ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৬৫ বছরেও ভাষা আন্দোলনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি

এম. কে. দোলন বিশ্বাস : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর পেরিয়ে গেছে ৬৫ বছর। এ সাড়ে ছয় দশকেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি ভাষা আন্দোলনের। ফলে ভাষা আন্দোলনের আজ একে একে ৬৫টি বছর অতিবাহিত হলেও বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগে মজবুত কোনো ভিত্তি গড়ে তোলা যায়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ প্রশাসন, রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা-প্রযুক্তির প্রসার, ভাষার উন্নয়ন আর পাহাড়িদের ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে তেমন কোনো প্রদক্ষেপ স্বাধীনতার পরবর্তী কোনো সরকারের আমলনামায় নেই। এ দীর্ঘ সময়েও করা হয়নি জাতীয় ভাষানীতি। শহীদের রক্তস্নাত বাংলা ভাষা ও বানানের শৃঙ্খলা রক্ষায় নেই কোনো আইন। বানানে সমতা আনতে ভাষানীতি প্রণয়নের দাবি ভাষাবিদরা বরাবরই জানিয়ে এলেও তা দাবিতেই আজ পর্যন্ত বন্দী রয়েছে। ব্যক্তি বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ভাষা-পরিকল্পনার কাজ সম্ভব হলেও ভাষানীতি প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন কঠিন বলে তারা সরকারি উদ্যোগে ভাষানীতি প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছেন।
হয়নি ভাষা জরিপ এবং জাতীয় ভাষানীতি : ভাষা আন্দোলনের পর গত ৬৫ বছরেও হয়নি ভাষা জরিপ কার্যক্রম। ফলে ভাষা আন্দোলনের আজ ৬৫ বছর অতিবাহিত হলেও বাংলা ভাষার যথাযথ প্রয়োগ রয়ে গেছে অন্ধকারেই। এছাড়া স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে কোনো সরকার জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিতসহ ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে সরকারের নেই জাতীয় কোনো ভাষানীতি।
জানা যায়, বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৮৭ সালে প্রণীত ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, এরপর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৈরি ‘বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ’ আর বাংলা একাডেমির প্রণীত ‘প্রমিত বানানরীতি’ দিয়েও জাতীয় ভাষানীতির অভাবে বাংলা বানানের ক্ষেত্রে সমতা আনা সম্ভব হচ্ছে না। ভাষানীতি না থাকায় সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করছে না। ফলে পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে নানা উদ্যোগ নিয়েও বাংলা বানানের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য দূর করা যাচ্ছে না।
বলাবাহুল্য, বাংলা ভাষা ব্যবহারের বেহাল অবস্থা আর বানান-নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ সরকারের নির্দিষ্ট ভাষানীতি না থাকা। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের এক আদেশে ‘৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিপরিষদের সভাসহ বিভিন্ন সরকারের আমলে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। ভাষানীতি না থাকায় সেসব সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে কার্যকর করার দিকে কোনো সরকার হাঁটতে পারেনি। ফলে সর্বস্তরে বাংলা আজো চালু হয়নি। ভাষানীতির অভাবে বাংলা চ্যালেঞ্জের মুখে ও দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি চালু করলেও সরকারি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বানানে ওই রীতি অনুসরণ করা হয় না। প্রমিত রীতি ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বাংলা একাডেমির প্রচার আটকে আছে ‘৯৪ সালে প্রচারিত একটি পোস্টার আর প্রতি বছর অভিধান প্রকাশের মধ্যে। ওই বানানরীতি চালুর সময় তা প্রচারের জন্য যেসব সিদ্ধান্ত হয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন আজো ঘটেনি। এছাড়া জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতিতে খুব বেশি ‘অমিল’ না থাকলেও ‘ভাষানীতি’ না থাকায় ওই দুই প্রতিষ্ঠানের বানানের ক্ষেত্রেও সমতা আসছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ফাউন্ডেশনেরও আছে আলাদা বানানরীতি। কোনো কোনো প্রচারমাধ্যমও নিজস্ব বানানরীতি অনুসরণ করছে। আইন না থাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অনেক ব্যক্তি বানানের ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচার করছেন বলে অভিযোগ আছে। সরকারের কোনো ভাষা ব্যবহারে নীতিমালা না থাকায় এসব বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
জানা যায়, ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি আঞ্চলিক ভাষার জরিপ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর উদ্যোগে কার্যক্রমটি শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়। জরিপের প্রশ্নমালাও সাজানো হয়। জনগণকে কার্যক্রমটি সম্পর্কে জানান দিতে বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ওই সময় পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়। শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইউম তখন দেশের তিনটি উপজেলায় প্রশ্নমালার ভিত্তিতে জরিপও করেন। তিনি তখন বাংলা একাডেমির সঙ্কলন বিভাগের সহকারী অধ্যক্ষ ছিলেন। তবে ওই কার্যক্রমও পরে সফলতার মুখ দেখেনি।
ড. আবদুল কাইউম এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘আঞ্চলিক ভাষা ও শব্দের রূপ নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৬২ সালে আঞ্চলিক ভাষার জরিপ কার্যক্রমটি শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়। আঞ্চলিক ভাষার রূপ বিষয়ে গবেষণার জন্য এ রকম জরিপ খুবই দরকার। স্বাধীনতার পর ভাষা জরিপ ও ভাষানীতি প্রণয়নে কোনো সরকারের উদ্যোগ নেয়ার কথা শুনিনি।’ বাংলা একাডেমি থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির এখন এ জাতীয় কোনো কার্যক্রম নেই।
ভাষা গবেষকদের মতে, জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন ১৮৯৮ সালে ‘ভারতীয় ভাষাগুলোর জরিপ’ শুরু করেন, যা তিনি ১৯২৭ সালে বই আকারে ২০ খণ্ডে প্রকাশ করেন। জরিপে তিনি ভারতবর্ষে প্রচলিত ১৭৯টি ভাষা আর ৫৪৪টি উপভাষার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডর আর নমুনা উপস্থাপন করেন। ওই বইয়ের পঞ্চম খণ্ডে আছে বাংলা ভাষাবিষয়ক আলোচনা। এরপর অনেক বছর পার হলেও বাংলা ভাষা বিষয়ে আর কোনো জরিপ হয়নি।
২০০৭ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ বইয়ের ষষ্ঠ খণ্ডে দেশের ১৫টি অঞ্চলের উপভাষার পরিচয় ও ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়। তবে দেশে প্রচলিত ভাষাগুলোর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য সামগ্রিকভাবে সেখানে উঠে আসেনি বলে অনেকের অভিমত। (তথ্যসূত্র : যায়যায়দিন- ২১.০২.২০১৫)
আদালতে অকার্যকর বাংলা : আইন করেও আদালতে চালু করা যায়নি বাংলা ভাষার। জানা যায়, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ প্রণয়ন করার আজ ২১ বছর পরও উচ্চ শিক্ষা ও উচ্চ আদালতে কার্যকর হয়নি বাংলা ভাষা। বলাবাহুল্য, হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের রুল এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রধান অন্তরায়। ১৯৮৭ সালের আইনে বাধা থাকলেও বিধির কারণে বিদেশি ভাষায় আবেদন-নিবেদন, আপিল, ডিক্রি ও রায় দেওয়া হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর রায় বাংলা ভাষায় লিখে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে গেছেন।
মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত : আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা কার্যকর না হওয়ায় রাষ্ট্রের নাগরিকরা সাংবিধানিকভাবে পাওয়া মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হয়েও ন্যায়বিচারপ্রার্থী হিসেবে মানুষ আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়ের মতো। যে ভাষায় বিচারকের সঙ্গে তার আইনজীবী কথা বলেন, তিনি তা বুঝতে অক্ষম। যে ভাষায় বিচারক রায় দিচ্ছেন, তিনি তা বুঝতেও অক্ষম।
অপেক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা : ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা একাডেমির একুশে অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার প-িতরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে তা হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করে দেব। সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ কিন্তু এর পরও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা কার্যকর করতে নানা আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করছে কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।
সংবিধানে যা বলা হয়েছে : বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সংবিধানের এই বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর করা হয়। এই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশিদের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের ছোয়াল জওয়াব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার‌্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে।’ ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপীল করেন, তাহলে উহা বে আইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’ এর পরও হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রুল এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি এ ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।
আইনে যা বলা আছে : হাইকোর্ট বিভাগের রুলে চতুর্থ অধ্যায়ের ১ নং বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্টে দাখিলকৃত দরখাস্তগুলোর ভাষা হবে ইংরেজি। তবে পঞ্চম অধ্যায়ের ৬৯ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ এবং ডিক্রি আদালতের ভাষায় প্রস্তুত করতে হবে। সেই সুবাদে আদালত দরখাস্তের ভাষার অনুরূপ ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের সুবিধা লাভ করছেন। একইভাবে দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারায় আদালতের ভাষা নির্ধারণ করতে গিয়ে ১৩৭(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো আদালতে সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা ব্যতীত অন্য কিছু লিখিতভাবে সম্পাদন করার জন্য অত্র কোর্ট আদেশ যা অনুমোদন করে তা ইংরেজিতে লেখা যাবে।’
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে কোনো ফৌজদারি আদালতের বিচারিক রায় আদালতের ভাষায় অথবা অন্য কোনো ভাষায়- যা আসামী অথবা তার আইনজীবী বুঝতে সক্ষম সে ভাষায় ঘোষণা অথবা উক্ত রায়ের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করতে হবে।’ সুপ্রিম কোর্টের রায়েও বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার সুযোগ বিবৃত হয়েছে। (তথ্যসূত্র : বা.প্রতি- ২১.০২.২০১৫)
ভুল বানানের ছড়াছড়ি : ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পার হলেও আমাদের ভাষা-বানান নির্ভুল করে লেখার অভ্যাস পর্যন্ত হয়নি। ভুল’ শব্দটি লেখার সময়ই অনেকে ভুল করে লেখে ‘ভূল’। ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যে প্রভাতফেরি হয়, সেখানে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে রক্তলাল-অক্ষরে লিখে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ জানানো হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির শ্রদ্ধা নিবেদনে সামান্য খাদ থেকে যায়; তারা লেখে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী!
রাজধানীর দোকানপাট, প্রতিষ্ঠান-ভবনের সাইনবোর্ডগুলোর দিকে তাকালেই বাংলা ভাষার করুণ অবস্থা বোঝা যায়। রাতের নগরে রঙিন আলোর খেলায় সাইনবোর্ড, দেয়াললিখনে একটু মনোযোগ দিলেই ভড়কে যেতে হয় হাজারো ভুল বানান দেখে। ‘রেস্তোরাঁ’ শব্দটি প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায় ‘রেঁস্তোরা’ বা ‘রেস্তোরা’ বানানে। ‘বেগম রোকেয়া সরণিকে ভুল বানানে লেখা হচ্ছে ‘বেগম রোকেয়া স্মরণী’ বা ‘বেগম রোকেয়া স্বরণী’। সরণি মানে পথ বা রাস্তা। অর্থাৎ রোকেয়ার নামের পথটি হচ্ছে রোকেয়া সরণি। ‘গোল চত্বরকে ভুল বানানে লেখা হচ্ছে ‘গোল চক্কর। এতে ‘চত্বর’ আর ‘সরণির অর্থই পাল্টে যাচ্ছে।
রাজনীতিকদের বানানের ওপর ‘অগাধ জ্ঞান’ দেখে তো রীতিমতো ভিড়মি খাওয়ার জোগাড়। দেয়ালে চোখ পড়লে প্রায়ই দেখা যায় ‘জাতীর পিতা। শুদ্ধ বানানটি হচ্ছে ‘জাতির পিতা। অনেক সময় ছাত্রসংগঠনগুলোকে অদ্ভুত ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। ব্যানারে কী ভয়াবহ বানান! প্রায়ই লেখা থাকে ‘দূরশ্বাষনের, ‘বিরোদ্ধে, ‘কণ্ঠ সুর, ‘স্বইরাচারী, ‘বিক্ষুভ’ ইত্যাদি ভুল। (সঠিকগুলো হবে- দুঃশাসন, বিরুদ্ধে, কণ্ঠস্বর, স্বৈরাচারী, বিক্ষোভ)। সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বানানের অবস্থাটা আরো করুণ। ‘সুপ্রীম কোর্ট, ‘আপীল. ‘রেজিষ্ট্রার, ‘সরকারী, ‘লিঁয়াজো’ ইত্যাদি (প্রমিত বানান হবে : সুপ্রিম কোর্ট, আপিল, রেজিস্ট্রার, সরকারি, লিয়াজোঁ) সরকারি প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো লেখা রয়েছে বর্জিত ‘সরকারী’ বানানটি। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ঢুকতেই ভুল বানানটি শিখে ফেলে।
দেশের সর্বত্র যেন চলছে ভুল বানানের মহড়া। ‘সাইনবোর্ডে ভুল, টেলিভিশনের স্ক্রলে ভুল, পত্রিকার পাতায় ভুল। ভুলের রাজ্যেই যেন আমাদের বসবাস। এসব ভুল শব্দ প্রতিদিন দেখতে দেখতে একদিন আমরাও ভুলে যাই সঠিক শব্দটি। অথচ ইংরেজি বানান কেউ ভুল করে না। যত অবজ্ঞা আর অবহেলা বাংলা বানানে!
আমরা বলতে চাই, ভাষার শৃঙ্খলা ও নিজের ভাষা রক্ষা করতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভাষানীতি আছে। উপযুক্ত ভাষানীতির মাধ্যমে নিউজিল্যান্ডের বিলীন হতে বসা মাউরি ভাষা রক্ষা পায়। শ্রীলংকা, ইকুয়েডর, জাপান, জার্মানি ও ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ মাতৃভাষা রক্ষা করতে ভাষানীতিতে অনড়। অথচ ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর আমরা ভাষানীতি করতে পারিনি। এটা আমাদের শুধু ব্যর্থতা নয়। চরম লজ্জার বিষয়ও।
আমরা মনে করি, দেশে ভাষা জরিপ না হওয়ার প্রধান কারণ, এটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের চেতনা ও সচেতনতা নেই। ভাষা জরিপ না হওয়ায় আমাদের উন্নয়ন ও গবেষণা ক্ষেত্রে ভাষাবিষয়ক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে না। যদিও ভাষা আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার। অথচ আজো উচ্চশিক্ষায় ও উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। আর একারণেই ভাষা আন্দোলন সমাজে আজো পূর্ণতা পায়নি। আজ ভাষানীতি ও ভাষা জরিপ শুধু প্রয়োজনই নয়, জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণও। শুধু উচ্চ আদালত নয়, উচ্চ শিক্ষায়ও বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে না। এটি খুবই পীড়াদায়ক। এসব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা যারা কার্যকর করবেন, তাদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যা একান্ত সবার জন্যই অঙ্গল। তবে আমরা এতটুকু আজ নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জন্য ভাষানীতির দরকার। কেনো এ নীতি এখন পর্যন্ত করতে হয়নি, এর যথাযথ জবাব ভাষাবিদরাই ভালো দিতে পারবেন। যা সাধারণের জন্য নিতান্তই দুষ্কর। আর আমার মতো একাধিকবার কারাগারে বসবাসকারীর পক্ষে আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খবর নেওয়ার মতোই বটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ