ঢাকা, শনিবার 25 February 2017, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শেষ সময়ে শুধুই ক্রেতা ॥ ধুম বেচাকেনা

গতকাল শুক্রবার অমর একুশে বইমেলার একটি স্টলের দৃশ্য -সংগ্রাম

স্টাফ ও বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার : ভাষার মাসকে ঘিরে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিরাজ করে ভিন্ন এক আবহ। এছাড়া বসন্তবরণ, ভ্যালেনটাইন এবং ভাষা শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মেলায় লক্ষ্য করা যায় তরুণ-তরুণী দর্শনার্থী-ক্রেতাদের উৎসবের মহড়া। মেলার শুরুর দিকে কেউ আসে ঘুরতে আবার কেউ আসে বই কিনতে। প্রথম দিকে মানুষের ভিড় কম থাকে বলে দর্শনার্থীদের আগমনই বেশি লক্ষ্য করা যায়। সব কিছুই অতিক্রম করে বইমেলা এখন শেষভাগে উপনীত হয়েছে। বিদায়ের সুর বেজে উঠেছে বইপ্রেমী লেখক-পাঠকদের এ মহাআয়োজনে।
তাই এখন আর দর্শনার্থী নয়, যারা আসছেন তারা প্রকৃত ক্রেতা হিসেবেই মেলায় প্রবেশ করছেন। বিভিন্ন স্টল ঘুরে পছন্দের বইগুলো নিজের সংগ্রহে নিয়ে নিচ্ছেন। বিক্রেতারাও যেন মহাব্যস্ত। তাদের এই মহাব্যস্ততা জানান দিচ্ছে, শেষ খেয়া আর বেশি দূর নেই। তাই এখন আর বসে অলস সময় কাটানোর সুযোগ নেই। যা করার এখনই করতে হবে। যে ক’টা দিন আছে সর্বোচ্চ দিয়ে গুছিয়ে নিতে নিজের আখর। মাসব্যাপী মেলার শেষ শুক্রবারে পুরো মেলাজুড়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কেনাবেচার ব্যস্ততা ছিল ঢের। ছুটির দিনের শেষভাগে ঠিক এমন পরিবেশই লক্ষ্য করা গেছে। আজ শনিবার মেলার শেষ ছুটির দিনটিও দারুণ জমজমাট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আর মাত্র চারদিন পরেই শেষ হবে মেলা। তাই মেলার শেষ ভাগে ছুটির দিনে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ই মনে করিয়ে দিচ্ছে মাসজুড়ে মেলা শেষ হয়ে এসেছে। সাপ্তাহিক ছুটি ও সপ্তম শিশুপ্রহর উপলক্ষ্যে সকাল এগারোটায় মেলার দ্বার খুলে। ক্ষুদে বইপ্রেমীরা মা-বাবা কিংবা বড়দের হাত ধরে মেলায় ভিড় করতে থাকে। রাত নয়টা পর্যন্ত বিরতিহীন মেলার দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। মেলার পরিধি আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও বইমেলায় যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। সর্বস্তরের বইপ্রেমীর সারি বাংলা একাডেমি ছাড়িয়ে একদিকে দোয়েল চত্বর, অন্যদিকে টিএসসি পর্যন্ত পৌঁছে। এছাড়া উদ্যানের ভিতরের গেইটের দীর্ঘ সাড়িও লক্ষ্য করা গেছে।
 ক্রেতাদের আগমনে বইমেলায় জমে উঠেছে বেচা-কেনার ধুম। মেলার দুই অংশ ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সবকটি প্যাভিলিয়ন ও স্টলে ক্রেতাদের ভিড়। প্রায় সবার হাতেই নতুন বইয়ের প্যাকেট। জনপ্রিয় কবি-লেখকদের গল্প-কবিতা-উপন্যাস যেমন বিক্রি হচ্ছে, তেমনই বিক্রি হচ্ছে মননশীল বই। এছাড়া বাদ পড়ছেন না রাজনীতিবীদ ও তরুণ লেখকদের বইও।
প্রকাশকরা বলছেন, বিষয়ভিত্তিক বইয়ের কদর দিন দিন বাড়ছে। প্রবন্ধ, গবেষণামূলক বইয়ের বিক্রিও বেশ ভালো। জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও তরুণ লেখকদের বইয়ের কদর নেহায়েত কম না। মেলার শেষ মুহূর্তে এসে প্রকাশকরা মনে করছেন, প্রকৃত পাঠকরা দেখে-শুনে বই কেনার জন্য মেলার শেষভাগের এই দিনগুলোই বেছে নেন। মেলায় যত নতুন বই আসার তা এরই মধ্যে এসে গেছে। যার ফলে এই সময়ে তারা দুই হাত ভরে নতুন বই কেনেন।
শিশুপ্রহরে সিসিমপুরের পাপেট শো’তে শিশুদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। শিশুতোষ বইয়ের বিক্রিও বেড়েছে স্বাভাবিকভাবে। তাছাড়া মেলায় অনেককেই পাওয়া যায় যারা নিজেদের জন্য বই না কিনলেও সন্তানের হাতে ঠিকই বই তুলে দিচ্ছেন। এখন শেষ সময়ে যারাই আসছেন সবাই কোনো-না-কোনো বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
মেলায় উত্তরা থেকে মাইমুনা জান্নাত মিম ও সাবিহা এসেছেন বাবা মাইনুল ইসলামের হাত ধরে। হাতে এক ব্যাগ বই। সে কিনেছে সায়েন্স ফিকশন, ভূতের গল্প, টুনাটুনির গল্পসহ ১০টি বই। মাইনুল জানান, কাজের ব্যস্ততায় এতদিন আসা হয়নি। শেষ সময়ে বাচ্চাদের নিয়ে মেলায় এসেছি তাদের পছন্দের বইগুলো কিনেছি। কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে চলে যাব।
মিরপুর থেকে পিংকি তার বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, মূলত একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে বাকি সময়টাতে মেলা প্রাঙ্গণে বিরাজ করে নিরিবিলি পরিবেশ। এ ছাড়া পছন্দের লেখকের বইগুলো অনেক সময় বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায় না। এ কারণে মেলায় আসা। এসেছি কিছুক্ষণ ঘুরে কয়েকটি বই কিনব। কারণ এখন তো শেষ সময়, না কিনে আর উপায় নেই।
ইত্যাদি প্রকাশনীর প্রকাশক আদিত্য অন্তর বলেন, উৎসবের দিনগুলোতে ভিড় বেশি হয় ঠিকই। কিন্তু বিক্রি হয় অন্য দিনগুলোতে। মেলার শেষ দিনগুলোতে বিক্রি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। অনেকেই এই শেষ দিনগুলোর জন্যে অপেক্ষা করেন। এ্যাডর্নের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন জানান, সকাল ১১টায় মেলার ঝাঁপ খোলার পর থেকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোকজন। শুক্রবার দুপুরে জুমার সময় লোজন তেমন থাকে না, কিন্তু গতকাল প্রচুর লোক ছিল। আর বিকেল থেকে মানুষ ¯্রােতের মত আসতে থাকে। সন্ধ্যায় পুরো মেলা প্রাঙ্গণই লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। বিক্রির প্রসঙ্গ এনে তিনি বলেন, মেলা এখন শেষের দিকে। আজ বাদে আর ৪ দিন আছে। এখন প্রতিদিনই বিক্রি ভাল হচ্ছে।
শুধু আজই নয়, আগামীকালও বিক্রি ভাল হবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এখন শুধু গ্রন্থানুরাগীরাই আসছেন মেলায়। তারা খুঁজে খুঁজে মৌলিক বইগুলোই বেশি কিনছেন।
গ্রন্থমেলার এ শেষ সময়ে কবি-সাহিত্যিকদের উপস্থিতিও বেড়ে গেছে। এদিন মেলা চত্বরে কবি আসাদ চৌধুরী, কবি নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হককে দেখা গেছে। তাদের সবাই নিজ নিজ বইয়ে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত ছিলেন।
চব্বিশতম দিনে একুশে গ্রন্থমেলায় নতুন বই এসেছে ১৪৬টি এবং ৫৩টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
‘রাইট টু প্রেস’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন : মেলার ২৪তম দিন বিকেলে সাংবাদিক ও আইনজীবী মিয়া হোসেনের লেখা সাংবাদিক অধিকার বিষয়ক বই ‘রাইট টু প্রেস’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীকে উৎসর্গ করা বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, নরসিংদী সাংবাদিক সমিতি, ঢাকার সাধারণ সম্পাদক গ্যালমান শফি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আপ্যায়ন সম্পাদক কামাল উদ্দিন সুমন, সাংবাদিক এইচ এম আকতার, বিশিষ্ট আয়কর আইনজীবী সাইফুল কাদের, প্রকাশক মঈন মুরসালিন। মেলার মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে নরসিংদী সাংবাদিক সমিতি, ঢাকার উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলাম। বইটি প্রকাশ করেছে প্রতিভা প্রকাশ। অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২০১-২০২ নম্বর ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ৭৩ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক বইটি সাংবাদিক, আইনজীবী ও সাংবাদিকতার ছাত্রদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। বইটিতে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডসহ সকল আইন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তারা অবিলম্বে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
গতকালের মেলামঞ্চ : অমর একুশে উদযাপন উপলক্ষে সকাল ১০টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী পাপিয়া সারোয়ার। বিচারকম-লীর সদস্য ছিলেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, সালাহউদ্দীন আহমেদ, কিরণচন্দ্র রায়। প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন যথাক্রমে মাহির আবিদ অক্ষ, সিনাতা আহ্মেদ (রিসা) এবং দিবা রানী দেব অর্পা। খ-শাখায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন যথাক্রমে অনামিকা সরকার সোমা, মাশুক কায়সার ইভান এবং তানিশা জাহান নরিকা।
এদিন বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘ব্যারিস্টার আবদুল রসুল : জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া ভূঁইয়া। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মামুন সিদ্দিকী। আলোচনা করেন তাবেদার রসুল বকুল এবং সুভাষ সিংহ রায়। একই মঞ্চে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল অধ্যাপক লিয়াকত আলীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’, শাহ্ সাদিয়া আফরিন মল্লিকের পরিচালনায় ‘হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী’ এবং ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
আজ মেলার শেষ শিশুপ্রহর : আজ শনিবার শেষ ছুটির দিনে মেলায় শিশুপ্রহর থাকবে এবং এ উপলক্ষে মেলার দ্বার খুলবে সকাল ১১টায়। সকাল সাড়ে ১০টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অমর একুশে উদ্যাপন উপলক্ষে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত এবং সাধারণ ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ