ঢাকা, রোববার 26 February 2017, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘কেউ আমাদের উত্তর দেয়নি  কেন এই হত্যাকান্ড

 

স্টাফ রিপোর্টার : নানা কর্মসূচির  মধ্যে আট বছর আগে সীমান্ত রক্ষা বাহিনীতে বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণ করা হয়েছে। ২০০৯ সালে ২৫ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বাহিনীতে বিদ্রোহের সময় পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের পর বাহিনীর নাম বদলে বিজিবি হয়।

গতকাল শনিবার সকালে বনানী সামরিক কবরস্থানে নিহতদের কবরে স্বজনরা ছাড়াও রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সামরিক কবরস্থানে যাদের দাফন করা হয়েছে তাদেরসহ নিহত সকলের প্রতি রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন ফুল দেন।

প্রায় একই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মো.  শফিউল হক, নৌ প্রধান এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ এবং বিএনপি নেতা সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমানও নিহতদের কবরে শ্রদ্ধা জানান।

নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনরাও কবরে দোয়া ও মোনাজাত করেন। বিচারে শাস্তি হলেও নিহত স্বজনদের অনেকেই হত্যার নেপথ্যের নায়কদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।

পিলখানাসহ বিজিবির সব রিজিয়ন, সেক্টর, ও ইউনিটে গতকাল খতমে কোরআন, মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। আজ রোববার বাদ আছর পিলখানায় বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে দোয়া মাহফিল ও মিলাদ অনুষ্ঠিত হবে। এই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন।

‘আট বছর কেটে গেল। কেউ আমাদের উত্তর দেয়নি, কেন এই হত্যাকান্ড? একটি মানুষ তো আর এমনি এমনি শহীদ হয় না। এর পেছনে একটা কারণ থাকে।’ পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে নিহত বাবা মেজর মিজানুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ কথাই বলছিল তাহসীন রহমান। ১৭ বছর বয়সী এই কিশোরের সঙ্গে ছিল ১১ বছর বয়সী ছোট ভাই ফারদিন রহমান। গতকাল রাজধানীর বনানীতে সামরিক কবরস্থানে বাবা মিজানুর রহমানের স্মৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাহসীন রহমান বলেন, ‘তখন আমার বয়স ছিল নয় বছর। ঘটনার দিন বাবার সঙ্গে সকালে নাশতা করেছিলাম। তারপর যে চলে গেলেন আর দেখা পাইনি।’ বাবা মারা যাওয়ার নয় মাস আগে তাদের মা রেবেকা ফারহানা ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাহসীন এখন টাঙ্গাইলে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করছে। আর ছোট ভাই ফারদিন গুলশানে নানা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে থাকে। 

তাহসীন ও ফারদিনের মতো বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা পরিবারের সদস্যরা বনানীর সামরিক কবরস্থানে শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নিহত লে. কর্নেল গোলাম কিবরিয়ার ছোট ভাই জাফরুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে এ ঘটনার সমাধান চাই। শহীদদের পরিবারের কান্না জাতিকে যেন আর দেখতে না হয়।’ নেপথ্যের ও ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার দাবি জানান তিনি।

বিডিআর বিদ্রোহে নিহত কর্নেল কুদরত-ই-এলাহীর বাবা হাবিবুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাই। কারণ, মানুষের বিচারে হয়তো প্রকৃত অপরাধীর বিচার নাও হতে পারে। যে দোষী, সে হয়তো বের হয়ে যায়।’

আট বছর বয়সী সাদাকাত সাবরি বিন মোমিন এসেছিল মা সোনিয়া আক্তারের সঙ্গে। বাবার মৃত্যুর ১১ দিন পর তার জন্ম হয়। মা বলেন, ‘একটা তো বিচার হচ্ছে। দ্রুত রায় কার্যকর চাই।’ জানালেন, ছেলে সব সময় বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। জন্মের আগে জানতেন না সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে। স্বামী আগে থেকেই কয়েকটি নাম ঠিক করে রেখেছিলেন। ছেলের জন্মের পর সেখান থেকে নাম নিয়ে নাম রাখা হয়েছে।

নিহত মেজর ইদ্রিস ইকবালের বড় ভাই মেজর ইউসুফ ইকবাল বলেন, দেশের প্রচলিত আইনে বিচার সম্পন্ন হলে তিনি সন্তুষ্ট হবেন।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটেছিল নারকীয় হত্যাকান্ড। সেদিন ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। বিডিআর বিদ্রোহের পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছিল। দুটি কমিটিই বলেছিল, তারা এ ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এ দুটি কমিটি এ ঘটনার তদন্ত ও ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটতে পারে সে ব্যাপারে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। কিন্তু দুই কমিটির অনেক সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। হত্যাকান্ডের ঘটনায় বাহিনীর নিজস্ব আইনের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে দুটি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে পিলখানায় হত্যাকান্ডের মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে মৃত্যুদ- অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আসামীদের আপিলের ওপর শুনানি এখন শেষ পর্যায়ে আছে। তবে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে করা মামলাটির বিচার এখনো শেষ হয়নি, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ