ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে অমর একুশে পালিত

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহান ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী -ছবি : বাসস

সাদেকুর রহমান: অমর একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্যদিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দেশে-বিদেশে ৬৫তম মহান ভাষা শহীদ ও ১৮তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। ভাষা শহীদদের প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা, বিন¤্র ভালবাসা ও শহীদ মিনারে ফুলের ডালি নিবেদনের মাধ্যমে জাতি তাদের কৃতী-সন্তানদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ইউনিয়ন ও গ্রামে-গঞ্জে ভাষা শহীদদের স¥রণে নির্মিত শহীদ মিনারগুলোতে একুশের প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। সারাদেশের শহীদ মিনারগুলোতে গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে জনতার ঢল নামে। রাতভর ফুলে ফুলে ভরে যায় এসব শহীদ মিনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একুশের প্রথম প্রহরে জাতির পক্ষ থেকে ভাষা শহীদদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একুশের প্রথম প্রহর থেকে গতকাল দিনভর শহীদদের স্মৃতির প্রতি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন পাশপাশি কবিতা পাঠের আসর, আলোচনা সভা,আলোকচিত্র প্রদর্শনী, প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, সুন্দর হস্তাক্ষর ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন অনষ্ঠানের মধ্যদিয়ে দিবসটি পালিত হয়। এসব অনুষ্ঠান ছাড়াও মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাষা শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া, মোনাজাত এবং প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।

 বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে সকালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে দোয়া ও মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত মোনাজাতের আগে সকাল দশটায় বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে কুরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে। দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। অন্যদিকে সকাল ৮টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজিমপুর কবরস্থানে সকল ভাষা শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে কুরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকায় প্রাপ্ত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। মিশনের বঙ্গবন্ধু অডিটরিয়ামে ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা ৩০ মিনিট থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর পর্যন্ত ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান চলে। এরপর বঙ্গবন্ধু অডিটোরিয়ামে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দিবসটি উপলক্ষে প্রদত্ত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়। রাত সাড়ে দশটার পর শুরু হয় শহীদ দিবস উপলক্ষে উন্মুক্ত আলোচনা। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও কলামিস্টসহ বিভিন্ন পেশার বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাঙালি উপস্থিত ছিলেন।

একুশের প্রথম প্রহরে মিশনে স্থাপিত শহীদ মিনারে স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেনের নেতৃত্বে মিশনের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর কনস্যুলেট জেনারেল অফিস, সোনালী এক্সচেঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মহিলা আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শেখ হাসিনা মঞ্চ ইন্ক, শেখ রাসেল শিশু-কিশোর সংস্থা, গোপালগঞ্জ জেলা সমিতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং উপস্থিত প্রবাসী বাঙালিগণ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

 প্রথম প্রহরে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষা আন্দেলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে প্রেসিডেন্ট এবং এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’ বাজানো হয়। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাদের মাগফিরাত কামনা করেন।

এর পরেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মন্ত্রীবর্গ ও দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, কূটনীতিকবর্গ, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। 

রাত ১টা ২২ মিনিটে শহীদ মিনারে আসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা। পরে তারা শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

এর আগে কূটনীতিকবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সেক্টর কোমান্ডার্স ফোরাম নেতৃবৃন্দ, অ্যাটর্নি জেনারেল ও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। 

প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সহযোগী সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ একে একে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন।

পরে পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ক্র্যাব), আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাংবাদিক ফোরাম, ইয়ুথ জার্নালিস্টস ফোরাম বাংলাদেশ (ওয়াইজেএফবি), রুর‌্যাল জার্নালিস্টস ফোরামসহ (আরজেএফ) বিভিন্ন সংগঠন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এ শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব চলে বেলা ১২টা পর্যন্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আয়োজিত এ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২টা বাজার ১০ মিনিট আগে শহীদ মিনারে পৌঁছেন। প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ১২টা বাজার ৭ মিনিট পূর্বে শহীদ মিনারে আসেন। প্রেসিডেন্ট শহীদ মিনারে পৌঁছলে রাষ্ট্রীয় রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাকে স্বাগত জানান। এরপর রাত ১টা ২২ মিনিটে শহীদ মিনারে আসেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির নেতাকর্মীরা। পরে তারা শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

মা কিংবা বাবার হাত ধরে অনেক শিশু-কিশোরও এসেছে শহীদ মিনারে। শুধু শিশু কিংবা কিশোর নয়, এসেছেন বয়স্করাও। পলাশীর মোড়ে রফিক তোরণের মুখে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, র্যাব ও আর্মডপুলিশ ব্যাটেলিয়ানের সদস্যরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়ে। হাতে বাংলা বর্ণমালা এঁকে শহীদ মিনারে বাবা নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে এসেছিল রাবেয়া। সে বলছিল, ‘মায়ের ভাষা বাংলা, আমি মাকে যেমন ভালবাসি তেমনি ভালোবাসি বাংলা ভাষাকেও।’

বাঙালি জাতির জন্য এ দিবসটি চরম শোক ও বেদনার হলেও মায়ের ভাষা ‘বাংলা’র অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। সেই ত্যাগের স্বীকৃতিসরূপই জাতিসংঘের উদ্যোগে সারাবিশ্বে ভাষা শহীদদের স্মরণে দিবসটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গত কয়েক বছর ধরেই দিবসটি পালিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৩টি দেশ এ দিবসটি পালন করে।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠির চোখ-রাঙ্গানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের এ দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠীর প্রভুসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।

ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন ‘মায়ের ভাষা’র মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নব প্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। পরবর্তী নয় মাস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যদিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সংযোজিত হয় নতুন এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশ- ‘বাংলাদেশ’।

দিবসটি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আজিমপুর কবরস্থানসহ একুশের প্রভাতফেরি প্রদক্ষিণের এলাকায় চার স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শহীদ মিনারকে ঘিরে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, আজিমপুর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে গতকাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। এদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। 

বাংলাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা করার দাবি: বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবে চান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘বাংলা ভাষাকে আমরা জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের ৩২ কোটি বাঙালির এটা দাবি।’ সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলা বিশ্বের সপ্তম ভাষা। কাজেই জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবে আমরা বাংলা চাই।’ এর আগে সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

‘আমি ভালো বাংলা বলতে পারি’: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা জনসেমুদ্রে ছিলেন বিদেশী নাগরিকেরাও। সকালে কালো পাঞ্জাবি পরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসেছেন ইতালির নাগরিক ফাদার জোওয়া। কাছে গিয়ে পরিচয় দিতেই স্পষ্ট ও দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আমি ভালো বাংলা বলতে পারি।’

১০ বছর ধরে এই ধর্মযাজক বাংলাদেশে কাজ করছেন। প্রতিবছরই আসেন ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। জোওয়া বললেন, বাংলার মানুষের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলতে তার বড্ড ভালো লাগে। তিনি একপর্যায়ে ক্ষোভ নিয়ে বললেন, ‘এদেশের মানুষ বাংলার জন্য অনেক গর্ব করে। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে, মানুষ এত ইংলিশ ভাষা বলে কেন? অনেক বাঙালি ছেলেদের সঙ্গে কথা বলি আমি। তারা দুটি শব্দ বাংলায় বলে আর দশটা বলে ইংরেজিতে। একি অবস্থা!’

ইতালির আরেক নাগরিক ফ্রাঙ্কো শামাসিসা শহীদবেদিতে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে মিনারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কথা হয় তার সঙ্গে। তার ইংরেজিটা অতটা ঝরঝরে নয়। দোভাষীর মাধ্যমে ফ্রাঙ্কো বললেন, বাংলাদেশের এত মানুষ মাতৃভাষার প্রতি অনেক গর্ব করে, শ্রদ্ধা জানাচ্ছে-এটা দেখে তিনি অনেক খুশি। 

সাদা শার্ট ও কালো কোর্ট-প্যান্ট পরে ছয় চীনা নাগরিককে দেখা গেল শহীদ মিনারে ফুল দিতে। ভাষাকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে প্রত্যেকের চোখেমুখে দেখা যাচ্ছিল উচ্ছ্বাস। ফুল দেয়া শেষে তারা শহীদবেদিতে ওঠেন। তারা স্কাউট ও বিএনসিসি স্বেচ্ছাসেবকদের ফুল দিয়ে সাজানো বিভিন্ন নকশা ঘুরে দেখেন। নিজেদের স্মার্টফোনে ছবি তোলেন মুহূর্তটা ধরে রাখতে।

জার্মানির নাগরিক জুলুইজ বাংলাদেশ ঘুরতে একমাস আগে এসেছেন। মাতৃভাষার প্রতি এদেশের মানুষের শ্রদ্ধাবোধ তাকে মুগ্ধ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতটা সময় নারী ও শিশুরা দাঁড়িয়ে আছে শুধু ফুল দেয়ার জন্য। ভাষার প্রতি এতটা শ্রদ্ধা আর কোনো জাতির আছে বলে তার জানা নেই।

বায়ান্নর স্মৃতি নিয়ে শহীদ মিনারে ৩৫ ভারতীয়: ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার দাবিতে উত্তাল দেশ। তখন আমার বয়স ছিল ১৪, ক্লাস সেভেনে পড়ি। তবে ভাষার দাবিটা ঠিকই অনুধাবন করতে পারছিলাম। মায়ের ভাষা বাংলার বদলে উর্দুকে মেনে নিতে পারিনি। তাই কোটালিপাড়ার স্কুল ত্যাগ করেছিলাম কয়েকজন সিনিয়র ভাইয়ের সঙ্গে। 

কথাগুলো বলছিলেন দিপক দাম। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন এক সময়ের গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার বাসিন্দা এই ভারতীয় বাঙালি। তিনি বলেন, আন্দোলনের কারণে ভাষার দাবি ফিরে পেলেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে বাধ্য হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিলেও এদেশের প্রতি ভালবাসা কমেনি একটুও। শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুধু তিনি নন, পরিচয় ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস হলিডেসদ নামে সংগঠনের ব্যানারে এসেছেন আরও ৩৪ বাঙালি। এ সময় স্মৃতিচারণ করেন দিপক দাম, সঙ্কু মুখার্জি অনিমেষ চ্যাটার্জিরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ