ঢাকা, রোববার 26 February 2017, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাইলেন জিহাদের বাবা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে খেলতে গিয়ে ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে ওয়াসার পরিত্যক্ত পাইপের ভেতর পড়ে যায় সাড়ে তিন বছরের শিশু জিহাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযানে আসে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। গণমাধ্যমের কল্যাণে সারাদেশের মানুষের সাথে বিশ্ববাসীর ্্ঔৎসুক্য দৃষ্টি তখন শিশু জিহাদের উদ্ধার অভিযানের দিকে। টানা ২৩ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে ব্যর্থ হওয়ায় পরদিন দুপুর আড়াইটার দিকে তা স্থগিত ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস। এতে বেদনাহত হয়ে পড়ে জনমন , শোকের নদী সাগরে মিলায় ।

ফায়ার সার্ভিসের এই ঘোষণায় আস্থা রাখতে পারেননি উপস্থিত সাধারণ মানুষ । সাত যুবকের নেতৃত্বে তখনই শুরু হয় সাধারণ মানুষের অভিযান। নিজেদের বানানো যন্ত্র নিয়েই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন জিহাদ-উদ্ধার অভিযানে।

মাত্র আধঘণ্টার মাথায় বিকেল ৩টার দিকে পাইপের ভেতর থেকে তারা বের করে আনেন শিশু জিহাদকে। যদিও ততক্ষণে মারা গেছে জিহাদ।

ওই ঘটনায় জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিন ফকির ২০১৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর ৬ জনকে আসামী করে শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। জিহাদের বাবার করা মামলায় চার মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল শাহজাহানপুর থানার এসআই আবু জাফর ৬ জন আসামীর মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম এবং শফিকুল ইসলামকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। কিন্তু ওই চার্জশিটের বিরুদ্ধে অপর চারজনও দায়ী বলে নারাজী দাখিল করলে ২০১৫ সালের ৪ জুন সিএমএম আদালত ডিবি পুলিশকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। মামলাটি অধিকতর তদন্তের পর আসামীদের অভিযুক্ত করে ডিবি পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান গত বছর ৩১ মার্চ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে স্বাক্ষী করা হয় ২৭ জনকে । এরপর গত বছরের ৪ অক্টোবর আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।

শিশু জিহাদের  মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় আজ। ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ ড. মো. আকতারুজ্জামানের আদালত এ রায় ঘোষণা করবেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর শওকত আলম বিষয়টি জানিয়ে বলেন, আজ রোববার দুপুরে মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। রায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণত অবহেলাজনিত এ আইনের বিচার আমাদের দেশে হয় না। তাই আমরা চাচ্ছি আদালতের মাধ্যমে এ মামলায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। আমরা আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছি। আমরা তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছি।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি আসামীদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য এদিন ঠিক করেন আদালত।

মামলার বাদীর আইনজীবী মো. জসিম উদ্দিন জানান, রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি তর্ক উপস্থাপনের পর ওই দিন আসামী পক্ষেরও যুক্তি-তর্ক শেষ হয়। এরপরেই রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন বিচারক।

মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে নিহতের বাবা বাদী নাসির উদ্দিন ফকিরসহ ১১ জন সাক্ষ্য দেন। এরপর আসামীপক্ষে রেলওয়ের ঢাকার বিভাগীয় প্রকৗশলী হামিদুর রহমান ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মাসুদ করিম এবং রেলওয়ের পরিচালক (প্রকৌশল) আব্দুল হক সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেন।

মামলার আসামীরা হলেন-রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসআর হাউজের মালিক মো. শফিকুল ইসলাম ওরফে আব্দুস সালাম, কমলাপুর রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জাফর আহমেদ শাকি, সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) দীপক কুমার ভৌমিক এবং সহকারী প্রকৌশলী-২ মো. সাইফুল ইসলাম।

সর্বোচ্চ শাস্তি চান জিহাদের বাবা

ছেলেকে আর ফিরে পাবেন না, তবে ছেলের মৃত্যুর জন্য যাদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল তাদের কারাগারে দেখতে চান জিহাদের বাবা নাসির ফকির। সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে নাসির ফকির বলেন, আমার ৭ বছরের আরেকটি ছেলে এবং ১৩ বছরের মেয়ে আছে। তবে পরিবারে ছোট ছেলে জিহাদের অপূর্ণতা এখনো কাটেনি। উঠতে-বসতে, খেতে সবসময় তার কথা মনে পড়ে। বড় দুই ভাই-বোন এখনো জিহাদের গল্প করে। ছেলে ফিরবে না জানি, তবে জীবিত থাকতে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চাই।

বর্তমানে জিহাদের বাবা নাসির মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করছেন। মা খাদিজা বেগম জিহাদের মৃত্যুর পর থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত। কানেও কম শোনেন । তাই সারাদিন বাড়িতেই থাকেন ,ঘরের এটাসেটা করেন।

বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে নাসির ফকির বলেন, বিচার যেভাবে চলছে আমি খুবই সন্তুষ্ট। নিয়মিত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। বিচার নিজ গতিতে চলেছে ,শুধু তাদের দায়িত্বহীনতার শাস্তি চাই।

আলাপকালে নিজের শঙ্কার কথাও বললেন নাসির। তিনি বলেন, আমি চাই আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তাদের শাস্তি দেখে সবাই যেন শিক্ষা পায়, এমন দায়িত্বহীনতার পরিচয় যাতে না দেয়। আসামীরা জামিনে এখন মুক্ত । যদি তাদের উপযুক্ত শাস্তি না হয়, আদালত থেকে দায়মুক্তি পেয়ে তারা আমার ক্ষতি করতে পারে বলে আমি শঙ্কায় আছি।

এর আগে মামলা তুলে নিতে স্থানীয় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হামিদুল হক শামীম জিহাদের বাবাকে নানাভাবে চাপ দেন। স্ট্যাম্প পেপারে তার স্বাক্ষরও নেন। তবে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সেখানেই চাপা পড়ে যায়।

জিহাদের বাবা বলেন, পত্রিকায় লেখালেখির কারণে মামলাটি চলেছে, তা না হলে আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক আগেই মামলাটি তুলে নিতে বাধ্য করতেন তারা। আমি সংবাদপত্রের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ