ঢাকা, শুক্রবার 24 February 2017, ১২ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশু হত্যা পরিস্থিতি ভীতিকর

দেশে শিশু হত্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার উপস্থাপিত পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, চলতি বছর ২০১৭ সালের প্রথম দেড় মাসেই বিভিন্ন স্থানে ৪২ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ভীতি ও উদ্বেগের কারণ হলো, প্রতিবেশী, বন্ধু ও অনাত্মীয়দের পাশাপাশি নিজেদের বাবা-মায়ের হাতেও খুন হচ্ছে শিশুরা। এরকম পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে সংস্থার রিপোর্টে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ারও আগে নরসিংদী জেলার চরাঞ্চল আলোকবাড়ির পূর্বপাড়া গ্রামে ঘটেছে আরো তিনটি নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার ওই গ্রামের ২২ বছর বয়সী যুবক রুবেল মিয়া তার আপন দুই বোন ও এক ভাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। বোন দু’জনের বয়স ছিল মাত্র সাত ও পাঁচ; আর ভাইয়ের বয়স ছিল ১০ বছর। ঘাতক তার ২৫ বছর বয়সী বড় ভাইকেও হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে যখম করেছে। 

গ্রামবাসীদের উদ্ধৃত করে খবরে এই ঘাতককে মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে, সে সুস্থ ও স্বাভাবিক মস্তিষ্কেই তিন-তিনটি খুন করেছে। কারণ, হত্যার আগে ছোট ভাই-বোনদের সে তার নিজের ঘরে ডেকে নিয়েছে। সবচেয়ে ছোট বোনকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে তুলে নিয়ে গেছে তার মায়ের পাশ থেকে। তাছাড়া মাকে কিন্তু সে হত্যা করেনি। বরং মাদরাসা শিক্ষক বড় ভাইকে তার কর্মস্থল থেকে ডেকে এনে তারপর তাকে কুপিয়ে জখম করেছে। ঘাতক যে মানসিক প্রতিবন্ধী নয় তার আর এক প্রমাণ, সে বিবাহিত এবং এক সন্তানের পিতা। ঘটনার দিন আগেই সে তার স্ত্রী ও সন্তানকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া হত্যা করার পর ঘাতক গিয়ে গ্রামের একটি নিরিবিলি স্থানে আত্মগোপন করেছিল। সব মিলিয়েই পরিষ্কার হয়েছে, ঘাতক রুবেল মিয়া সুস্থ মস্তিষ্কে তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

নরসিংদীর গ্রামাঞ্চলে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাধান্যে এসেছে শিশু হত্যার দিকটি। সেখানে আপন বড় ভাই হয়েও ঘাতক তার তিন ভাই-বোনকে হত্যা করেছে- তাও গলা টিপে এবং শ্বাস রোধ করে। এর চাইতে ভয়ংকর  নিষ্ঠুরতার কথা কল্পনা করা যায় না। দেশের বিভিন্নস্থানে যেসব হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও প্রায় একই ধরনের। ৪২ জনের মধ্যে পাঁচ শিশুকে হত্যা করেছে তাদেরই বাবা-মা। অন্তরালের কারণ যতো বড়ই হোক, যতো রাগ বা ক্ষোভই থাকুক না কেন, কোনো বাবা কিংবা মা তার নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে- এ কথা কিছুদিন আগেও বাংলাদেশে কল্পনা করা যেতো না। কিন্তু আজকাল সেটাও ঘটছে। শিশুরা মারা যাচ্ছে নিজের ভাইয়ের হাতে; শিশুদের হত্যা করছে প্রতিবেশী এবং পাড়া ও স্কুলের বন্ধুরা পর্যন্ত। অর্থাৎ দেশে বর্তমানে শিশুদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অথচ একটা সময় ছিল যখন নারীদের পাশাপাশি শিশুদেরও ছাড় দিত ঘাতক ও শত্রুরা। কিন্তু বিগত মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সমাজে পচন এমন এক মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যখন শিশুদের শুধু অপহরণই করা হচ্ছে না, ঠাণ্ডা মাথায় খুনও করা হচ্ছে। এজন্যই মাত্র দেড় মাসে দেশে ৪২ জন শিশুকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। নরসিংদীর তিন শিশুর হত্যাকাণ্ডের পর এই সংখ্যা ৪৫-এ উঠেছে। এটাই অবশ্য সর্বশেষ বা সঠিক সংখ্যা নয়। কারণ, এই সংখ্যা নির্ধারিত হয়েছে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে। এর বাইরে রয়ে গেছে আরো অনেক শিশুর হত্যাকাণ্ড, যেগুলোর খবর প্রকাশিত হয়নি। 

আমরা মনে করি, এভাবে নির্বিচারে শিশুদের হত্যাকাণ্ড কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হত্যার এই বর্বরতাকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। এজন্য সবার আগে দরকার শিশুহত্যার মূল কারণ অন্বেষণ করা। এ ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীদের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক সংগ্রামের আলোচ্য রিপোর্টে তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, পরিবার সদস্যদের মধ্যে ¯েœহ-মায়া ও ভালোবাসা কমে যাওয়া, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়া, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে শিশু-হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধ বেড়ে চলেছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কেবল সচেতনতা বাড়ালেই চলবে না, একই সাথে বিশেষ করে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ, এসব চ্যানেলে প্রচারিত নাটক ও বিভিন্ন সিরিয়ালে পারিবারিক জীবনের ঝগড়া-বিবাদ, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো এমন কিছু বিষয়কেই তুলে ধরা হয়, যেগুলো মানুষকে নষ্ট ও বিভ্রান্ত করে। তারা এমনকি হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধকেও স্বাভাবিক মনে করতে শেখে। এরই ফলে বাড়ে শিশুহত্যার মতো নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড। বড় কথা, ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের সমাজে এমন অনেক বিষয়ও সুকৌশলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে যেগুলো সরাসরি ইসলাম বিরোধী। মূলত সে কারণেই মানুষের চিন্তায় ইসলামের শিক্ষা আজকাল তেমন প্রভাব রাখতে পারছে না। পরিবর্তে তারা এমন সব কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়ছে, যেগুলো ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ থেকে মানুষকে অনেক দূরে ঠেলে নিচ্ছে। একই কারণে ভেঙে যাচ্ছে মানুষের সুখের সংসার। সংসারে বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়ছে সন্তানের দূরত্ব। কমে যাচ্ছে স্নেহ-মায়া-মমতা। সেখানে ঠাঁই করে নিচ্ছে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা। মানুষ হয়ে পড়ছে নিষ্ঠুর। তারা এমনকি বাবা-মা হয়েও সন্তানকে হত্যা করছে। মোটর সাইকেলের মতো সাধারণ কিছু দাবি পূরণ না করায় পিতার মৃত্যু ঘটছে সন্তানের হাতে। মূলত নৈতিক অধঃপতনের একই কারণে বড় ভাই হত্যা করছে আপন ভাই- বোনদের। এভাবে পুরো সমাজেই ছড়িয়ে পড়ছে নিষ্ঠুরতা।

এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। আমরা তাই নৈতিক অধঃপতন ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করার উদাত্ত আহ্বান জানাই। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে ঘাতককে এমনভাবেই দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি দিতে হবে, যাতে অন্য কেউ কাউকে হত্যার কথা চিন্তা করারও সাহস না পায়। একযোগে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে স্নেহ-মায়া-মমতার সঙ্গে শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে, যার মাধ্যমেই কেবল নৈতিক দিক থেকে মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধ করা থেকে দূরে রাখা সম্ভব। এ সব বিষয়ে সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, বাংলাদেশের সমাজে আবারও শান্তি ফিরে আসুক। মানুষ হোক কলুষমুক্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ