ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভাষা-উৎসব

সতীশ বিশ্বাস : বাংলাদেশে পৌঁছবার পর থেকেই লক্ষ্য করছিলামÑবাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মুখ উজ্জ্বল। এর কারণ, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বুকের মধ্যে রয়েছে বাংলাভাষার অনির্বাণ প্রদীপ। সেই প্রদীপের শিখাতেই বাংলাদেশের প্রতিটি মুখ উদ্ভাসিত। গিয়েছিলাম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র আয়োজিত ‘বঙ্গ অসম উৎকল ২য় আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলন-২০১৭’-তে যোগ দিতে। অনুষ্ঠানটির তারিখ ছিল: ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭। স্থান ছিল: আনন্দ মাল্টিমিডিয়া ইন্টারন্যাশানাল স্কুল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। সম্মেলনে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল: ‘বাংলা ভাষার ইতিহাস চর্চা এবং মহান একুশ’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতবর্ষের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি কবি ড. সুশীল ভট্টাচার্য ডি লিট। নিমন্ত্রিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও উৎকলের প্রায় ২৫জন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষকসহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জেলার শতাধিক কবি সাহিত্যিক। আয়োজক ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র আমাদেরকে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করেন চট্টগ্রাম নগরীর আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা কারিতাস রেস্ট হাউজে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় পবিত্র কোরআন-পাঠের মধ্য দিয়ে। তারপর পাঠ হয় পবিত্র গীতার নির্বাচিত অংশ। এরপর শতকন্ঠে ধ্বনিত হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালবাসি’। সভাগৃহের প্রতিটি মানুষ দাঁড়িয়ে এই জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসম থেকে আসা কবি, সাহিত্যিক তন্ময় বরুয়া, উৎকল থেকে আগত কবি চিন্ময় ও কবি মিথুন চৌধুরী এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রধান অতিথির সহচর হিসাবে আসা ছড়াক্কা-উদ্ভাবক সতীশ বিশ্বাস। সুবৃহৎ এই অনুষ্ঠানটিকে পরিচালনার সুবিধার জন্য ৩টি পর্বে বিভাজন করা হয়েছিল। তিন পর্বের সভাপতি ছিলেন যথাক্রমে ইঞ্জিনিয়ার মো. হোসেন মুরাদ, লেখক কামাল উদ্দিন এবং ইতিহাসবিদ কবি সোহেল মো. ফখরুদ‌-দীন। রাজীব দত্ত ছিলেন সঞ্চালকের ভূমিকায়।
প্রধান অতিথির বহুমুখী পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণ সবাইকে মুগ্ধ করে। বিষয়বস্তুতে তন্নিষ্ঠ থেকে অন্যান্য অতিথিরাও সারগর্ভ আলোচনা করেন। কবি দীপালী ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা কথা বেশি বলি, কাজ কম করি।’ কেউ বলেন, ’মাতৃভাষার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিদেশি ভাষাও শেখা প্রয়োজন।’ কেউ কেউ আবার তুলে ধরেন ভাষা-শহীদদের আত্মবলিদানের কথা।   অনুষ্ঠান শেষ হবার একটু আগেই আমাকে এবং সুশীলবাবুকে দেশে ফেরার প্রয়োজনে উঠে পড়তে হয়। কারণ, বেনাপোল বর্ডারে আসার ওটাই ছিল শেষ বাস। হন হন করে হাঁটছিলাম। দেখলাম একটি কিশোরী মেয়ে (চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণির হবে) ছুটতে ছুটতে এসে ‘দাদু, একটা অটোগ্রাফ দাও’ ব’লে সুশীলবাবুর সামনে তার ছোট্ট খাতাটা বাড়িয়ে দিল। দাদু সই ক’রে, খাতা নাতনিকে ফেরত দিতেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবার প্রৌঢ় সুশীলবাবুর গলা জড়িয়ে ধরেই, যেভাবে এসেছিল সেইভাবেই আবার ছুটতে ছুটতে ফিরে চলে যায়। কোন দিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এই অভাবনীয় স্বর্গীয় মুহূর্তটির প্রত্যক্ষদর্শী থাকলাম আমি। আমার মনে হল, এই ছোট্ট ঘটনাটিই আমাদের বাংলাদেশ ভ্রমণের সারাৎসার। সুশীলবাবুর মতো বর্ষীয়ান মানুষটি হলেন ভারতবর্ষের প্রতিনিধি আর ওই ছোট্ট নিষ্পাপ বালিকা বাংলাদেশের হৃদয়। যে নিবিড় ও অচ্ছেদ্য আত্মীয়তার প্রকাশ ঘটল তার আচরণে-কোন সন্দেহ নেই তা তার নিষ্কলুষ হৃদয় থেকেই উৎসারিত। ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলাম। কানে বেজে উঠল রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি...’।
লেখক: ছড়াক্কা-উদ্ভাবক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কবি, দুর্গাপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ