ঢাকা, বুধবার 22 February 2017, ১০ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যাংক খাতে উপেক্ষিত বাংলা ভাষা

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ব্যাংক খাতে মাতৃভাষা বাংলা চরম উপেক্ষিত। কোটি কোটি গ্রাহককে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় লেনদেন করতে হচ্ছে। স্বল্প শিক্ষিতরাও বাধ্য হচ্ছেন ইংরেজিতে লেনদেন করতে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক সহ বেশিরভাগ ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে ইংরেজিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে কোনও ভূমিকাই রাখতে পারছে না। বরং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিতেও উপেক্ষিত বাংলা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫৩টি বিভাগের নামই রাখা হয়েছে ইংরেজিতে। ব্যাংকটির প্রজ্ঞাপন জারি থেকে শুরু করে অধিকাংশ প্রতিবেদন ইংরেজিতে তৈরি করা হয়। বাংলা ট্রিবিউন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা অবশ্য এই অভিযোগ মানতে রাজি নন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে বাংলা উপেক্ষিত বলা যাবে না। তবে ব্যাংক খাতে বাংলার ব্যবহার আরও বাড়ানো জরুরি। বৈদেশিক লেনদেন ছাড়া বাকি সব কিছু বাংলায় হওয়া দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৯৮৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কাজে বাংলা ভাষার প্রচলন শুরু করেছে। যে সব ব্যাংক বাংলাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিদেশি ব্যাংক সহ সব বেসরকারি ব্যাংকের কাগজপত্র বাংলায় করা যায় কিনা, বাংলাদেশ ব্যাংক তা খতিয়ে দেখবে। এছাড়া ব্যাংক খাতে ইংরেজি শব্দ কমানোর চেষ্টাও চালানো হবে।’
জানা গেছে, বেসিক ব্যাংকে লেনদেন সহ টাকা জমা দেওয়ার ফর্ম পূরণ করতে হয় ইংরেজিতে। টাকা ওঠানোর চেকও ইংরেজিতে লেখা। তবে বর্তমানে ব্যাংকটিতে ঋণ সংক্রান্ত সব ফাইল তৈরি করতে হচ্ছে বাংলায়।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘ দিন বেসিক ব্যাংকে ইংরেজির প্রভাব ছিল। এখন অবশ্য ইংরেজির প্রভাবমুক্ত হওয়ার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঋণ প্রস্তাবের জন্য সব ফাইল বাংলায় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা সহ কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম বাংলায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে বিদেশি ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আবেদনপত্র ও বিভিন্ন দলিলে বাংলার অনুপস্থিতির কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন। যদিও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনও পাস হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ খাতে বাংলার প্রচলন বৃদ্ধি করা গেলে আমাদের মর্যাদা আরও বাড়বে। এজন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
সাধারণ মানুষকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এ নিয়ে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কোনও ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইলে তাকে কয়েকটি ইংরেজি ফর্ম দেওয়া হয়। স্বল্প শিক্ষিতদের পক্ষে এটা পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব ফর্মে ২০টিরও বেশি স্বাক্ষর দিতে হলেও সেখানে কি কি শর্ত লেখা থাকে তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। বাংলায় লেখা ফর্ম থাকলে এবং লেনদেনের বই বাংলায় হলে গ্রাহকদের ভোগান্তি অনেক কম হতো।’
জানা গেছে, দেশের ৫৬টি তফসিলভুক্ত ব্যাংকের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংকের হিসাব খোলার আবেদনপত্র ইংরেজিতে লেখা। ব্যাংক খাতে লেনদেনের অন্যতম ঋণপত্রের (এলসি) আবেদন, ঋণ বা বিনিয়োগ আবেদন, আমানত জমাপত্র বা ভাউচার, লকারে সম্পদ রাখার আবেদন ফর্ম, চেক বইয়ের জন্য আবেদনপত্র, চেক বই, টাকা স্থানান্তরপত্র, আরটিজিএস ফর্ম এবং বিভিন্ন স্কিমের আবেদনপত্রও ইংরেজিতে লেখা।
ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটেরও একই অবস্থা। প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি  ব্যাংকের ওয়েবসাইটে যাবতীয় তথ্য লেখা থাকে ইংরেজিতে। ব্যাংকের পরিচিতি, বিভিন্ন ঋণপণ্য ও আমানতের তথ্যও থাকে ইংরেজিতে।
যদিও পৃথিবীর কোনও দেশের ব্যাংক খাতেই সে দেশের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে ইংরেজি গ্রহণ করেছে, এমন নজির নেই। ভারতে ব্যাংকের প্রতিটি কাগজপত্র তিনটি ভাষায় লেখা হয়। ব্যাংকের শাখা যে রাজ্যে, সেই রাজ্যের নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা থাকে সব কিছু।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বাংলা ব্যবহারের কিছু কিছু উদ্যোগ অবশ্য নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে সব ব্যাংককে হিসাব খোলার অভিন্ন আবেদন ফর্ম ও গ্রাহক পরিচিতি সম্পর্কিত ফর্ম চালু করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বিএফআইইউ’র নির্দেশ, এসব ফর্ম বাংলা অথবা ইংরেজি অথবা উভয় ভাষায় মুদ্রণ করা যাবে। তবে ফর্মে আবশ্যিক ক্ষেত্রগুলোতে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ