ঢাকা, শুক্রবার 24 February 2017, ১২ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কানাডার আদালতের রায় সরকারের চক্রান্তমূলক নাটক --বিএনপি

স্টাফ রিপোর্টার : কানাডার একটি আদালতের রায়ে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বলে যে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে তার পেছনে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের চক্রান্ত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের আগে জনগণের মধ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করতে এসব নাটক  সাজানো হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। একইসময়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, কানাডার আদালতে প্রসিকিউটর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু শুধু বিএনপিকে দোষারোপ করার মানে হয় না।

প্রসঙ্গত, বুধবার কানাডার আদালতের ওই রায় নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় রিজভী বলেন, রায় পড়ে যতটুকু বুঝেছি, এটা সম্পূর্ণ চক্রান্তমূলক নাটকের অংশ। আমরা মনে করি, এটি বর্তমান সরকারের একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিষয়, তারা একটি নাটক সাজিয়েছে এবং ওই নাটকটায় ওইভাবে তারা তথ্য-প্রমাণ দিয়েছে। বিএনপি এই রায়ের বিষয়ে কী করবে, কানাডার উচ্চ আদালতে যাবে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা আমরা নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে বলতে পারব। এখন যেটা তাৎক্ষণিক জেনেছি, তার প্রতিক্রিয়া জানালাম। 

তিনি বলেন, সরকার প্রভাবিত মিডিয়ায় বুধবার আমরা যেভাবে সংবাদটি দেখেছি, কানাডার যে অনলাইনে এসেছে আমরা সেটাও দেখেছি, সেটা শওগাত আলী সাগর, ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা কানাডায় বসে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নানা ধরনের চক্রান্তের জাল তৈরি করছেন, একটা পরিকল্পনা তৈরি করছেন- এটা স্পষ্ট।

কানাডার আদালত ২৫ জানুয়ারি ওই রায় দিলেও এতদিন পরে কেন তা নিয়ে খবর হচ্ছে- সেই প্রশ্ন তোলেন বিএনপি নেতা রিজভী। হঠাৎ করে আমরা এর প্রচার দেখতে পেলাম, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের প্রচারিত মিডিয়ায় এটা প্রচার করার ধুম পড়ে গেছে।

রায়ের একটি অংশের বক্তব্য তুলে ধরে রিজভী বলেন, বিরোধী দলের একজন ছেলে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীর কথা বলা হচ্ছে, সে তার আবেদেন কী বিএনপির বিরুদ্ধে বলবে? সে তো বলবে আমি বাংলাদেশে একটা প্রতিকূলতার মধ্যে আছি, হয়রানি হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, টর্চার হতে পারে, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার হতে পারে- এসব কথা আবেদনে বলবে। সে বিএনপির বিরুদ্ধে বলবে কেন ? 

এজন্যই মনে হচ্ছে, এটা একটা সাজানো নাটকের বিষয়। যেটা কানাডায় উপস্থাপন করেছেন, ইমিগ্রেশন বিভাগকে এভাবে ভুল তথ্য তারা দিয়েছেন, বানানো নাটকের ভুল তথ্য দিয়েছেন এবং সেটা তারা কোর্টে নিয়ে গেছেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, রায়ে বিচারক বলেন, আবেদনকারীর বক্তব্যকে আমলে নিয়ে ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে সহিংস ঘটনা হিসেবে অবহিত করেন। বলেন, বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ উভয়ে জনগণ ও সরকারকে প্রভাবিত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে সহিংস কর্মকা- পরিচালনা করছে।

এই যে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে, অর্থাৎ বিএনপি সন্ত্রাসী কিনা, তারা সন্ত্রাসী কর্মকা- করেছেন, এটার জন্য প্রসিকিউশনের বিপক্ষে যে ডিফেন্স ল’ ইয়ার, তাদের কোনো যুক্তি-তর্ক এখানে দেখছি না। আমরা রায়ের সূচনা যতটুকু পড়েছি, আরও বিস্তারিত জেনে পরে বলব।

এদিকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, কানাডার আদালতে প্রসিকিউটর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু শুধু বিএনপিকে দোষারোপ করার মানে হয় না। এটা বিশ্বাস করলে এটিও বিশ্বাস করতে হবে যে আওয়ামী লীগও সন্ত্রাসীদের দল। আমি বলতে চাই, আওয়ামী লীগ এক ধাপ এগিয়ে আছে, আমাদের আগে আছে। 

সাংবদিক সম্মেলনে  রিজভী আহমেদ ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে খালেদা জিয়াসহ দলীয় শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের এবং সকালে সাধারণ মানুষের পুষ্পস্তবক অর্পণের দুটি ছবি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুলিশ এবং সর্বস্তরের জনগণ কোথায় দাঁড়ানো আছে? বিএনপি চেয়ারপারসন এবং অন্য নেতৃবৃন্দ কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন ? ঠিক একই জায়গায়। দেখুন নগ্ন পদ, ম্যাডামসহ সবার। তাহলে প্রধানমন্ত্রী যে সত্য কথা বলেন না এটা একেবারেই সুস্পষ্ট।

এসময় অন্যদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আবদুল আউয়াল খান, মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

এদিকে গতকাল দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিরোধী দলের ওপর দমন-নিপীড়ন, গুম, খুন-নির্যাতন, মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার হয়রানির পাশাপাশি আবারো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে গুম করা হচ্ছে  বলে অভিযোগ করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে নেয়া হলেও তাদের সন্ধান মিলছে না। এজন্য নিখোঁজ হওয়া লোকজনের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে এক দুই বছর পরে গ্রেফতারের নাটক সাজালে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এসব নাটকের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিমকে গত মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৪টায় সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলযোগে তার নিজ বাসা (ঠাকুরগাঁও হাজিপাড়া) থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাৎক্ষণিক থানা পুলিশে যোগাযোগ করা হলে কোনো হদিস দিতে পারেনি। বিষয়টি জানা নেই বলে হাকিমের স্বজনদের কাছে মন্তব্য করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরবর্তীতে নানা নাটকীয়তা ও সাসপেন্স শেষে তিন দিন পর তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।

রিজভী বলেন, গত দু’দিন আগে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হন গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার আবুল কাশেম । তিন দিন অতিবাহিত হলেও তার কোন খোঁজ মিলছে না। তার পরিবার থানায় জিডি করে পুলিশের সহায়তা চাইলেও পুলিশ তার কোন সন্ধান দিতে পারছে না। সম্প্রতি কাপাসিয়ায় শীতলক্ষ্যা নদীতে মাছের ঘের থেকে একটি প্রাডো গাড়ি উদ্ধারে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার কাপাসিয়া থানায় হাজির হয়ে গাড়ির মালিকের স্ত্রী সালেহা বেগম দাবি করেন তার স্বামী হেফজুর রহমানকে ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে গুলশান থেকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়ি পাওয়া গেলেও নিখোঁজ ব্যক্তির এখনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। 

বিএনপির এই নেতা বলেন, ৫৪ ধারা এবং সাদা পোশাকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে গত বছরের ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে সাদা পোশাকে গ্রেফতারের বেলায় অবশ্যই পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। সাথে গ্রেফতারি পরোয়ানাও থাকতে হবে। তুলে নেয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকটজনকে অবহিত করতে হবে। আসামির মৌলিক ও মানবাধিকার সংরক্ষণসহ গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশনাও দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাও এই সরকার তোয়াক্কা করে না। 

সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে গুম-খুনের রাজনৈতিক কর্মসূচি চালু করেছিল তার ছেদজ্যোতি এখনও টানেনি। আর শিকার হয়ে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে ইলিয়াস আলী, সাইফুল ইসলাম হীরা, হুমায়ুন কবির পারভেজ, চৌধুরী আলম, জাকির, সুমন, মুন্নাসহ বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ। গুম-খুনের ফেস্টিভ্যাল এখন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের কথা মানে নেকড়ের মুখে মেষ শাবকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া। 

ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতি বলেন, এরা এখন একটি এমন রাষ্ট্র ও সমাজ কায়েম করছে যেখানে এক ব্যক্তি একটি দল এর বিরুদ্ধে আকার ইঙ্গিতে সমালোচনা করলেও তাকে অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে। দেশে এক মহাদূর্দিন উপস্থিত হয়েছে। এক অন্ধকারতম সময় গ্রাস করছে সমগ্র জনজীবনকে। প্রতিদিন গড়ে একের অধিক মানুষ কথিত বন্দুক যুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে। দেশ যে ভয়ঙ্কর দুঃসময় অতিক্রম করছে পোশাকে কিংবা সাদা পোশাকে গ্রেফতার, গুমের ঘটনা তার উদাহরণ।

গত ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ মঙ্গলবার পটুয়াখালী জেলাধীন রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর হোসেন আকন এর নির্বাচনী পথসভায় হামলা, ভাংচুর ও নেতাকর্মীদের মারধরের ঘটনায় নিন্দা জানান রিজভী। তিনি অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাগ্রহণের জোর দাবি জানান। আহত নেতাকর্মীদের সুস্থতা কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ