ঢাকা, রোববার 26 February 2017, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লিপার স্বপ্নপূরণ

ফজলে রাব্বী দ্বীন : ‘বাবা, আমায় তুমি বইমেলায় নিয়ে যাবে না?’
‘নিয়ে যাব তো, অফিস থেকে আগে ছুটি কাটিয়ে নিই তারপর না হয় একদিন যাব।’
লিপার কোনকিছুই ভালো ঠেকছে না। এই বইমেলার জন্যই সে সারাটা বছর অপেক্ষা  করে বসে থাকে। চুপি চুপি অনেক টাকাও জমিয়ে রেখেছে। কিন্তু কেউই তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। মাকে বললে ধমক দিয়ে বলে, ‘আজেবাজে চিন্তা বাদ দিয়ে পড়াশোনার দিকে মন দাও। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। বইমেলার ওইসব গল্পটল্পের বই পড়ে সময় নষ্ট করার কোন দরকার নেই আমার।’ অবসরে গল্প কবিতার বই পড়লে আসল সময় নষ্ট হয় এই কথাতো আগে জানত না লিপা। তাহলে সে এইবছর ক্লাসে ফার্স্ট হল কি করে? গল্প ছড়ার বই ছাড়াতো তার একদিনও কাটে না। রাত চলে যায়, সকাল আসে। কিন্তু লিপার বইমেলায় আর যাওয়া হয়না। কত শত মজার মজার জ্ঞানের বই, হাট্টি মা টিম ছড়ার বই, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বই, ভৌতিক বই, রূপকথার বই আহা! মনে হলেই চোখ দিয়ে পানি চলে আসে লিপার। বইগুলোকে সত্যিই সে খুব মিস করছে।
একুশ উপলক্ষে দেশব্যাপী রচনা লেখার প্রতিযোগিতা চলছে। লিপার ভাবনাময় দু’চোখে হঠাৎ গত বছরের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল দাদুর কথা। দাদু বলেছিল, আমরা নাকি দিনদিন অলস হয়ে যাচ্ছি। উন্নত দেশের মানুষেরা পথিমধ্যে চলার সময়ও হাতে বই নিয়ে ঘুরে, যেখানে যায় একটু সময় পেলেই বই খুলে বসে পড়ে আর বাঙালিরা সেই সময় কাটিয়ে দেয় আড্ডায়। উন্নত প্রযুক্তি যেখানে বহিঃবিশ্বে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে দ্বিগুণে সেখানে আমরা নাকি ফেসবুক, টুইটার, গেইম নিয়ে পড়ে থাকি দিনভর। বই পড়ার কথা একবারের জন্যও চিন্তা করি না। তাই আমাদের কল্পনারাজ্য ক্রমে ক্রমে অনেক ছোট হয়ে যাচ্ছে।’ বইপ্রেমী দাদু কয়েকমাস আগেই দুনিয়া থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেছে আর একা করে রেখে গেছে লিপাকে। বই নিয়ে তাই মজার মজার গল্প কেউ করে না এখন। দাদুর কথা মনে হলেই খুব কষ্ট পায় লিপা। দাদু ছাড়া তার আর কোন ভালো নেই।
লিপার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। একুশ নিয়ে মাথা খাটালে কেমন হয়! ছোট্ট একটা রচনাই তো। আর দাদু তো তাকে বলেছেই, ‘প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণই হচ্ছে বড় কথা, পুরস্কারটা আগে নয়।’ লিপা চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল ভাষা শহীদদের কথা। যাদের জন্যই আজকের এই রক্তাক্ত একুশ। একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে এমন একটা দেশও নেই যেখানে মাতৃভাষার জন্য একসাথে এত মানুষ জীবন দিয়েছে। মাতৃভাষার বুলি হৃদয়কে পুতপবিত্র করে তুলে। মমতা, ভালবাসায় জন্মভুমির শীতল মাটি সার্থক করে দেয় জনম। লিপা নিজেও এসব এড়িয়ে যেতে পারে না। লেখা শুরু করে খাতার পাতায়। দুই দিন পর ভাষা শহীদদের নিয়ে সুন্দর একটা রচনা দাড় করায় লিপা। এবার সেটা কাক্সিক্ষত জায়গায় পাঠানোর পালা। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে আসার সময় কুরিয়ারে সেই রচনাটা খামে করে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠিয়ে দেয় সে। একথা সে বাড়ি ফিরে এসে কাউকেই বলেনি।
এক সপ্তাহ পার হয়ে যায়। উথাল-পাথাল শুরু হয় লিপার মনে। একদিন কুরিয়ার সার্ভিসে লিপা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে মস্ত বড় এক সাফল্যের কথা। একুশ নিয়ে তার লেখা রচনাটাই সারা বাংলাদেশের ভিতর প্রথম স্থান লাভ করেছে।
আনন্দে আপ্লুত হয়ে যায় লিপার মন। খুশিতে রিপ্লে হওয়া চিঠিটা খোলে সে দেখে একটা নতুন চকচকে বই। বইটা খুলতেই প্রথমে তার লেখাটা বেরিয়ে আসলো। তারপর সেকেন্ড হওয়া একটা ছেলের লেখা, তারপর থার্ড হওয়া একটা মেয়ের লেখা। এভাবে দশ জনের সেরা লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। লিপার খুশি যেন আর ধরে না। কয়েকদিনেই তার নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা গ্রামে।
লিপা কাল বইমেলায় যাবে। এখন আর কেউই আগের মত তাকে বইমেলায় যেতে মানা করতে পারে না। তার মা তো এখন লক্ষ্মী হয়ে মেয়েকে আরও বেশি বেশি বই পড়ার জন্য উৎসাহ দেয়। ভুল ভেঙ্গেছে বাবারও। লিপার এখন বন্ধুর কোন অভাব নেই। কিন্তু সব থেকে যে ভালো বন্ধু তার নাম হলো-‘বইবন্ধু’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ