ঢাকা, সোমবার 27 February 2017, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ২৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মুনাফাকারী গ্যাস কোম্পানিগুলো ৫ বছরে সরকারকেই দিয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা

কামাল উদ্দিন সুমন: লোকসান নেই, সরকারকে ভর্তুকিও দিতে হয় না গ্যাস খাতে বরং প্রতিবছর গ্যাস কেনাবেচা করে লাভ করছে পেট্রোবাংলা। তারপরও অস্বাভাবিকহারে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভোক্তারা মনে করছেন, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতেই সরকার গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। কারণ কম দামে গ্যাস কিনে বেশি দামে বিক্রির পরও সরকার কেন আবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনেক প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ মনে করছে, সরকার একদিকে যেমন জনগণের সাথে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রতারণা করছে অন্য দিকে জনগণকে দুর্ভোগে ফেলতে ফের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয়ভার অনেক বেড়ে যাওয়ার আশংকা মানুষের। পাশাপাশি শিল্প বিনিয়োগে দেখা দিবে বড় ধরনের বিপর্যয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। কারণ এখাত এখনো অনেক লাভজনক। গ্যাস কোম্পানিগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকার পরও দাম বাড়ানোর মাধ্যমে আরেক দফা মানুষের পকেট কাটছে সরকার। 

পেট্রোবাংলার হিসাব বিভাগ থেকে জানা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে (২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর) পেট্রোবাংলা ও এর অধীনন্থ বিভিন্ন কোম্পানি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে ২৫ হাজার ৮৭৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ আয় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকিটা সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর, ডিএসএল বকেয়া, আয়কর, কাস্টমস শুল্ক ও রয়্যালটি থেকে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার কাছে এখন অলস পড়ে আছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতেও গ্যাস খাতে ভর্তুকি থেকে সরে আসার যুক্তি দেখিয়ে আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। যদিও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে গ্যাস খাতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ভর্তুকিই নেই।

 পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে গ্যাস খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের পরিমাণ ছিল ৪১৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে রাজস্ব আসে ৪ হাজার ৫৩৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে লভ্যাংশ ছিল ৩৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৫৮৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা রাজস্ব আসে, যার মধ্যে লভ্যাংশ ছিল ৮৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আসে ৫ হাজার ৩৭৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং লভ্যাংশ হয় ৪৪৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গ্যাস খাত থেকে ৬ হাজার ২০৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা রাজস্ব হয় সরকারের, এর মধ্যে লভ্যাংশ দাঁড়ায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। 

 পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস বিক্রি থেকে প্রাপ্ত লাভের অংশ ছাড়াও গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে (জিডিএফ) জমা আছে ৩ হাজার ৭২ কোটি টাকা। নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধ্যান, খনন এবং গ্যাস খাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যয় বহনের লক্ষ্যে ২০০৯ সালে এ তহবিল গঠন করা হয়, যেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রির বিপরীতে ১ থেকে দেড় টাকা জমা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে আয়ের সঞ্চিতি রয়েছে ৬ হাজার ২১১ কোটি টাকা। মূলধন সঞ্চিতিও রয়েছে ১ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলে বর্তমানে পেট্রোবাংলার ১০ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকার তহবিল রয়েছে, যার পুরোটাই অলস পড়ে আছে।

গ্যাস খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ খাতের সবক’টি কোম্পানিই লাভে আছে বর্তমানে। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্স ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা লাভ করে। ওই অর্থবছর সরকারকে ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে বাপেক্স।

গ্যাস বিতরণকারী ছয়টি কোম্পানিও লাভে আছে। মুনাফায় শ্রমিকের অংশ (ডব্লিউপিপিএফ) এবং কর-পরবর্তী মুনাফা পরিশোধ করার পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি লাভ করে কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে তিতাস ৮৮৮ কোটি ৬১ লাখ, জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানি ৯৮ কোটি ২৮ লাখ, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ৪২ কোটি ৯০ লাখ, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির ৫ কোটি ২৪ লাখ, বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি ১৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি ৩২৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা মুনাফা করে। সব বিতরণ কোম্পানি লাভজনক থাকার পরও নতুন করে দাম বাড়িয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দাবি করেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভ করছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো লোকসান করছে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) কাছ থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ৩-৪ টাকা বেশি দামে কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লোকসান করছে। সেটা আমাদের পুষিয়ে নিতে হচ্ছে।

তবে বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি খাতে বর্তমানে কোনো গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিকে ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ গ্রাহকের কাছে বিক্রীত গ্যাসের টাকায় কোম্পানিগুলো মুনাফা করছে। আইওসির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে যে বাড়তি টাকা ব্যয় হয়, তা সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা হয়।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে সরকার এলএনজির দামের সঙ্গে গ্রাহকদের সহনীয় করে তোলা এবং জ্বালানি খাতের উন্নয়নমূলক কাজের ব্যয় সংকুলানের কথাও বলেছে। বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলে সার্বিকভাবে গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে। তাই এ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সহনীয় করতে ধাপে ধাপে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস থেকে সরকারের অতিরিক্ত আয় জ্বালানি খাতের উন্নয়নে অবদান রাখবে না। গ্যাসের দাম বাড়লে অর্থের অপচয় বাড়ে, কিন্তু খাতের দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয় না। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে প্রচুর টাকা অলস পড়ে আছে। গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোও লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ সেখান থেকেই জোগান দেয়া যেত। এজন্য জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানোর দরকার নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, দাম বৃদ্ধির ফলে গ্রাহক ভোগান্তি তো বাড়বেই, পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যের দামও বাড়বে সব মিলে একটা নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে।

গ্যাসের নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, গৃহস্থালিতে প্রথম দফায় আগামী ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল পরিশোধ করতে হবে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭৫০ টাকা। দুই চুলার বিল দাঁড়াবে বিদ্যমান ৬৫০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ১ জুন থেকে এক চুলার ক্ষেত্রে মাসিক বিল বেড়ে হবে ৯০০ টাকা ও দুই চুলার ক্ষেত্রে ৯৫০ টাকা। আগামী জুন থেকে এ শ্রেণীতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের জন্য গ্রাহককে বিল পরিশোধ করতে হবে ১১ টাকা ২০ পয়সা। গৃহস্থালিতে মিটারভিত্তিক গ্যাসের বর্তমান মূল্য প্রতি ঘনমিটারে ৭ টাকা।

বাণিজ্যিক খাতেও গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বাণিজ্যিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের জন্য গ্রাহককে বর্তমানে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা পরিশোধ করতে হলেও আগামী জুন থেকে তা বেড়ে হবে ১৭ টাকা ৪ পয়সা। 

শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান মূল্য ৬ টাকা ৭৪ পয়সা হলেও জুন থেকে তা বেড়ে হবে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা। আর মার্চ থেকে জুনের আগ পর্যন্ত এ শ্রেণীর প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে ৭ টাকা ২৪ পয়সা।

ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহৃত গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। এ শ্রেণীর প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বিদ্যমান মূল্য ৮ টাকা ৩৬ পয়সা হলেও আগামী জুন থেকে তা বেড়ে হবে ৯ টাকা ৬২ পয়সা। এর আগের তিন মাসের জন্য ক্যাপটিভে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ টাকা ৯৮ পয়সা। 

নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, সিএনজির দাম বাড়ানো হয়েছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার সিএনজির মূল্য ৩৫ টাকা হলেও আগামী জুন থেকে তা বেড়ে হবে ৪০ টাকা। জুনের আগের তিন মাসে এর দাম হবে ৩৮ টাকা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মনে করে,বর্তমানে গৃহস্থালি ও শিল্প খাতে চাহিদামাফিক গ্যাসসংযোগ প্রদান করা যাচ্ছে না। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পণ্য উৎপাদন, রপ্তানি এবং পণ্য পরিবহনসহ সব ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে খরচ বাড়বে। এতে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে; মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সাধারণ জনগণ ভোগান্তিতে পড়বে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইমবি) বলেছে, মাছ, হিমায়িত খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিক, চামড়া ও তৈরি পোশাকের মতো রফতানি খাতের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব রফতানি খাতের সক্ষমতাও কমে যাবে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে যখন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি একটি বড় বাধা হবে। 

ইএবির মতে, রপ্তানিমুখী সব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্যতম দুটি প্রধান উপাদানের একটি হলো গ্যাস। গ্যাসের দাম বাড়লে সার্বিক উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন আরও কষ্টসাধ্য হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ এবং সক্ষমতা হারাতে থাকবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ