ঢাকা, মঙ্গলবার 28 February 2017, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৩, ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনগণ কিন্তু জুলুমের বিরুদ্ধে!

জিবলু রহমান : [দুই]
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক প্রতিবেদনে ১৬ এপ্রিল ২০১৬ বলা হয়, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনাকে দেশটির বড় মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে তার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৫ সালে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেন, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সুরায় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পূরণ, নাগরিক সমাজের পাশে দাঁড়ানো এবং সরকারগুলোকে এ বিষয়ে তাদের দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে তারা এই প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের পাশাপাশি উগ্রপন্থীদের হাতে ব্লগার হত্যা, সংবাদপত্র ও অনলাইনে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে কড়াকড়িকে অন্যতম মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে দেখছে। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন, নির্বিচারে গ্রেফতার, বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি সহিংসতা, কারখানার বাজে কর্ম-পরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে হত্যা ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত বা দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ সরকার খুব কমই নিয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কত মানুষের মৃত্যু হয়, তার কোনো পরিসংখান প্রকাশ করা হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হয় না, যদিও সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলে আসছে। প্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা, গ্রেফতারের পর গোপন আস্তানার সন্ধান ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধ, অপহরণ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুমের অভিযোগও এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে-ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় র‌্যাবের চেয়ে এগিয়ে আছে পুলিশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৯ মাসে র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৩৪ জন, পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৬১ জন, ডিবি পুলিশের ক্রসফায়ারে ১১ জন, পুলিশ ও বিজিবি’র ক্রসফায়ারে ১ জন, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সোয়াত টিমের অপারেশনে (হিট স্ট্রং-২৭) ৩ জন ও অপারেশন স্টর্ম-২৬ অভিযানে ৯ জন, পুলিশের নির্যাতনে ৭ জন, ডিবি পুলিশের নির্যাতনে ১ জন, রেল পুলিশের নির্যাতনে ১ জন, পুলিশের গুলীতে ৯ জন, বিজিবি’র গুলীতে ১ জন ও থান্ডারবোল্ট অভিযানে যৌথ বাহিনীর গুলীতে ৬ জন মারা গেছেন। এছাড়া থানা হাজতে অসুস্থ হয়ে ৪ জন এবং ২ জনের মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগের ভিত্তিতে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদা পোশাকে আসা ব্যক্তিরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৭৫ জনকে আটক করে নিয়ে যান। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৮ জনের লাশ পাওয়া যায়। তিনজন ফেরত আসলেও বাকি ১৮ জনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো আটকের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ সময়কালে কারা হেফাজতেও ২৩ জন কয়েদি ও ৩৪ জন হাজতি মারা গেছেন। (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম ২৬ অক্টেবর ২০১৬)
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, দলীয়করণ ও সেশনজট দূর করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে ছিল অস্থির। এসব প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস যেমন হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে সেশনজট।
স্কুল-কলেজের পরিচালনব্যবস্থা দলীয়করণমুক্ত, অধিকতর গণতান্ত্রিক করার কথা বলা হলেও সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সরকারদলীয় লোকেরাই পরিচালনা করছেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে প্রায় বছরভর সমালোচনার মুখে ছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মুক্তিযুদ্ধের কথায় স্লোগান দেয়া, এ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা, মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট দিয়ে চাকরি নেয়া সবই হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা করা লুটপাট করা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন অন্য কথা। বাংলাদেশে ৮৭% গরিব কৃষক এবং তাদের সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মধ্যবিত্তের মধ্যে ৫%ও সশস্ত্র বাহিনীতে ছিল না। এই মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ছাড়া সত্যকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করা যাবে না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গণতন্ত্র এখন সংঘাত ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল খুবই প্রয়োজন। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, বিরোধী দল দুর্বল হয়ে যাওয়া মানে গণতন্ত্রের জন্য তা ভয়াবহ দুঃসংবাদ, কারণ তা সরকারের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করবে, এবং কে না জানে, পাওয়ার করাপ্টস এবং অ্যাবসোল্যুট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসোল্যুটলি।
দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশে আইনের শাসন বলে কিছু থাকবে না। দলীয় পরিচয় বিবেচনা করে অপরাধীকে ছাড় দেয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সরকারের উচিত এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা। অপরাধী যত বড় নেতাই হোক না কেন তাকে অপরাধী হিসেবে দেখতেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। এতে জনপ্রিয়তা বাড়বে, কমবে না।
বিরোধী দলকে স্বাভাবিক সভা-সমাবেশ করতে না দিলে সরকারি দলের মধ্যেই স্বার্থান্বেষী বিরোধী উপদল তৈরি হয়। তারা বিরোধী দলের মতো নিয়মতান্ত্রিক সভা-সমাবেশ করে না-সন্ত্রাস করে। দিনদুপুরে রক্তপাত ঘটায়। নষ্ট রাজনীতিতে রক্তের প্রয়োজন যুক্তি ও বিতর্ক নয়।
উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি না থাকলে উগ্র রাজনীতির জন্ম নেয়। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সরকারি দলের-বিরোধী দলের নয়।
অনেক রক্তের বিনিময়ে এই দেশ, অনেক জীবনের বিনিময়ে আমাদের গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে মানুষের জান-মালের হেফাজত দিতে হবে। গণতন্ত্রে নানা মত, বহু পথই শেষ কথা। সবার কথাই শুনতে হবে। ভালো কথা মানতে হবে। তাহলেই দেশ পাবে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র পাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। আর জনগণ পাবে গণতন্ত্রের আসল সুফল। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ