ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গরুর গোশত নিয়ে অরাজকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ক্রেতারা

এইচ এম আকতার : গরুর গোশত নিয়ে রাজধানীতে চলছে অরাজকতা। ছয়দিনের ধর্মঘট শেষে রোববার রাজধানীতে বিক্রি শুরু হয় গরুর গোশত। কেজিপ্রতি গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে ৪৭০-৫৩০ টাকায়। হাসিল বাড়া ও সরবরাহ কম থাকাকেই এর কারণ বলছেন বিক্রেতারা। পাশাপাশি চাঁদাবাজি বন্ধ করে ন্যায্য দাম বেঁধে দেয়ার সুপারিশ কনজুমার এসেসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের। এসব দাবির সাথে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক মত পোষণ করলেও ব্যবস্থা নিতে গড়িমশি করছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ক্রেতারা।
রাজধানীর কাঁচা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে ছয় দিনের অবরোধ শেষে রোববার অধিকাংশ দোকান খুলেছে। কিন্তু সব দোকানেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে গরুর গোশত। ৪২০ টাকার গরুর গোশত বিক্রি হচ্ছে ৪৭০ টাকায়।
একই বক্তব্য কারওয়ান বাজারের প্রায় সব ব্যবসায়ীর। আর এর কারণ হিসেবে সরবরাহ কম ও পুরোনো সেই বাড়তি ইজারার কথাই বলেছেন তারা। বিক্রেতারা বলেন, গরুর গোশত দাম সাড়ে চারশ টাকা থেকে ৫শ টাকা। এদামে ক্রেতার কিনতে চাইছে না। তবে চড়া দামে গোশত কিনতে নারাজ ক্রেতারা। ক্রেতারা বলেন, এই দামে কোন সাধারণ মানুষ গোশত কিনতে পারবে না।
এদিকে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংস্থা ক্যাব বলছে, চাঁদাবাজি ও অনিয়ম বন্ধ করে বাজার মূল্য ঠিক করে দিতে হবে সরকারকেই।
নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার থেকে বৈধভাবে আমদানি করা ও সব ধরনের অনিয়ম বন্ধ হলে গরুর গোশত তিনশ টাকা কেজিতে বিক্রি সম্ভব বলে জানিয়ে আসছে গোশত ব্যবসায়ী সমিতি।
গোশত ব্যবসায়ীদের ছয় দিনের ধর্মঘট শেষ হয়েছে গত শনিবার। তবে গরুর গোশত নিয়ে অরাজকতা কাটেনি। উল্টো এর গোস্তে দাম বেড়ে গেছে আরও কয়েক ধাপ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গোশতের দাম একেক রকম। এক কেজি গরুর গোস্তের দাম কোথাও ৫৩০ টাকা, কোথাও ৪৮০ টাকা, কোথাও-বা ৪৬০ টাকা। এ অজারকতার জন্য দায়ী কে।
ধর্মঘটের আগে গরুর গোশতের প্রতি কেজির মূল্য ছিল ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা। ধর্মঘট শেষ হওয়ার পর ইচ্ছেমতো দাম রাখা হচ্ছে। গোশত ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। তাই তাঁরা এখন যেমন খুশি দাম রাখছেন।
এদিকে গোশতের বাজার নিয়ে অস্থিতিশীলতার জন্য সংশ্লিষ্টরা একে অপরকে দূষছেন। গোশত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ইজারাদারেরা পশুর হাটে নির্ধারিত খাজনার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি আদায় করছেন। অন্যদিকে, ইজারাদার পাল্টা অভিযোগে বলছেন, গোশত ব্যবসায়ীরা হাট থেকে পশু কিনে হাটের বাইরে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে খাজনার টাকা থেকে কমিশন নিচ্ছেন। এতে ইজারাদারেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ধর্মঘট শুরু করে ঢাকা মেট্রোপলিটন গোশত ব্যবসায়ী সমিতি ও বাংলাদেশ গোশত ব্যবসায়ী সমিতি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত হারে খাজনা, বৈধভাবে ভুটান ও মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি, ট্যানারি স্থানান্তর করে চামড়া বিক্রির সুযোগ ও ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাউল ইসলাম ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের অপসারণ এবং গরু আনায় চাঁদাবাজি বন্ধ- দাবির বাস্তবায়ন করা হলে ৩০০ টাকা দরে প্রতি কেজি গরুর গোশত বিক্রি করা যাবে বলে জানিয়েছিলেন গোশত ব্যবসায়ীরা। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ধর্মঘট স্থগিত করেন তাঁরা। শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ না থাকায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাণিজ্যসচিব দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান, ঢাকা মেট্রোপলিটন গোশত ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, আশ্বাস পেলেও বাড়তি খাজনা আদায় করা হচ্ছে গাবতলীর গরুর হাট থেকে। ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গেও কোনো বৈঠক হয়নি তাঁদের। তাই বাড়তি দামে গরু কিনতে হচ্ছে। গোশতের দামও তাই বেশি। ডিএনসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাউল ইসলাম ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইজারাদারেরা অতিরিক্ত খাজনা আদায় করছেন।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কর্মরত সংগঠন কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন তার দায়িত্ব পালন করছে না। তাদের কারণেই আজ ভোক্তাদের কষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। পশুর হাটে গিয়ে পর্যবেক্ষণ দল সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখতে পারে। পশু সরবরাহের বিষয়টিও নজরদারিতে আনা উচিত। যখন পশু বিভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়, তখন তল্লাশির নামে ব্যাপারীদের হয়রানি করা হয়। সেগুলোর বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এখন গোশত ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটের নামে উল্টো গোশতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
খিলগাঁও, রায়েরবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল সকাল থেকে গোশত বিক্রি হয়েছে ৫০০ টাকা কেজি। সুপার শপগুলোতেও গরুর গোশতের দামে রকমফের রয়েছে। স্বপ্নের আউটলেটগুলোয় গোশত বিক্রি হচ্ছে ৪৯০ টাকা। মীনা বাজারে এর মূল্য ৫৩০ টাকা, কেরি ফ্যামিলিতে ৪৭৫ টাকা।
স্বপ্নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরবরাহের ওপরই তাঁদের গরুর গোশতের দাম নির্ধারণ করতে হচ্ছে। অল্প কিছু হলেও লাভ ছাড়া তো ব্যবসা করা যায় না।
খাজনা পুনর্নিধারণের জন্য গোশত ব্যবসায়ী, ইজারাদার ও ডিএনসিসির একটি বৈঠক আগামী বুধবার অনুষ্ঠিত হবে। ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরবরাহ ঠিক থাকলে এক-দুই দিনের মধ্যে দাম এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। হাসিলের মূল্য পুনর্নিধারণে বৈঠক ডাকা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ