ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মোবাইল ফোনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব

মোবাইল নামে বেশি পরিচিত সেল বা মুঠোফোনের ব্যাপক বিস্তার ও ব্যবহার বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের সমাজেও নানামুখী অশুভ পরিণতির কারণ হয়ে উঠেছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, আইফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুকসহ আধুনিক প্রযুক্তির অনেক ভালো ও শিক্ষণীয় দিক থাকলেও বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসবের ব্যবহার হচ্ছে খারাপ কাজে। আর ব্যবহারও বেশি করছে শিশু-কিশোর ও তরুণরা। উদ্বেগের কারণ হলো, বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং ও যোগাযোগের পাশাপাশি তারা পর্নোগ্রাফি দেখতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চালানো জরিপের পর মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তার এক গবেষণা রিপোর্টে জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকার স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের ৭৭ শতাংশই মোবাইল ও ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফি দেখছে। পর্নোগ্রাফির সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের ওপর। ফলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে তারা যৌনতার বিষয়ে আগ্রহী ও তৎপর হয়ে উঠছে, যার পরিণতিতে চরিত্রের দিক থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শিশু-কিশোর ও তরুণদের বিরাট অংশ। মেয়েরাও পিছিয়ে থাকছে না। সব মিলিয়েই বাংলাদেশের সভ্য ও ধর্মপরায়ণ মানুষের সমাজে সুস্থ নৈতিকতা ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে।
মোবাইল ফোনের কারণে অন্যভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। বাসা-বাড়ি, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ অফিসে ও মার্কেটে তো বটেই, রাস্তায় চলতে চলতেও মোবাইলে কথা বলছে মানুষ। আইনে নিষিদ্ধ করা হলেও ব্যক্তি মালিক থেকে শুরু করে কার ও বাস-ট্রাকের চালক পর্যন্ত সকলে গাড়ি চালানোর সময়ও মোবাইলে কথা বলছে। এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে। রেলওয়ের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ১৪২ কিলোমিটার এলাকায় গত বছর ২৩০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০৬ জনেরই মৃত্যু ঘটেছে মোবাইলে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়ার কিংবা রেললাইন দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়। ভীতিকর একটি তথ্যও জানিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ। সে তথ্যটি হলো, গত বছরের শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই যমুনা সেতু পর্যন্ত এলাকায় যে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ২৫ জনই মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল। রেলওয়েরই অন্য এক পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, গত বছর নয় মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনে ও এর আশপাশে ৭২৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগের হাতেই মোবাইল ফোন ছিল। সে কারণে ধারণা করা হচ্ছে, সকলে না হলেও ৭২৯ জনের মধ্যে একটি বড় অংশই মোবাইলে কথা বলার কারণে মারা গিয়েছিল। এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে জানানো দরকার, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলায় যেসব দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলোতে শুধু চালকদেরই অপমৃত্যু ঘটে না, মারা যায় অনেক পথচারী এবং অন্য গাড়ির লোকজনও। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বহু মানুষকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। অনেকে এমনকি সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বও বরণ করে। পাশাপাশি রয়েছে গাড়িসহ মালামালের ক্ষয়ক্ষতির নানাদিকও।
দৈনিক সংগ্রামের আলোচ্য রিপোর্টটিতে মোবাইলে কথা বলার কারণে সংঘটিত বেশ কিছু সড়ক দুর্ঘটনার এবং সেসব দুর্ঘটনার প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কিত তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। সেই সাথে রয়েছে সামাজিক ক্ষেত্রে মোবাইলের নেতিবাচক প্রভাব ও পারিবারিক সম্পর্কে ভাঙন ও দূরত্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত কিছু আশংকাজনক তথ্যও। দেখা যাচ্ছে, ধনি-গরিব নির্বিশেষে সব পরিবারেই পিতামাতা ও অভিভাবকরা নিজেরাও আজকাল মোবাইল নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকছেন। খাবার টেবিলে বসে পর্যন্ত তারা আগের মতো সন্তানদের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন না। মায়েরা সন্তানের প্লেটে খাবার তুলে দেয়ার সময় পাচ্ছেন না। সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যাপারেও খোঁজ-খবর তারা কমই রাখছেন। ফলে বয়সের স্বাভাবিক দোষের পাশাপাশি মোবাইলও আচ্ছন্ন ও গ্রাস করছে সন্তানদের তথা শিশু-কিশোর ও তরুণদের। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। ওদিকে পথে-ঘাটে দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের। এরও কারণ মোবাইল ফোনই।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই মোবাইল ফোন বাংলাদেশের সমাজ জীবনে সর্বাত্মক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। অথচ একই প্রযুক্তিকে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন অনেক দেশ দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। এখানে পার্থক্য আসলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যবহারের। আমরা মনে করি, বাংলাদেশেও অনতিবিলম্বে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এর শুরু হতে হবে পরিবার থেকে। পিতামাতা ও অভিভাবকদের উচিত নিজেদের সংশোধন করা। অন্তত সন্তানদের সামনে আপত্তিকর ও চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজে ব্যবহার করার পরিবর্তে তারা যদি শুধু কথা বলার এবং ভালো কোনো কাজে মোবাইল ব্যবহার করেন তাহলে সন্তানরাও এ থেকে শিক্ষা নেবে এবং তারাও মোবাইলের ব্যবহারে সংযমী হয়ে উঠবে। নিজেরা সংযত থাকলে পিতামাতা ও অভিভাবকরা সন্তানদের শাসন করার নৈতিক অধিকার ফিরে পাবেন, যেটা অনেকেই ইতিমধ্যে খুইয়ে ফেলেছেন। আমরা চাই, খাবার টেবিলে মায়েরা আগের মতো সন্তানদের দিকে লক্ষ্য রাখবেন এবং তাদের প্লেটে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার তুলে দেবেন। টেলিভিশন সেটের সামনে এবং পারিবারিক আলোচনার সময়ও সন্তানদের ভালো কিছুই শেখাতে হবে। মোবাইল ফোনের খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে সন্তানদের বুঝিয়ে বলতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে সরকারের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। দু’চারটি ওয়েবসাইট বন্ধ করলে কিংবা গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা শুধু আইন করে নিষেধ করলে চলবে না। আইন ভঙ্গ করার অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ারও পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে সব মিলিয়েই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার, যাতে মোবাইলের অপব্যবহার বন্ধের জন্য দেশে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয় এবং শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে পিতামাতা ও চালকসহ প্রত্যেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যাপারে এগিয়ে আসেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ