ঢাকা, শনিবার 25 February 2017, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুন্দরবনে প্রজনন মওসুমে আহরণ- নিষিদ্ধ কাঁকড়া শিকারের মহোৎসব

খুলনা অফিস: চলতি প্রজনন মওসুমে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে আহরণ নিষিদ্ধ কাঁকড়া শিকারের মহোৎসব চলছে। শিলা প্রজাতির কাঁকড়া আহরণে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বন বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহায়তায় বিশ্ববাজারে সুন্দরবনের ডিমওয়ালা শিলা কাঁকড়ার উচ্চ মূল্য ও ব্যাপক চাহিদার সুযোগে জেলেরা বেপরোয়াভাবে শিলা কাঁকড়া আহরণে মেতে উঠেছে। কাঁকড়া আহরণ বন্ধে প্রচারণা না থাকা ও জেলে এবং শিকারীদের অতি লোভের কারণে প্রজননের ভরা মওসুমে কাঁকড়া শিকারের ফলে এবার সুন্দরবন থেকে শিলাসহ অন্যান্য প্রজাতির কাঁকড়া বিলুপ্তির আশংঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
পূর্ব সুন্দরবনের প্রায় সারা বছরই মংলা, রামপাল, শরনখোলা, মোড়েলগঞ্জ, দাকোপ, কয়রাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক বনজীবী সুন্দরবনে শিলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এসব বনজীবীরা সরকারি রাজস্ব দিয়ে বন বিভাগের কাছ থেকে বৈধ পারমিট নিয়ে সুন্দবনের কাঁকড়া ধরেন। তবে, প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দু’মাস কাঁকড়ার ভরা প্রজনন মওসুম হওয়ায় এ সময় বন বিভাগ কাঁকড়ার বংশ বিস্তারে জন্য আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে প্রজনন মওসুমে সুন্দরবনের নদ-নদীর শিলা কাঁকড়া দলে দলে গভীর সমুদ্রে ও বড় নদীতে বাচ্চা ফোটানোর জন্য চলে আসে। যে কারণে সুন্দরবনে এ দু’মাসে সারা বছরের চেয়ে বেশি করে শিলা কাঁকড়া পাওয়া যায়। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেশি লাভের আসায় অসাধু মহাজনেরা গরীব জেলেদের অগ্রিম দাদনের টাকা দিয়ে সুন্দরবনের নদ-নদীতে শিলা কাঁকড়া আহরণ করতে পাঠান। আর ওই অসাধু মহাজনরা বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ম্যানেজ করে শেষ ভাগে এসেও অবৈধ উপায়ে দেদারছে ডিমওয়ালা শিলা কাঁকড়াসহ সকল ধরনের কাঁকড়া শিকার করে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের সাথে আঁতাত করে নামমাত্র মাছ শিকারের পাস নিয়ে অসাধু জেলেরা দেদারছে কাঁকড়া শিকার করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে ও বনজীবী বলেন, চুক্তি করে বন বিভাগের স্টেশন অফিস থেকে ঘুষের টাকা দিয়ে সাদা মাছের পারমিট নিলেও বনে গিয়ে শিলা কাঁকড়া ধরে থাকি। তাছাড়া টহলরত ফরেস্টারদের সাথেও চুক্তি থাকে। যে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বনে প্রবেশ করার আগেই জেলেদের খবর জানিয়ে দেয়া হয়। এ সময় জেলেরা গভীর বনের খালে লুকিয়ে থাকে। এভাবেই সুন্দরবনে শিলাসহ অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া ধরা অব্যাহত রয়েছে। আবার অনেক জেলে পাশ পারমিট না করেই বন বিভাগকে ম্যানেজ করে বনে ঢুকে দেদারছে শিলা কাঁকড়া ধরছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মংলা ও শরণখোলার কয়েকজন কাঁকড়া আড়তদার বলেন, বর্তমানে ডিমওয়ালা শিলা কাঁকড়া ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা কেজি দরে কিনে থাকি। এসব কাঁকড়া ঢাকায় ২ হাজার থেকে আড়াই টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে এ দু’মাস শিলাসহ অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া ধরা নিষেধ এটা জানার পরও কেন কাঁকড়া কিনছেন এমন প্রশ্নের জবাবে এক আড়তদার বলেন, আমার মত অনেক কাঁকড়া ব্যবসায়ী এ সময় কাঁকড়া কিনছে, তাই আমিও কিনছি। বন বিভাগ কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় এভাবে কাঁকড়া শিকার করা হচ্ছে।
সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাইন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম সুন্দরবনে প্রজনন মওসুমে নির্বিচারে শিলা ছাড়াও অন্যসব প্রজাতির কাঁকড়া শিকারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার বা বন বিভাগ কেউই ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড এই ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় মোটেই আন্তরিক নয়। শিকার নিষিদ্ধ সময়ে ডিমওয়ালা অন্যসব প্রজাতির পাশাপাশি রতানি পণ্য শিলা কাঁকড়া প্রজনন মওসুমে নির্বিচারে আহরণ করার ফলে কাঁকড়ার ভান্ডার খ্যাত সুন্দরবনে কাঁকড়ার বিলুপ্তি ঘটবে। এত করে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাবসহ আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা থাকা শিলা কাঁকড়া নামের রপ্তফতানি পণ্যটিও হুমকির মুখে পড়বে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে দ্রুত শিকার নিষিদ্ধ প্রজনন মওসুমে সব ধরনের কাঁকড়া আহরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে সরকার ও বন বিভাগকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে প্রজনন মওসুম শুরুর আগেই কাঁকড়া আহরণ বন্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
পূর্ব সুন্দরবনের ঁচাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মেহেদীজ্জামান বলেন, কাঁকড়া শিকার বন্ধে বন বিভাগ তৎপর চালাচ্ছে। গত শনিবারও একটি ট্রলারে প্রায় ১০ মণ শিলা কাঁকড়াসহ দুই জেলেকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে। অবৈধ উপায়ে কাঁকড়া শিকারে জেলেদের সাথে সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত থাকলেও কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় বন বিভাগ তৎপর রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ