ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাঙালি সংস্কৃতির উৎস সন্ধানে

মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম : বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চল এবং উত্তর অঞ্চলের মাটি সমভাবে গঠিত না-একদিকে পলি মাটির আস্তারণ অন্যদিকে প্রস্তরিভূত মাটির আস্তারণ। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী দু’ অঞ্চলের জনপদ দুভাবে গঠিত হয়ে এসেছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল যে বহু প্রাচীন, তাতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের বহু জায়গায় মাটি খুঁড়ে নিচ থেকে মানুষ যখন পাথরের তৈরি অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতো-সেই যুগের নানা অস্ত্র পেয়েছেন। তা থেকে অনুমান করা যায় যে, বাংলাদেশে প্রস্তর যুগের কাল থেকে মানুষ বসবাস করে আসছে। প্রত্ন প্রস্তর যুগ অথবা নব্য প্রস্তর যুগ কিংবা তাম্র যুগ যে কাল থেকেই মানুষ বাংলাদেশে বাস করুক না কেন অন্তত কয়েকটি বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী যে এ অঞ্চলে বাস করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আর্য অধিকারের পূর্বে এদেশে দ্রাবিড়দের বাস ছিল। বহুকাল পর্যন্ত প্রাচীন দ্রাবিড় জাতি অসভ্য বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু মহেঞ্জদারো আবিষ্কারের পর এ ধারণা পাল্টে যায়। করাচীর দুই শত মাইল উত্তরে সিন্ধু নদীর পশ্চিম তীরে ১৯২২-২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঁচ বছরব্যাপী খুঁড়ে খ্রিস্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বের এই শহর আবিষ্কৃত হয়েছে। আর্যরা এ দেশে আসবার বহুকাল পূর্বে দ্রাবিড়দের দ্বারা এই শহর স্থাপিত হয়। সভ্য জগতের সাথে সম্পর্কিত পাকা রাস্তা, তামা-কাসার নানা রকম অস্ত্র-শস্ত্র-ইত্যাদি মাটি খুঁড়ে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এসব থেকেও সভ্যতার দিক থেকে অধিক মূল্যবান যে প্রমাণ, মহেঞ্জদারোতে পাওয়া যায় তাহলো মহেঞ্জদারোর নাগরিকদের সীলমোহর। এই সীলমোহর থেকে প্রমাণিত হয় দ্রাবিড়দের ভিতরে লেখার চর্চা ছিল-তা সে লেখা যে পর্যায়ের হোক।। প্রাচীনকালে ব্যবিলোন, আসিরিয়া, সুমেরিয়া ও মিশরে এই ধরনের সীলমোহরের বহু প্রচলন ছিল। নরম কাদা অথবা অপর কোনো কিছুর ওপরে এই মোহরের চাপ দিলেও তার ছবি মুদ্রিত হতো।
দ্রাবিড়দের পূর্বপুরুষ ফোরাত ও দজলা নদীর (বর্তমান ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস) মধ্যবর্তী ব্যবিলোনিয়া অঞ্চল থেকে এদেশে আগমন করেন। প্রাচীন আসিরীয় ও ব্যবিরুষ জাতি এবং ভারতে দ্রাবিড় জাতি একই সেমেটিক গোত্রের মানুষ। প্রাচীন মিশরীয় ও আরব জাতিও এই সেমেটিক গোত্র থেকে উদ্ভূত। আর্য সভ্যতার বহু পূর্বে মিসর, আসিরীয়, সুমেরিয়া, ব্যবিলোনিয়া ও ভারতবর্ষে এই সভ্যতা প্রসার লাভ করে। সম্প্রতি ভারতের নাগপুরে মহেঞ্জদারোর অনুরূপ একটি সীলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে। বর্তমান তা নাগপুরের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই সীলমোহরের মাঝখানে দুটি বড় মানুষের মূর্তি, চন্দ্র, সূর্যের চিহ্ন ও তিনটি ছোট মানুষের মূর্তি আছে। মোহরের ডানদিকে দুই পংক্তি লেখাও আছে। বড় দুটি মূর্তির মধ্যে একটি ব্যবিরুষীয় দেবতা আদাদের মূর্তি। আদাদ প্রাচীনকালে সিরিয়া দেশে আমরু নামে পূজিত হতো।
প্রাচীনকালে আর্যবর্তের হিন্দুদিগের মত দাক্ষিণাত্যে, শব দাহ করবার রীতি ছিল না।  সেখানকার দ্রাবিড় সমাজের মৃতদেহ সমাধিতে রাখা হত। সমাধিতে রাখার পূর্বে মৃতদেহ একটি মাটির তৈরি শবাধারে পুরে তা সমাধিস্ত করা হত।  দাক্ষিণাত্যের এমনি একটি প্রাচীন সমাধি খুঁড়ে তার ভিতর থেকে মাটির শবাধারে মানুষের শবদেহ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এটা বর্তমান কলকাতা মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। এই ধরনের কঠিন বা শবাধার প্রাচীন ব্যবিরুষের ধবংস্তূপের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।  মিসরে পিরামিডের ভিতরে পাথরের শবাধার শব রাখবার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু শব রাখার প্রণালীটি দক্ষিণ-ভারত, ব্যবিলোন, আসিরিয়া ও মিসরে প্রায় সর্বত্রই একই রকম। হয়ত হতেও পারে এই অভ্যাস থেকে সেমেটিক গোত্রের আরবি মুসলমানদের ভিতরে গোর দেবার প্রথা প্রচলিত হয়েছিল। কুরআনে মানুষের মৃতদেহ কবরস্থ করার একটি ধর্মীয় ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে-কাবিল কর্তৃক হাবিল নিহত হলে লাশ কবরস্থ করার পূর্বের ঘটনায়-অতঃপর আল্লাহ একটি কাক (গুরাবান) পাঠালেন, যে তার ভ্রাতার মৃতদেহ কিভাবে গোপন করা যায় (কবরস্থ) তা দেখাবার জন্য মাটি খনন করতে লাগল। সে বলল-হায়! আমি কি এই কাকের (আল-গুরাবি) মতও হতে পারলাম না। অতঃপর সে অনুতপ্ত হলো। (৫:৩১, ৫:৩১)। এসব বিষয় থেকে সহজেই প্রমাণ হয় যে, প্রাচীন ব্যবিরুষ ও পাক ভারতের দ্রাবিড় একই গোত্রের সানুষ।
কিন্তু ব্যবিরুষ ও পাক ভারতীয় দ্রাবিড়দের মধ্যে আদিম সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা কারা তা নিয়ে মতভেদ আছে। অধিকাংশ পন্ডিতের মতে, ব্যবিরুষ আদিম সভ্যতার জন্মভূমি। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদ হলের অনুমান করেন পাক-ভারতই দ্রাবিড় সভ্যতার জন্মভূমি।  তার মতে, পাক ভারত থেকেই এই সভ্যতা পশ্চিম অঞ্চলে ক্রমে বিস্তৃতি লাভ করে। হলের অনুমান যে সত্য নয়, তা কয়েকটি বিষয় থেকে বুঝতে পারা যায়। প্রথম কুরআনে এই বিষয়ে একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বলা হয়েছে-নিশ্চয়ই মানবজাতির (আদম আঃ থেকে) জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায় (মক্কা), তা বরকতময় এবং বিশ্বজগতের দিশারী। (৩:৯৬)। আমি এই কল্যাণময় কিতাব অবতীর্ণ করেছি যা তার পূর্বেকার কিতাবের প্রত্যায়নকারী এবং যা দ্বারা তুমি  জনপদ (উম্মুল ক্বুরা) মক্কা ও তার চতুষ্পার্শ্বের লোকদের সতর্ক কর এবং সতর্ক করতে পার কিয়ামত দিবস সম্পর্কে, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। (৬:৯২, ৪২:৭)।
প্রত্নতত্ত্ববিদ ম্যাসপেরো ব্যবিরুষের চেহলদিন  দিগের বিস্তৃত আলোচনা করে দেখিয়েছেন-প্রথম যুগে সেমেটিকরা নিজেদের যুদ্ধে-বিগ্রহে লিপ্ত থাকবার কারণে তাদের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব না হলেও খামুরাবী ও হামুরাবীর কাল থেকে সেমেটিক সভ্যতা ক্রমে সিরিয়া ভিতর দিয়ে উত্তর আফ্রিকায় ও গ্রীসেও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। ব্যবিরুষের সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে এই সময়ের বারটি রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস জানতে পারা যায়। তা থেকে ব্যবিরুষদের শক্তি, ক্ষমতা, সভ্যতা ও বিস্তার লাভ করবার  যথেষ্ট ক্ষমতার বিষয়ে জানা যায়। এমনি ক্ষমতা সেকালের পাক ভারতীয় দ্রাবিড়দের ভিতর ছিল বলে ধারণার করবার মতো কোনো ইতিহাসসম্মত প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি এবং তারা যে পাক ভারতের বাইরে কোথাও অভিযান করেছিলেন তারও কোনো প্রমাণ নেই।
 ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় শক্তিশালী জাতির নিজ বাসভূমিতে খাদ্যাভাব ও যথেষ্ট ভূমির অভাবেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পৃথিবীতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে হয়েছে। এক একটি মানবগোষ্ঠী প্রধানত অর্থনেতিক ও ধর্মীয় কারণেই এক দেশ ছেড়ে নানা আপদ-বিপদ স্বীকার করে অপর দেশে বসতি স্থান করতে গিয়েছে।  যে দেশে প্রচুর ঊর্বর জমি ও জীবনযাত্রার পথ সহজ ছিল সে দেশ থেকে বড় কেউ অন্যত্র বাস করতে যায়নি। এই কারণে আরব, মধ্য এশিয়া, জাপানী, ইংরেজ, ডাচ, পর্তুগীজ, ফরাসী, প্রভৃতি জাতির যেমন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তদ্রুপ জার্মান, পোলিস, রুশীয় ও ভারতীয় ঠিক তেমনভাবে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েনি।
ফোরাত ও দজলা নদীর মধ্যবর্তী সামান্য উর্বর অঞ্চল প্রাচীন বর্ধিষ্ণু ব্যবিরুষ জাতির জন্য নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিবেচিত হয়নি।  পাক ভারতীয় দ্রাবিড়দের ব্যবিলোনিয়ার সামন্য এক খ- ভূমি নিয়ে যুদ্ধ বিগ্রহ করবার কোনই প্রয়োজন ছিল না। তাদের উত্তরে ও পূর্বে অনাবাদি বিশাল মহাদেশ পড়েছিল, যার যেদিকে খুশি গেলেই চলতো। মেসোপটেমিয়া অঞ্চল থেকেই যে দ্রাবিড়রা এদেশে এসেছিল তার আর একটি বড় প্রমাণ এদেশের প্রাচীনতম লিপি। এদেশের প্রাচীনতম লিপি খরোষ্টি দক্ষিণ থেকে বামে লিখিত হতো। নেমীয় লিপিও দক্ষিণ থেকে বামে লিখিত হয়।  খরোষ্টি লিপি যে সময়ে এদেশে প্রচলিত ছিল-সেকালে অপর কোনো লিপির এদেশে প্রচলন ছিল বলে জানা যায় না। প-িতরা অনুমান করেন যে, এ লিপি সুমেরিয়া থেকেই পাক ভারতে আমদানি করা হয়। ভারত থেকে দ্রাবিড়রা মেসোপটেমিয়ায় গিয়ে থাকলে -সে অঞ্চলে ভারতীয় লিপি প্রচলিত থাকার কথা। কিন্তু মহেঞ্জদারোর যুগে যে লিপি প্রচলিত ছিল তা সুমেরিয়ায় পাওয়া যায়নি।
পাক ভারতের ভূমি সৃষ্টির ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায় প্রাচীনকালে আরব সাগর আরাবল্লীর পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।  সেকালে মহেঞ্জোদারো বা হরপ্পা সৃষ্টি হয়নি।  সুমেরিয়ান সভ্যতা মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাচীন।  ব্যবিলোনিয়া, আনিরিয়াও মহেঞ্জদারো ও হরপ্পা থেকে প্রাচীন। বুদ্ধের জীবনীতে দেখা যায় খ্রি. পূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর পূর্বে পৃুথিবী অর্থে বুঝাত হাজার হাজাার দ্বীপ বেষ্টিত চারটি মহা দ্বীপ-জম্বু, উত্তর কুরু, পূর্ব বিদেহ ও অপর গোযান। জম্বু দ্বীপই পাক-ভারত। হিমালয় প্রদেশ তখন সাগরগর্ভে।
পাঁচ হাজার বৎসরের পুরাতন পৃথিবীতে মানুষ সমুদ্রের তীরে বসবাস করেনি। তখনকার দিনে আধুনিক সমুদ্রতীরবর্তী বন্দর ও সুন্দর শহর নির্মিত হয়নি। তখনকার কালের পৃথিবীর মধ্য অঞ্চল ছিল মেসোপটেমিয়া থেকে মধ্য এশিয়ার পশ্চিম অংশ পর্যন্ত।  এই অংশ থেকেই মানুষ ক্রমে ক্রমে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষি পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়বার যতটা সম্ভাবনা, প্রান্ত থেকে মধ্যভাগে ছড়িয়ে পড়বার সম্ভাবনা মোটেই তেমন নই।  ঐতিহাসিক যুগে আরব জাতিও ঠিক এই সব পথেই পাক-ভারত মহাসাগরের দ্বীপে , মালয়ে, আফ্রিকায় ও উত্তর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল্ ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই এর নিকটবর্তী থান অঞ্চল তারা আক্রমণ করেছিল, তার পর ব্রোচ, দেবল উপসাগর, কালাতের চতুর্দিকস্থ আল-কিরান অঞ্চল, দক্ষিণ আফগানিস্থান, মাকরাণ প্রভৃতি হস্তগত করে অবশেষে মুহাম্মদ ইবনে কাশিমের নেতৃত্বে সিন্ধু দেশ জয় করেছিলেন। কিন্তু এই সময়ে অথবা পূর্বে পাক ভারত থেকে কেউই আরব দেশ আক্রমণ করেনি। সুতরাং দ্রাবিড়রা যে মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ অঞ্চল থেকেই এদেশে এসে বাস স্থাপন করে তা স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই।
সম্প্রতি ভারতীয় ইতিহাসে দ্রাবিড়রা শিব ও শিবলিঙ্গের উপাসক ছিল বলে তা প্রচার করবার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহেঞ্জোদারোতে শিব, শিবলিঙ্গ বা কালী মূর্তি কিছুই পাওয়া যায়নি। যেসব মূর্তি পাওয়া যায়, তার উপর কল্পনার রং ছড়িয়ে সেগুলোকে আধুনিক ভারতীয় দেব-দেবীতে পরিণত করবার চেষ্টা চলছে। বলা বাহুল্য, এমনি উদ্ভট কল্পনার প্রাচুর্যেই ইতিহাস বিকৃত হয়ে যায়।
আর্যরা দ্রাবিড়দের মতো বিশাল শহর নির্মাণ করে বাস করত না। দ্রাবিড় যুগে পাথর ও তামার প্রচলন ছিল, সোনা ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী যুগে পিতলও ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু দ্রাবিড়রা লোহার ব্যবহার জানত না। প্রত্ন প্রস্তর অথবা নব্য প্রস্তর যুগে ব্যবিরুষ, আসিরিয়া, সিন্ধুর উপত্যকা, দাক্ষিণাত্য বা বাংলাদেশ কোথাও লোহা ব্যবহৃত হয়নি। নৃতাত্ত্বিকদের মতে বর্তমান বাঙালি জাতি প্রাচীন দ্রাবিড় ও মঙ্গোলীয় জাতির সংমিশ্রণে উৎপন্ন। বাঙালিদের মস্তিষ্ক আকৃতি, নাকের গঠন ও ক্ষর্বকায় দেহের গঠন, তাদের দ্রাবিড়-মঙ্গোল উৎপত্তিরই পরিচয়ক। দ্রাবিড়দের ভাষা অনার্য্য। তাদের অধিকাংশ বর্তমানে মধ্য-ভারত ও দাক্ষিণাত্যে বাস করেন। দ্রাবিড় ও অন্য গোত্রের মিশ্র সম্প্রদায় ভারতের প্রায়ই সর্বত্রই দেখা যায়। আর্য্য আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই দ্রাবিড় ও মঙ্গোলই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অধিবাসী বলে মনে করা হয়।
প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ সুনীতিকুমার চট্টোপধ্যায় তার ‘ভারত-সংস্কৃতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন-খ্রিস্টের জন্মের ৩০০০ বৎসর আগে পূর্ব মধ্যসাগর অঞ্চলে ক্রীট দ্বীপে ও লিসিয়া প্রভৃতি এশিয়া-মাইনরের দক্ষিণ অঞ্চলের দেশে  আদি দ্রাবিড়দের অর্থাৎ দ্রাবিড় ভাষীদের বাস ছিল। তাদের জাতীয় নাম ছিল সম্ভবত দৃমিল অথবা দৃম্মিঝ, পরবর্তীকালে লুসিয়ার লোকেরা এই নাম তৃম্মিলিরূপে লিখিত, এবং খ্রিস্ট পূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রীক ঐতিহাসিত হেরোডোটাস এই নাম তের্মিলাইরূপে লিখে গেছেন। আর্য্যরা পরবর্তীতে এই নাম দ্রবিড়রূপে রূপান্তরিত করে নেয়। এই জাতির লোকেরাই কোন সময়ে আর্য্যদের আগমনের বহু পূর্বে ইরাক, ইরান ও বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে , পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে উপনিবিষ্ট হয় এবং ষেকান থেকে রাজপুতানা মহারাষ্ট্র হয়ে এই জাতি, তাদের ভাষা ে সভ্যতা নিয়ে দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত হয়।এরা গাঙ্গেয় উপত্যকাতেও বাস করতে থাকে। ভূমধ্যসাগর অঞ্চল থেকে তারা স্থানীয় নৌকা গঠন রীতি, স্থানীয় পুরুষ প্রকৃতির পূজা প্রভৃতি নিয়ে আসে। তাঁর মতে, ভারতের সভ্যতায় দ্রাবিড়দের আহৃত উপাদান আর্য্যের দানের চেয়ে অনেক বেশি বলেই মনে হয়। নাগরিক সভ্যতার উন্মেষ প্রথমে দ্রাবিড়দের মধ্যে হয়। (পৃ-২১-২২)।
ডেনমার্কের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ দল ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৯ সালের দিকে বাহরাইন দ্বীপে খনন কার্য চালিয়ে ‘দিলমুন’ নামে একটি সভ্যতার  নিদর্শন আবিষ্কার করেন। সভ্যতা বিশেষ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে মহেঞ্জদারোর সমসাময়িক কালে অর্থাৎ খ্রিস্টের জন্মের ২৫০০ বৎসর পূর্বে। এই দিলমুন সভ্যতার সাথে সুমেরীয় ও পাক ভারতীয় দ্রাবিড় সভ্যতার সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। দিলমুনদের কবর দেওয়ার অভ্যাস, সীলমোহর এবং ইমারত গঠন রীতি সুমেরীয় ও পাক ভারতীয় দ্রাবিড় রীতির সাথে এক। দিলমুনরা সকলেই সমুদ্রগামী জাহাজে বাণিজ্যে লিপ্ত। সুমেরীয় ও পাক ভারতের ভিতরে বাণিজ্য উপকরণও এরাই বহণ করত। এরাই পাক ভারতের রাজন্যবর্গ ও ধনীদের জন্য মোতি সরবারাহ করত। ধারণা করা হয় ১৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে দিলমুন সভ্যতা পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে লুপ্ত হয়ে যায়। ডক্টর আব্বাস ফারুকীর লিখিত ‘দ্য বাহরাইন আই ল্যাণ্ড’ গ্রন্থে দেখা যায়-আরব ইতিহাস অনুসারে ‘দিলমানরা থামুদ (ছামুদ) গোত্রের’ মানুষ। ব্যবিলোনীয় উৎকীর্ণ লিপিতে তাদেরকে তিলমুন বলা হয়েছে। তখনকার দিনে বাহরাইনের রাজধানী ছিল তিলমুন। ৭২২ থেকে ৭০৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে আসিরীয় রাজা উপারী বাহরাইনে রাজত্ব করতেন। এ্খান থেকে এই কথা প্রমাণিত হয় যে, সুমেরীয় ও ভারতের সাথে সম্পর্কে আরব দেশই সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছে।  জন মার্শাল ও রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় উভয়ের মতে দ্রাবিড়গণই সুমেরিয়া থেকে ভারতে আসেন অর্থাৎ দ্রাবিড় জাতি আরবের মূল অধিবাসী এবং তাদের ভাষাও আরবি।
পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি সভ্যতার নাম মেসোপটেমিয়া। খ্রিস্ট পূর্ব ৫০০ অব্দে ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। খননে এই অঞ্চলটির বিভিন্ন সভ্যতার যুগে রেকর্ডকৃত বহু দলিল-পত্র পাওয়া যায়, যা এই সময়েই যে বন্যা হয়েছিল তা উল্লেখ করে। কিভাবে দুর্যোগ সংঘটিত হল এবং এর কি পরিণতি হয় তা লিখে রাখার তাগিদ অনুভব করেছিল নূহ (আঃ)-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে থাকা এই সভ্যতাগুলো।  মনে করা হয় খ্রিস্ট পূর্ব ২৮০০ অব্দে সুমেরীয় সভ্যতা ঐতিহাসিক যুগে পদার্পণ করে এবং চরম উত্থান লক্ষ্য করা যায় খ্রিস্ট পূর্ব ২৯০০-৩০০০ অব্দে, এপর তারা গযবে (বন্যায়) পতিত হয়। সুমেরীয়, আক্কাদীয়, অ্যামোরাইট, ক্যাসাইট, আসিরীয় এবং ক্যালডীয় জাতিগোষ্ঠী মিলে প্রাচীনকালে ভূ-খণ্ডে একটি উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। গবেষণায় জানা যায়, বন্যার বেশিরভাগ উপাখ্যানগুলোর উৎপত্তি এই মেসোপটেমিয়া অঞ্চল থেকেই। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যাবলি দ্বারাও প্রমাণ করা সহজ হয়েছে যে, বাস্তবিকই এ অঞ্চলে এক বিশাল বন্যার ঘটনা ঘটেছিল। খকনকার্য চালিয়ে এই বিশাল দুর্যোেেগর সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলিও বর্তমান মাটি খুঁড়ে বের করে আনা হয়েছে।
মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে খননকার্য চালিয়ে জানা সম্ভব হয়েছে যে, জলোচ্ছ্বাস এবং ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর প্লাবনের ফলে এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ আক্রান্ত হয়েছে। খ্রিস্ট পূর্ব ২০০০ অব্দে মেসাপটেমিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত ‘উর’ নামক এক বৃহত্তর জাতির শাসক অব্বিসিন এর সময়কালে একটি বছরের উল্লেখ করা হয়েছে-স্বর্গ ও মর্ত্যরে সীমানা মুছে দেয়া বন্যার পর আগত বছর হিসেবে। উর ছাড়াও কিশ নগরী, ইরেখ ও শুরূপ্পাক নগরীতেও খননকার্য চালিয়ে সেই বন্যার চিহ্ন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন, মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম, আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞাননের দৃষ্টিতে হযরত নূহ (আঃ)-এর বন্যা, মাসিক অগ্রপথিক, এপ্রিল -২০০৯, পৃ-৯৫-১০০)।
কুরআনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মতে, এ পৃথিবীতে সেই বন্যার পর নূহ (আ). এবং কতিপয় মুমিনকে সেই প্লাবন থেকে রক্ষা করা হয় এবং তাদের দ্বারা পুনরায় এ পৃথিবীকে আবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। তাদেরই কোন বংশধররাই যে আজ এ উপমহাদেশের কোনো বাসিন্দা নই তা জোর দিয়ে বলার অবকাশ নেই। এটি ওমস্টাডের লেখা-হিস্টরি অব পার্সিয়িান এ্যাম্পায়ার-এ দেখা যায়-সুমের দেশের মহাপ্লাবনের বিবরণ সম্বলিত যে প্রাচীন মৃৎ চাকতি ক্লে-ট্যাবলেট আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে লেখা রয়েছে-মহাপ্লাবনের আগে ব্যবিলনে দশজন রাজা রাজত্ব করেছেন। তার ভিতর সবচেয়ে যিনি কম করেছেন ১৮৬০ বছর এবং যিনি দীর্ঘতম সময় সিংহাসনে ছিলেন, তিনি ছিলেন ৪৩২০ বছর। প্লাবনের পর রাজার রাজ্য শাসন নেমে এল স্বর্গ থেকে।’ এখান থেকেও নূহ (আঃ)-এর সময় যে বন্যা হয়েছিল তার প্রমাণ মেলে।
বিশ্ববিশ্রুত ইতিহাস স্বীকৃত ঐশীগ্রন্থ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আলোকে আজ এ দাবি প্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত যে, নূহ (আঃ)-এর এক সন্তানের নাম ছিল সাম। ইতিহাসে তাঁর বংশধরকে সেমেটিক বলা হয়। এই সামের পাঁচটি পুত্র ছিলেন বলে জানা যায়। তারা হলেন-আরফাখশাজ, লাওজ, ইরাম, দাশোজ ও গেলীম। এদের প্রত্যেকের বংশধররা বিরাট বিরাট মানব সভ্যতার পত্তন গড়লেন। আরফাখশাজের পুত্র শালেখ ও তাঁর পুত্র হলেন আবির। এই আবিরের পুত্র হলেন ফালিগ ও কাহতান। ফালিগের বংশে জন্ম নিলেন ইবরাহিম (আঃ) ও বনী ইসরাঈলের নবীরা। পক্ষান্তরে কাহতানের পুত্র আবু ফীর চলে এলেন প্রথমে সিন্ধু ও পরে গংগাতীরবর্তী দ্রাবিড় সভ্যতার পত্তন করতে।  সুতরাং সেমেটিক সভ্যতার উৎস সামের প্রপৌত্র ও আবিরের দৌহিত্র আবু ফীর হলেন ভারতীয় দ্রাবিড়দের আদি পুরুষ। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় আদম নূহ (আঃ)-এর সপ্তম স্তরের বংশধর। সুতরাং দ্রাবিড় সভ্যতাও  সেমেটিক সভ্যতার একটি অন্যতম শাখা। এই আবু ফীর ভারতে এসে তার দাদার নামে দার আবির বা নিজের নামে দার আবু ফীর-দিলেন। এই দার আবু ফীর বা দার আবির থেকেই জন্ম নিল দ্রাবিড় সভ্যতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ