শঙ্কা প্রকাশ করা হলেও তা উড়িয়ে দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ২৩ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এতে দুর্ঘটনা ঘটার কোনো অবকাশ নেই। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রেলসেতুর ওপর স্থাপিত কাঠের স্লিপার যাতে ‘আউট অব স্কয়ার’ না হয় এবং একত্রে জমা হতে না পারে, এ জন্য কোনো কোনো রেলসেতুতে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে স্থানীয়ভাবে বাঁশের ফালি বা চেরাই কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, এটা একটা সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, যাতে কাঠের পুরোনো স্লিপারগুলো কম নড়াচড়া করে। কিন্তু কোনোভাবেই এটা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। বরং এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

ভবন নির্মাণে বাঁশের ব্যবহারসহ নির্মাণ কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে দুদককে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি করেন, তাদের যখন বিচারের আওতায় আনা হয় না, বরং অনেক সময় সুরক্ষা দেয়া হয়, তখন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এটার বিস্তার ঘটে। এখন তা নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। এটা যেমন দুঃখজনক, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত শঙ্কার। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যায়, তাহলে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। 

দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বলেন, বিভিন্ন সরকারি দফতরে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনুসন্ধানের জন্য এর মধ্যেই কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দল গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতরও আছে। এছাড়া রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা ও গাইবান্ধার ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে বলে জানান দুদক সচিব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ