ঢাকা, শুক্রবার 24 February 2017, ১২ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছায়াঘন পাখি ডাকা এক নিভৃত অমরাবতীতে

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : (গত  ১০/২/১৭ সংখ্যার পর) : এখান থেকে আরো কিছুটা মেঠো পথ অতিক্রম করে আমরা নজিবর রহমানের বসতবাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। সাত বিঘা জমির উপর নির্মিত বিশাল বাড়ি।
বাড়ির সামনে একটি দাখিল মাদ্রাসা ও একটি মসজিদ। দাখিল মাদ্রাসার সামনে বিশাল সামিয়ানা টানিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় এক/দেড় হাজার লোক বসতে পারে এরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে পৌঁছার সাথে সাথে মসজিদ থেকে জু’মার নামাযের সুললিত আযান ভেসে এলো। আমরা সকলে তাড়াহুড়া করে অযু করে মসজিদে ঢুকলাম। ইমাম সাহেব খুৎবা পেশ করলেন। নামায ও মুনাজাত শেষে আমি উপস্থিত মুসুল্লীদের নিয়ে প্রথমে মরহুম নজিবর রহমানের কবর যিয়ারত করতে গেলাম। বিশালাকার বাড়ির উত্তর-পশ্চিমে পাশাপাশি দু’টি কবর। একটি নজিবর রহমানের, আরেকটি তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র গোলাম বতুর। গোলাম বতু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পরীক্ষা দেয়ার পর কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর পরীক্ষার ফল বের হলে দেখা গেল তিনি পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নজিবর রহমান তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রের অকাল মৃত্যুতে এত ভেঙ্গে পড়েছিলেন যে, এরপর তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ‘দুনিয়া আর চাই না’, ‘দুনিয়া কেন চাই না’, ‘বেহেস্তের ফুল’, ‘নামাযের ফল’ ইত্যাদি গ্রন্থাদি রচনা করেন। এসব গ্রন্থে যেমন হতাশা ও দুঃসহ দুঃখ-বেদনার কথা আছে, তেমনি ইবাদতের মাহাত্ম্য ও আখিরাতে নাযাতের বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। এভাবে পুত্রশোক তাঁর জীবনকে গভীরভাবে শোকসন্তপ্ত ও আলোড়িত করেছিল।
কবর দু’টি এখন পাকা করা হয়েছে। কবরের উপরে একটি ফুলগাছের চারা দেখলাম। কবরের চারপাশে ঘন সবুজ নিকুঞ্জ। গাছের আড়ালে নানা ধরনের পাখি কলরব করছে। শীতের দুপুরে মনোরম পরিবেশে শান্ত-সুশীতল বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মনে হলো পাখিদের মিষ্টিমধুর কলরব আর শ্যামল নিকুঞ্জের সুস্নিগ্ধ বাতাস এখনো সাহিত্যরতেœর হৃদয়মনকে প্রশান্ত করে তুলছে। বড় সুন্দর সমাহিত মনোরম পরিবেশ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা সকলে বেদনা-বিধুর। দো’আ-দুরূদ পড়ে সকলে মহান আল্লাহ্র দরবারে হাত তুললাম। মুনাযাত পরিচালনা করতে গিয়ে আমি কাতর ও বিনম্র কণ্ঠে রাব্বুল আ’লামীনের কাছে কবরে শায়িত বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পীÑ যিনি তাঁর সাহিত্যে মুসলিম জীবনচিত্র ও সুমহান ইসলামী আদর্শের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন- তাঁর পবিত্র আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিনীত প্রার্থনা জানালাম। সকলে সমস্বরে আ’মীন আ’মীন বলে নিরালা-নির্জন মনোরম পরিবেশকে মুখরিত করে তুলল। 
নজিবর রহমানের এ বিশাল বাড়িটিরও একটি ইতিহাস আছে। উল্লাপাড়ার হিন্দু জমিদার তার জমিদারী এলাকায় ঐ সময় গরু কুরবানীর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। তাড়াশের কুতুব উদ্দিন মোল্লা নামক জনৈক দ্বীনদার ও পরহেজগার বৃদ্ধ মুসলমান তাঁর এক দূরবর্তী গ্রামের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে গোপনে কিছু কুরবানীর গোশ্ত এনে ছেলেমেয়েসহ খান। জমিদারের খয়ের খাঁ জনৈক মুসলমান প্রজা জমিদারের কানে এ সংবাদ পৌঁছে দেয়। জমিদার বাবু তৎক্ষণাৎ তার নায়েবকে এর উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করার আদেশ দেন। নায়েব পেয়াদা পাঠিয়ে বৃদ্ধ কুতুব উদ্দিন মোল্লাকে ধরে এনে তাকে চিৎ করে শুয়ে তাঁর পেটে ‘বাঁশডলা’ দিয়ে অর্ধমৃত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখে। কতিপয় মুসলমান তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সংবাদটা ক্রমে এলাকার সর্বত্র প্রচারিত হয়। জমিদারের নায়েব ইচ্ছা  করেই তা প্রচারের ব্যবস্থা করেন- যাতে ভবিষ্যতে কোন মুসলিম এ কাজ না করে। নজিবর রহমানের কানে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি নায়েবের নিকট গিয়ে এর প্রতিবাদ করেন। নায়েব ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় ‘নেড়ে’ ‘যবন’ ‘ম্লেচ্ছে’ প্রভৃতি শব্দযোগে তাঁকে গালিগালাজ ও অপমান-অপদস্ত করে তাড়িয়ে দেয়। এরপর নজিবর রহমান এলাকার প্রত্যেক গ্রামে গিয়ে গণ্যমান্য ও প্রধানদেরকে ডেকে উক্ত বিষয়ের প্রতিকারের জন্যে সবাইকে সংঘবদ্ধ করতে থাকেন। প্রায় ছ’মাসকাল তিনি এভাবে প্রত্যেক রাত্রে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে সকলকে বুঝিয়ে ও উপদেশ দিয়ে সবাইকে সংঘবদ্ধ করেন। অবশেষে তিনি সলঙ্গা হাটখোলায় এক বিরাট ধর্মসভার আয়োজন করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় আলেম ও বক্তাকে দাওয়াত করে আনা হয় এবং দু’দিনব্যাপী সভার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্রথম দিনের সভা নির্বিঘেœ সম্পন্ন হলেও দ্বিতীয় দিনে বক্তাদের বক্তৃতাকালে অকস্মাৎ জমিদারের উস্কানিতে কতিপয় হিন্দু মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রসহ এসে সভার চারদিক ঘিরে ফেলে। নজিবর রহমানের মাথা কেটে নিয়ে আসার জন্য জমিদারের পক্ষ থেকে পাঁচশ’ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে সভা ভঙ্গ হয়ে যায়। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়। দাঙ্গায় উভয় পক্ষের কিছুসংখ্যক লোক আহত হয়। হিতৈষীদের সহযোগিতায় নজিবর রহমানকে সভাস্থল থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নজিবর রহমান ঢাকায় গিয়ে নবাব আহসানউল্লাহ্কে এ বিষয়টি অবগত করেন। নবাবের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি বাংলার গভর্নরের বরাবর মুসলমানদের নিরাপত্তা, স্বার্থ সংরক্ষণ, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গো-কুরবানী প্রভৃতি বিষয়ে একখানা দরখাস্ত লেখেন। উক্ত দরখাস্তে সর্ব প্রথমে নবাব আহসানউল্লাহ্ দস্তখত করেন। অতঃপর করটিয়ার ওয়াজেদ আলী (খানপন্নী চানমিয়া), ধনবাড়ীর নবাব আলী চৌধুরী, নবাব সামসুল হুদা প্রমুখ মুসলিম জমিদার ও অনেক গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের দস্তখত নিয়ে উক্ত দরখাস্ত কলকাতায় লাট বাহাদুরের নিকট পেশ করেন। ইংরাজ গভর্নর মুসলমানদের গরু কুরবানীর উপর হিন্দু জমিদারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আদেশ জারী করেন। লাট বাহাদুরের তরফ হতে একটা আদেশপত্র তাড়াশের অত্যাচারী জমিদার রায় বাহাদুর বনোয়ারী লাল রায়ের (মতান্তরে তাঁর পুত্র রায় বাহাদুর বনমালী রায়) নিকট প্রেরিত হয়। এরপর থেকে মুসলমানগণ নির্বিঘেœ সেখানে গরু কুরবানী করে আসছে।
নজিবর রহমান এতদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেই ছিলেন। উল্লেখিত আদেশপত্র জারী হওয়ার পর তিনি সলঙ্গায় এসে পুনরায় বিরাট ধর্মসভার ব্যবস্থা  করেন। উক্ত সভায় লাট বাহাদুরের আদেশপত্রের কথা ঘোষণা করে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো এবং মুসলমান সমাজের নিরাপত্তা, শিক্ষা দীক্ষা, ধর্মকর্ম ও সামাজিক উন্নতি বিধান সম্পর্কে অনেকগুলি মূল্যবান প্রস্তাব পাস করা হলো। এরপর মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও নজিবর রহমানের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠলো। হিন্দু জমিদার বড় অংকের পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে নজিবর রহমানকে হত্যা করার জন্য জামিলউদ্দিন নামক এক কুখ্যাত গু-াকে নিযুক্ত করেন। এ সংবাদ জেনে নজিবর রহমান সলঙ্গা ত্যাগ করে করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর শরণাপন্ন হলেন। সলঙ্গার মাইল তিনেক উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত ধুবিল গ্রামের জমিদার মুন্সী এলাহী বক্স। করটিয়ার চানমিয়া মুন্সী এলাহী বক্সকে পত্র লিখে নজিবর রহমানের নিরাপত্তার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। জমিদার মুন্সী এলাহী বক্স সায়েবের কাচারী ছিল হাটিকুমরুল গ্রামে। তিনি চানমিয়ার নির্দেশমত তাঁর হাটিকুমরুল কাছারীর নিকটে একটি পোড়ো ভিটায় নজিবর রহমানকে বাড়ি করার জন্য অনুমতি দিলেন এবং কাছারীর পাইক-পেয়াদা সকলকেই কড়া নির্দেশ দিলেন নজিবর রহমানের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে। তিনি সেই ভিটায় বসতবাড়ি নির্মাণ করে সপরিবারে স্থায়ীভাবে বাস করতে লাগলেন। এছাড়াও জমিদার তাঁকে তের বিঘা লাখেরাজ সম্পত্তি দান করলেন। এরপর সলঙ্গার স্কুলে আর যোগদান করা সম্ভব হয়নি। হাটিকুমরুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে তিনি জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি অতিবাহিত করেন।
হাটিকুমরুলে নজিবর রহমান একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে সেখানে তাঁর স্ত্রীকে প্রধান শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করেন। তখন থেকে এ হাটিকুমরুলই হয় তাঁর স্থায়ী বাসস্থান। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই এ হাটিকুমরুলের বাড়িতে বসে রচনা করেন। তাই এ বাড়িটি হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের এক স্মৃতি বিজড়িত মহাপুণ্যভূমি। ছায়া সুনিবিড় সবুজ বৃক্ষলতা পরিবেষ্টিত পাখির কলরবে মুখরিত নিভৃত পল্লীর এ মনোরম নিরিবিলি বসতবাটিটি বাংলা সাহিত্যের এক অমর কথাশিল্পীর নিভৃত পদচারণার অম্লান স্মৃতি ধারণ করে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। এটাকে সাহিত্যের এক অমরাবতী বললে অত্যুক্তি হয় না। আমাদের মত অনেক কৌতূহলী দর্শক যুগ যুগ ধরে এখানে আগমন করেছেন, এ পবিত্র কবর যিয়ারত করেছেন এবং হয়তো ভবিষ্যতেও আরো অগণিত মানুষ এখানে আসবেন, তাদের হৃদয়ের আকুল অনুভূতি ও সূক্ষ্ম আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে।
কবর যিয়ারত শেষে আমরা সকলে একত্রে দুপুরের খানা খেলাম। সাহিত্যরতেœর পরিবারের পক্ষ থেকে খানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাছ, মুরগী, গরুর গোস্ত, ডাল ও সাদা ভাত। পরম তৃপ্তির সাথে আমরা সকলে খেয়ে অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হলাম। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে ইতঃমধ্যেই মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো সকলকে সেখানে সমবেত হওয়ার জন্য। মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম সামনে অগণিত মানুষের ভিড়। সামনের দিকে ছোট ছেলেমেয়েরা মহা উৎসাহে মাদুরে বসে অপলক দৃষ্টিতে সুসজ্জিত মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের পিছনে সারি সারি চেয়ারে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ উপবিষ্ট রয়েছেন। নজিবর রহমান তাঁর এলাকায় কত জনপ্রিয়, এ থেকে তা আন্দাজ করা যায়।
নজিবর রহমানের নাতি এডভোকেট গোলাম হাসনায়েনের সূচনা বক্তব্যের পর একে একে অন্যান্য বক্তারা বক্তৃতা দিলেন। মাঝে মাঝে স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীগণ স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে অমর কথাশিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করল। স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-প্রধান শিক্ষক, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ পরম উৎসাহে উচ্ছ্বসিত ভাষায় গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধায় সাহিত্যরতœকে স্মরণ করলেন। আমরা বিমুগ্ধ-বিস্ময়ে শুনতে লাগলাম। সকলেই কিছু না কিছু বলতে চান। এতদিন তারা শুধু অমর কথাশিল্পী সম্পর্কে শুনে এসেছেন, কিন্তু তাঁর স্মরণে এখানে কোন সভা বা অনুষ্ঠান হয়নি। তাই দীর্ঘদিন পর তাদের অবরুদ্ধ মনের অজস্র আবেগমিশ্রিত কথামালা যেন বাঁধভাঙা জোয়ারের ন্যায় ভেসে আসতে লাগল। বক্তাদের মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান মারুফ বিন হাবীব, প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবিএম আব্দুস ছাত্তার, অধ্যক্ষ মোঃ সামছুল হক, ডক্টর এমএ সবুর, নজিবর রহামনের উপর এমফিল গবেষক প্রভাষক আনিসুর রহমান, নজিবর রহমানের নাতি গোলাম আম্বিয়া, আরেক নাতি শুকুর মাহমুদ, মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম, মহিবুল্লাহ্, মোঃ মাহমুদুল হাসান, মোঃ মোকাদ্দেস আলী (আতিক) প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এভাবে আগ্রহী সকলকে কথা বলার সুযোগ দিলে হয়তো দিন পেরিয়ে রাত্রিও অতিবাহিত হবে, তবু তাদের মনের তৃপ্তি হবে না। এদিকে আমরা ঢাকা থেকে এসেছি, অনুষ্ঠান শেষে আবার ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। শীতের রাত্রি, কুয়াশায় আচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, দূরের পথ অতিক্রম করতে দুঃসহ কষ্টের কথা চিন্তা করে অবশেষে তাদের বক্তৃতায় লাগাম টানতে বাধ্য হলাম। উপস্থাপককে বলে অবশিষ্ট বক্তাদেরকে বক্তৃতার সুযোগ না দিয়ে এখন আমাদের কিছু কথা শোনার জন্য তাদের প্রতি অনুরোধ রাখলাম। সকলে সোৎসাহে সম্মতি জানালেন।
আমাদের সঙ্গী একাডেমির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম প্রথমে বক্তৃতা দিলেন। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে নজিবর রহমানের আগমন ও তাঁর অবদান সম্পর্কে তিনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করলেন। এরপর একাডেমির সহ-সভাপতি মুহম্মদ আব্দুল হান্নান বাংলা কথাসাহিত্যে নজিবর রহমানের অসামান্য অবদানের বিষয় তুলে ধরে তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে সকলকে সমবেত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানালেন। সবশেষে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আমি বললাম, বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী নজিবর রহমান সাহিত্যরতœ ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয় লেখক। তাঁর উপন্যাস শিক্ষিত বাঙালি মুসলিমের ঘরে ঘরে পঠিত হতো, শিক্ষা-সামাজিক অনুষ্ঠানে ও বিয়ে-শাদী উপলক্ষে তা উপহার হিসাবে প্রদত্ত হতো। তাঁর সাহিত্যে মুসলিম সমাজচিত্র, ইসলামী আদর্শ, উন্নত নৈতিক চরিত্র ও দাম্পত্য প্রেমের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। অনুপম প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি তাঁর সাহিত্যে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে মানবতার সপক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। নারী শিক্ষার প্রচার, বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও সামগ্রিকভাবে স্বসমাজের উন্নয়নে তিনি আজীবন সচেষ্ট ছিলেন। আমি আমার বক্তৃতায় প্রতি বছর লেখকের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালনের জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সাহিত্য-সামাজিক সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানালাম। নজিবর রহমানের সাহিত্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যতালিকাভুক্ত করার জন্য আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান রাখলাম। 
আমার বক্তৃতায় উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দ উদ্দীপিত হয়ে উঠল। আমি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত করতালির মধ্যে উপস্থিত সকলকে প্রতি বছর হাটিকুমরুলে তাঁর জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ‘নজিবর রহমান মেলা’র আয়োজন করার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানালাম। এরপর আগামীতে হাটিকুমরুলে ‘নজিবর রহমান একাডেমি ভবন’ নির্মাণের ঘোষণা দিলে উপস্থিত সহস্রাধিক শ্রোতা-দর্শক তুমুল করতালি দিয়ে তার প্রতি সমর্থন জানালেন। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারিভাবে সকলের প্রতি আমি সহযোগিতার হস্ত সম্প্রসারিত করার আহ্বান জানিয়ে আমার বক্তৃতা শেষ করলাম। অনুষ্ঠান শেষে সকলকে আপ্যায়িত করা হলো।
অবশেষে রাত ৮টার দিকে আমরা ঢাকার পথে রওয়ানা হলাম। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রি। রাস্তায় সামনের দিকে বেশিদূর দেখা যায় না। ড্রাইভার আস্তে-ধীরে সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাতে লাগল। রাস্তা-ঘাট মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। তাই বেশ স্বচ্ছন্দে আমরা চলতে লাগলাম। কালিয়াকৈরের নিকট এসে ঘটলো বিপত্তি। রাস্তা প্রশস্তিকরণের কাজ চলছে। রাত তখন বারটা। গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে রাস্তার কাজ চলছে। আমরা ঠায় প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করলাম। এরপর রাস্তার ব্যারিকেড তুলে দেয়া হলো, গাড়ি আবার চলতে লাগল। ঘন ঘন গিন্নীর টেলিফোন আসতে লাগল, কত দূরে? আর কতক্ষণ? আমি তাকে সান্ত¡না দিয়ে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে বললাম। যদিও গভীর রাত্রিতে গাড়িতে আমরা রাস্তায় আটকা পড়েছিলাম, কিন্তু কারো মনে এতটুকু অস্বস্তি বা চাঞ্চল্য ছিল না। কারণ গাড়িতে যারা ছিল তারা প্রায় সকলেই কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী। কেউ গান গেয়ে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করে, কেউ ইতিহাস বয়ান করে আর কেউ চটুল রসিকতা করে সারা পথ কাটিয়ে দিলেন। বড় চমৎকার লাগছিল সে অস্থির অনিশ্চিত মুহূর্তগুলো। অবশেষে রাত পৌণে দু’টায় বাসায় পৌঁছালাম। গিন্নী দরজা খুলে দিলেন। তিনি নিদ্রাকে দূরে রাখার জন্য টিভি খুলে বসেছিলেন অধৈয্য প্রতীক্ষায়। আমার খাবারগুলো টেবিলে প্রস্তুত করাই ছিলো। আমি ঘরে ঢুকে অযু করে প্রথমে খাবার টেবিলে বসে খেয়ে নিলাম। তারপর নামায পড়ে নিশ্চিত-নির্ভাবনায় নরম বিছানার কোলে নিজেকে সমর্পণ করে দিলাম।
বিছানায় শুয়ে তন্দ্রামগ্ন অবস্থায় স্বপ্ন দেখলামÑ প্রতিবছর অমর কথাসাহিত্যিকের স্মরণে তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যেন বিশাল মেলার আয়োজন হয়েছে। হাটিকুমরুলে জনতার ঢল নেমেছে। সকলে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁর মহান স্মৃতি স্মরণ করে আপ্লুত হয়ে উঠেছে। এ উপলক্ষে সভা-সেমিনার, সাহিত্য প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী ও নানা সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মনে মনে গভীর তৃপ্তি লাভ করে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হলাম। আমার এ স্বপ্ন কি রাতের অন্ধকারের মধ্যেই চাপা পড়ে থাকবে, নাকি এটা একদিন জাগ্রত জনতার জীবন-স্বপ্নে পরিণত হবে?  

২০ জানুয়ারী ২০১৭ তারিখ শুক্রবার নজিবর রহমান সাহিত্যরতেœর ১৫৮তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে তাঁর বসতবাটি হাটিকুমরুল সফরের বিবরণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ