ঢাকা, বুধবার 01 March 2017, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ০১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সারা দেশে হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘট চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ 

 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সারা দেশে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে হঠাৎ করেই ধর্মঘট শুরু করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই চালকের সাজার প্রতিবাদে সারা দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। শহরতলীর বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচলে বাধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাড়ি না পেয়ে রাস্তায় নাকাল হতে হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন রুটের যাত্রীদেরও। পায়ে হেঁটেই তারা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছেন। চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ, ময়মননিংহ, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দৈনিক সংগ্রাম-এর প্রতিনিধিরা পরিবহন ধর্মঘটে সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকার খবর জানিয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। অসুস্থ অনেক রোগীও পরিবহন ধর্মঘটের কবলে পড়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য কোথাও যেতে পারেননি। ধর্মঘটের কারণে বন্দরগুলোতে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আটকে পড়ায় ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। বাস না থাকায় চাপ বেড়েছে ছোট যানবাহন ও ট্রেনে। ধর্মঘট পালন করে পরিবহন শ্রমিকদের আদালতে এসে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। ধর্মঘটকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের কথা বলেছেন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ পরিবহন শ্রমিকদের বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হ্বার আহ্বান জানিয়েছেন। পরিবহন নেতারা বলছেন, তারা বাধ্য হয়েই ধর্মঘট পালন করছেন। 

উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনায় জামির হোসেন নামের এক বাস চালকের যাবজ্জীবন সাজা হওয়ায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় দুই দিন পরিবহন ধর্মঘট চলার পর সোমবার প্রশাসনের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা এলেও পরে শ্রমিক নেতারা কর্মসূচি বহাল রাখার কথা বলেন। এর মধ্যে ঢাকার সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার দায়ে সোমবার ঢাকার আদালতে ট্রাকচালক মীর হোসেনের ফাঁসির রায় হলে রাতেই পরিবহন শ্রমিক নেতারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি দেন।

এদিকে দাবি না মানা পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত পরিবহন শ্রমিকরা। বিষয়টি নিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান শ্রমিকরা। গতকাল বিকেলে গাবতলীতে এক সমাবেশে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, সংবাদপত্র, অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি গাড়ি ছাড়া কোনো রকম গাড়ি চলবে না, চালাতে দেব না। আমাদের নেতা শাজাহান খান কেবিনেট মন্ত্রী। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললে দুই মিনিটের ব্যাপার। এ আইন প্রত্যাহার করে শ্রমিকদের জেল থেকে বের করব। আমাদের দাবিদাওয়া সম্পূর্ণ মেনে নিলে শ্রমিকরা গাড়ি চালাবেন। সমাবেশে বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী বলেন, যাবজ্জীবন আর ফাঁসির দায় মাথায় নিয়ে আমরা গাড়ি চালাতে পারব না। যতক্ষণ না আইন বাতিল ও দ-িত চালকদের মুক্তি না  দেয়া হবে, ততক্ষণ এ আন্দোলন চলবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহিম বক্স দুদু চলমান পরিবহন ধর্মঘট প্রসঙ্গে বলেছেন, এটা আমাদের সাংগঠনিক কোনও সিদ্ধান্ত নয়। চালকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ করেছেন। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। গতকাল বিকেল পৌনে তিনটার দিকে মতিঝিলে ফেডারেশনের কার্যালয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আব্দুর রহিম বক্স বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় প্রচলিত আইনে বিচার করা হয়নি। বিশেষভাবে এর বিচার করা হয়েছে। আমরা চাই প্রচলিত আইনেই এ দুর্ঘটনার বিচার করা হোক। তিনি আরও বলেন, চালক জমিরকে সাজা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার গাড়ি চালনার বয়স ৩৩ বছর। এরপরও তাকে অদক্ষ চালক বলা হচ্ছে। তাহলে যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের বয়স দুই তিন বছর তারা গাড়ি চালাতেই জানেন না। আমরা আর গাড়ি চালিয়ে কী করবো। তাই আমরা গাড়ি চালানো থেকে অবসরে গেলাম।

ধর্মঘট কীভাবে হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের বিষয়ে আমরা সেদিন রাতেই আলোচনা করছিলাম। তখন রাতে টিভিতে খবর দেখলাম সাভারে সড়ক দুর্ঘটনায় মির হোসেন মিরু নামের এক চালকের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। মূলত এ রায়ের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেয়।

যাত্রীরা অসহায়: গতকাল সকাল থেকে দিনভর ঢাকার বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে যাত্রীদের অসহায়ত্ব দেখা গেছে। অনেকেই সকাল থেকেই অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সন্ধ্যা অবধি তারা বসেই ছিলেন। ঢাকার সায়েদাবাদে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন রুটের গাড়ি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে টার্মিনালের ভেতরে। বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরাও সেখানে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। অনেকে বাসায় ফিরে গেলেও জরুরি প্রয়োজন থাকায় কেউ কেউ অন্য বাহনের আশায় অপেক্ষা করছেন। সিলেটের পাথর ব্যবসায়ী মো. আলী নেওয়াজ তার স্ত্রী ও ভাতিজিকে নিয়ে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এসেছিলেন। কিন্তু বাস না ছাড়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। ‘সকাল ৯ টায় আসছি, কোনো লোকাল বাস পেলেই চলে যেতাম, কিন্তু কিছুই পাচ্ছি না। ঢাকায় কোনো থাকার জায়গাও নাই।’ 

সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী আরিফ কুমিল্লা যাওয়ার জন্য সকাল সাড়ে ৭টায় সায়েদাবাদ টার্মিনালে আসেন। কিন্তু বেলা সাড়ে ১২টায়ও গাড়ি পাননি তিনি। বেলা ১১টার দিকে গাজীপুর থেকে আসা বলাকা পরিবহনের একটি বাসকে মহাখালীতে ঘুরিয়ে  দেয়া হয়। ওই বাসের চালক জানান, মহাখালী টার্মিনালের সামনে দিয়ে যেতে দিচ্ছে না। ‘আমাদের যাইতে তো কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু টার্মিনালের সামনে দিয়া যাইতে দেয় না।’ কুড়িল বাসস্ট্যান্ডে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর বাসে উঠেছিলেন মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আসাদুল হক। মহাখালীতে নামিয়ে দেয়ায় বিরক্ত তিনিও। ‘ভাই, অনেক সময় দাঁড়াইয়া বাসে উঠতে পারছি। কিন্তু এরপর আবার এইখানে আইসা নামাইয়া দিল। কিভাবে যাই বলেন?’

গাবতলী থেকেও কোনো বাস ছাড়ছে না। চালকদের কর্মবিরতির কারণে হানিফ পরিবহনের সব বাস বন্ধ রয়েছে বলে জানান হানিফ পরিবহনের মহাব্যবস্থাক মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, চালকরা গাড়ি চালাচ্ছে না। আমাদের সব বাস টার্মিনালে। কোনো বাস ছাড়তে পারছি না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরতে এসে গাবতলীতে আটকা পড়েন খুলনার হান্নান খান। সকাল ৬টা থেকে কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি না পাওয়ায় ২টার দিকে ট্যাক্সি ভাড়া করে পাটুরিয়া ফেরিঘাটের পথ ধরেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী, বাবা ও মা। হান্নান বলেন, ১৭ দিন ছেলের চিকিৎসা শেষে এখন বাড়ি যাচ্ছি। ধর্মঘট না কর্মবিরতি কিসের কারণে যেন বাস যাচ্ছে না। হাসপাতালে থাকার সময় যেসব কাপড়চোপড় ছিল সেগুলোও সাথে আছে। সকাল থেকে কিভাবে যে সময় পার করছি, আপনাকে বোঝাতে পারব না।

মায়ের অসুস্থতার খবরে আর মেয়ের এসএসসি পরীক্ষার কারণে বাড়ি যাচ্ছিলেন রিকশাচালক আবদুল আজিজ। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সাতক্ষীরার গাড়ি পাননি তিনি। ‘বাড়ির ঝামেলার খবর হুইন্যা বাড়ি যাইতেছিলাম। সকাল থেকে অপেক্ষা করতেছি, মালিক সমিতি বলে হরতাল ডাকছে, কখন গাড়ি ছাড়বে তার ঠিক নাই। অপেক্ষায় আছি, আল্লায় যেভাবে নিয়া যায় যামু।’ গাবতলীতে ফরিদপুর, পিরোজপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে চলা গোল্ডেন লাইন পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার শেখ আলমগীর হোসেন বলেন, কোম্পানি অর্ডার করছে বাস বন্ধ রাখার, কোনো গাড়ি বাইর হয় নাই আজকে। আমাদের দুই-আড়াইশ গাড়ি বসা।

হাঁটাই যাত্রীদের ভরসা: পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে হাঁটাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীতে গুটিকয়েক বাস চললেও সেগুলোতে উঠার কোন পরিবেশ ছিল না। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে এসব বাসে উঠেছেন। গবাতলী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত হেঁটে অফিস করতে হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার কলেজ শিক্ষক মাহ্বুবুল ইসলাম সেলিম কয়েকদিন আগে বেড়াতে যান চট্টগ্রামে। কিন্তু হঠাৎ চুয়াডাঙ্গায় শ্বশুরের মৃত্যুর খবর পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে বিমানে আসেন ঢাকায়। পরে ঢাকা থেকে একটি প্রাইভেটকার নিয়ে রওনা দেন চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে। ঢাকা থেকে আসতে বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে শ্রমিক সংগঠনের পিকেটিং-এর মুখে পড়তে হয় তাকে। মানবিক কারণে ছাড়া পেয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত আসতে পারলেও আবারও শ্রমিক সংগঠনের বাধার মুখে পড়েন। কোনোভাবেই তাকে যেতে  দেয়া হচ্ছে না। পরে পুলিশের সহায়তায় মানিকগঞ্জ প্রান্ত থেকে মুক্ত হতে পারলেও সামনের ব্যারিকেড নিয়ে ততক্ষণে আরও আতঙ্কে ছিলেন সেলিম। শ্বশুরের জানাযায় শরিক হতে পারবেন কিনা সেটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

যাত্রীদের হয়রানি: এ রকম শত শত মানুষের ভোগান্তির চিত্র ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে চোখে পড়েছে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা সকাল থেকে পিকেটিং করতে থাকে। দূরপাল্লার কোনও যানবাহন চলাচল করেনি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে। এছাড়া জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতেও কোনও ধরনের যাত্রীবাহী বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে কোনোমতে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত আসতে পারছেন অনেকে। তবে পাটুরিয়া কিংবা আরিচা পর্যন্ত যেতে কোনও ধরনের যানবাহন না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী। বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে পাটুরিয়ার পথে রওনা দেন। মানিকগঞ্জ থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার পথে তাই মানুষের ঢল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের মানিকগঞ্জ শাখার সভাপতি বাবুল সরকার জানান, যেহেতু এই অবরোধ কর্মসূচি কেন্দ্রীয়ভাবে আহ্বান করা হয়েছে তাই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে পারেন না।

রাজধানীতেও যাত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। তারা বাস থেকে যাত্রীদের জোর করে নামিয়ে দিয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের মাঝেও কিছু বাস রাজধানীতে চলাচল করেছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা বিভিন্নস্থান থেকে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে। এমনকি অনেকের সাথে খারাপ আচরণ করে। 

রাজধানীর সদরঘাট থেকে গাবতলী যাচ্ছিলেন মো. মিলন নামের একজন যাত্রী। তিনি জানান, সকালে ইসলামপুর থেকে কাপড় কিনে সদরঘাট থেকে গাবতলী আসছিলেন। বাসটি বেলা একটার দিকে কল্যাণপুরে আসার পর ঘুরিয়ে ফেলা হয়। এ সময় চালক ও তার সহকারী তাকেসহ সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেন। সেখান থেকে কাপড়ের বস্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে গাবতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত যেতে হয়েছে তাকে। এদিকে মিরপুর ১ নম্বর, ১০ নম্বরে আন্দোলনরত পরিবহনশ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের সামনে গরুর হাট ক্রসিংয়ে ও দারুস সালামে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ করে রেখেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। রাস্তাঘাটে হাজারো যাত্রী গাড়ির অপেক্ষায়। কিন্তু ঢাকা থেকে কোনো গাড়ি বের না হওয়ায় এবং ঢাকায় কোনো গাড়ি ঢুকতে না পারায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের (পশ্চিম) উপকমিশনার লিটন কুমার সাহা বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের অবরোধের কারণে কোনো যান চলাচল করতে পারছে না। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।

কঠোর হওয়ার পরামর্শ এরশাদের : দুই চালকের সাজার রায়ের পর পরিবহন ধর্মঘটে জনভোগান্তির কথা তুলে ধরে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেছেন, পরিবহন ড্রাইভারদের অবহেলার কারণে প্রতিদিন অগণিত মানুষ নিহত হচ্ছে। কথায় কথায় ধর্মঘট করে তারা জনগণকে জিম্মি করে ফেলে। সরকারকে তা দমন করতে হবে। তাদের আন্দোলনের হুমকিতে ভীত হলে চলবে না। গতকাল জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে দলীয় এক অনুষ্ঠানে পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের এ মন্তব্য আসে। 

সাবেক সেনা শাসক এরশাদ বলেন, আমি ক্ষমতায় থাকার সময় পরিবহন ড্রাইভারের অবহেলার কারণে কোনো মানুষের মৃত্যু হলে মৃত্যুদ-ের বিধান করেছিলাম। সে আইন রাখতে পারে নাই। বর্তমান আইনে রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদ-। তাও বহাল রাখা যাবে কি না সন্দেহ। আইন বাস্তবায়ন করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কমবে বলে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির ধারণা।

আদালতে বক্তব্য দিন : জনসাধারণকে কষ্ট না দিয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে তা আদালতে উপস্থাপন করতে ধর্মঘটী পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। চলমান অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে নিজের কার্যালয়ে এক বি্িরফংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আহ্বান জানান। আনিসুল হক বলেন, আমি মনে করি, রায়ের প্রেক্ষাপটে ধর্মঘট দুঃখজনক। যারা ধর্মঘট করছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমি কেবল এইটুকু বলতে চাই, আপনাদের যদি কোনো বক্তব্য থাকে, আপনারা যদি সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন, তাহলে আদালতের সামনে আপনাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন। আইনে সেই বিধান আছে। জনগণকে কষ্ট না দিয়ে বক্তব্য থাকলে সেটা স্পষ্ট করেন, যদি সেটা যুক্তিসঙ্গত হয়, তাহলে আমি বলতে পারি, এটা দেখা হবে। কিন্তু যদি অযৌক্তিক হয়, তাহলে এটা দেখা হবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটা আদালত অবমাননা কি-না, সেটা নির্ভর করে আদালত এটাকে কিভাবে গ্রহণ করবে তার উপর। অবমাননার ব্যাপারটা আদালতের বিবেচ্য। আদালত যদি মনে করে, আমি এটা ধর্তব্যের মধ্যে ধরব না, তাহলে এটা অবমাননা মনে করবেন না। এটাই আইন। আর যদি তিনি অবমাননা মনে করেন, তাহলে এটা অবমাননা হিসাবে নেয়া যাবে।

শ্রমিক নেতা ও পরিবহন মালিকের বক্তব্য: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ গতকাল সকালে বলেন, এক বাসচালকের যাবজ্জীবন সাজার রায় আসার পর শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। কয়েক দিন ধর্মঘট পালনের পর গত রাতে আমরা আলোচনায় বসে সমস্যার প্রায় সমাধান করে ফেলেছিলাম। পরে শোনা গেল সাভারে এক দুর্ঘটনার মামলায় ঢাকার ৫ নম্বর জজ কোর্টে এক ট্রাকচালকের ফাঁসির রায় হয়েছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা এখন অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসব।

এস আলম পরিবহনের ঢাকা অঞ্চলের ইনচার্জ মোহাম্মদ মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে, সারা দেশে যান চলাচল বন্ধ। আমরা অসহায়ের মতো এর সঙ্গে আছি। পক্ষেও নাই বিপক্ষেও নাই। তিনি বলেন, এর আগে কখনও এমন সাজা হয়নি। সে কারণে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত। আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থার একটা সমাধান জরুরি। চালকরা রাজি না হওয়ায় সকাল থেকে কোনো গাড়ি চলছে না বলে জানান ইউনিক পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হক। তিনি বলেন, আমি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ গাড়ি চালাতে রাজি নয়। এ কারণে গাড়ি বন্ধ। 

ফেনী থেকে চলাচলকারী স্টার লাইন বাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর আহমেদ জানান, ধর্মঘটের কারণে তাদের কোনো বাস ফেনী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়নি। ধর্মঘট চলা অবস্থায় তাদের বাস চলবে না বলে তিনি জানান। চট্টগ্রাম থেকে কুড়িগ্রাম রুটের সৌখিন পরিবহনের চালক মাসুদুর রহমান হিরণ বলেন, এই রুটে সোমবার থেকেই বাস চলাচল বন্ধ। বিশ বছর ধরে গাড়ি চালাই। রাস্তায় যদি একটা সাপও পড়ে, তার পরও আমরা সেটাকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু এভাবে সাজা দিলে আমরা গাড়ি চালাতে পারব না। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

এই কর্মবিরতি পূর্বনির্ধারিত কোনো কর্মসূচি নয় বলে দাবি করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল হক সদু। তার ভাষ্য, শ্রমিকরা অন্য যানবাহন চলাচলে কোনো বাধা দিচ্ছে না। তিনি জানান, আমার জানামতে কোনো সংগঠন এ ধর্মঘট পালন করে নাই। ড্রাইভাররা কর্মবিরতি করেছে। এখন কেউ যদি গাড়ি না চালায়, আমরা তো জোর করতে পারি না। সবারই তো এটা করার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে।

কেরানীগঞ্জ : সকালে পরিবহন শ্রমিকেরা ঢাকা থেকে মাওয়াগামী বাস চলাচলে বাধা দেয়ায় এই রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ আছে। এ ছাড়া সকাল নয়টার দিকে পুরান ঢাকার রাইসাহ্বে বাজার ও বংশাল এলাকায় পরিবহন শ্রমিকেরা যান চলাচলে বাধা দেন। এ কারণে সদরঘাট-গুলিস্তান রোডে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর কমলাপুর এলাকা, মুগদা ও সায়েদাবাদ এলাকা থেকেও কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ : সকাল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকেরা। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। নগরের বাস টার্মিনাল এলাকায় বিভিন্ন বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছে। ১ নম্বর রেলগেট এলাকার বিভিন্ন বাস কাউন্টারগুলো তালা বন্ধ রয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে যানবাহন মিলছে না। ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী জোবায়ের হোসেন ও আহম্মেদুল করিম বলেন, হঠাৎ করে পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ করে  দেয়ায় তারা ভোগান্তিতে পড়েছেন। কিন্তু তাদের ঢাকা যাওয়া জরুরি। বাসের জন্য অপেক্ষমান নারী জ্যোৎস্না বেগম বলেন, তিনি স্বামী ও ছয় বছরের মেয়েসহ গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ যাবেন। বাস কাউন্টারে এসে দেখেন ধর্মঘট। আজ বাড়িতে যেতে না পারলে আবার অফিস থেকে ছুটি নেয়া যাবে না।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের সব পরিবহন শ্রমিকও জানতেন না মঙ্গলবার সকাল থেকে ধর্মঘট। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মানুষ এবং নগরবাসীও ধর্মঘটের খবর আগে পায়নি। সকালে বাইরে বেরিয়ে ধর্মঘটের বিষয়ে তারা জানতে পারেন। আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা শামীম সুমন বলেন, “আমার অফিস প্রবর্তক মোড়ে। সকালে বেরিয়ে দেখি গাড়ি চলছে না। এখন হেঁটেই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। সকালে চট্টগ্রামে থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন সরকারি কর্মকর্তা আয়াজ মাবুদ। তিনি বলেন, অটোরিকশা করে পেকুয়া পর্যন্ত এসেছি। পেকুয়া থেকে পিকআপ ভ্যানে চকরিয়ার দিকে যাচ্ছি। কিভাবে কক্সবাজার পৌঁছাব তা এখনও জানি না। নগরীর সব মোড়ে শত শত মানুষকে যানবাহনের অপেক্ষায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে গাড়ি না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। 

এদিকে সকালে নগরীর বিভিন্ন রুটে সিটি সার্ভিসের বাস চলাচল করলেও শ্রমিকদের বাধার কারণে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাও বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামের উপজেলা পর্যায়েও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। টার্মিনাল থেকে আন্তঃজেলা বাস ও দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। নগরীর বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল ও কদমতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা সব ধরনের যান চলাচলে বাধা দিচ্ছেন। ধর্মঘটের কারণে বাস-মিনিবাস, ট্রাক, কর্ভাড ভ্যান, হিউম্যান হলারসহ সব গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে। নগরী ও মহাসড়কে অটোরিকশা ও রিকশা চলাচল করছে। তবে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল এলাকায় চলাচল করায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাংচুর করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। অটোরিকশার চালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, “যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় তারা আমার গাড়ির কাচ ভাংচুর করে।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, কেন্দ্র থেকে এই কর্মসূচি আহ্বান করা হয়েছে। রাতে কর্মসূচি ঘোষণা করায় সব জায়গায় খবর পৌঁছায়নি। তাই কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড ছাড়া অন্য কোথাও যাতে পিকেটিং না হয় সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। 

চান্দগাঁও থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিবহন ধর্মঘট থাকায় শ্রমিকরা গাড়ি চলাচলে বাধা দিচ্ছে। টার্মিনাল এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া : আলমডাঙ্গা উপজেলার হারদি গ্রাম থেকে ফাতেমা খাতুন (৩২) সোমবার বিকালে ট্রেনে করে এসেছিলেন জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে। মঙ্গলবার বিকালে আবার ট্রেন আসার অপেক্ষায় বসে আছেন স্টেশনে। তিনি বলেন, যত দুর্ভোগ আমাগে ঘাড়ে আইসে পড়ে। কুষ্টিয়া-আলমডাঙ্গায় চলে একটি মাত্র ট্রেন। তাও বিকেল সাড়ে ৪টায়। কাইল বিয়ালে আইছি। আইজ বিয়ালের জন্যি স্টেশনে বইষে রইছি। সদর উপজেলার গট্টিয়া গ্রামের কাঁচামাল বিক্রেতা ইউসুফ আলী বিকল্প পরিবহন স্যালো ইঞ্জিনচালিত ভটভটিতে সবজি বোঝাই করে ধর্মঘটের আওতামুক্ত ঈশ্বরদী যাচ্ছিলেন। যশোর রেলস্টেশন যশোর রেলস্টেশন পথে বারখাদায় ধর্মঘট বাস্তবায়নকারীরা ট্রলি উল্টে দিলে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যান বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতির মুখে পরবর্তীতে মালামাল কেনাবেচার মূলধনই শেষ হয়ে গেল। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ শেষ বর্ষের ছাত্র আকিমুল ইসলাম রাজবাড়ির বহরপুর গ্রামের বাড়ি যাবেন। বাস বন্ধ থাকায় সকাল থেকে অপেক্ষা করে আছেন বিকল্প পথ ট্রেনের আশায়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ভিড়। ট্রেনে তিলধারণের জায়গা নেই। বেলা ১১টার ট্রেনে উঠতে পারেননি। বসে ছিলেন বিকেলের ট্রেন ধরতে।

তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, নাগরিক জীবনের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগ। বিচারের রায়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ক্ষুব্ধ হতেই পারে। তার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক পথ খোলা আছে। সেই পথে না গিয়ে এভাবে ধর্মঘটে জনজীবনকে জিম্মি করে বিচারের রায় বদলে দেয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই সমাধানের পথ হতে পারে না।

ঝিনাইদহ: আবদুর রশিদ চাকরি করে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে। তিনি তার ভোগান্তির কথা বললেন। ‘মাগুরা থেকে প্রথমে মাহেন্দ্র করে হাটগোপালপুর আসি। সেখান থেকে ইজিবাইকে ঝিনাইদহ শহর, তারপর আরেক ইজিবাইকে শৈলকুপা। এভাবে আসতে তার অন্যদিনের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি খরচ হয়েছে বলে জানালেন। ‘এমনিতে বাসে লাগে ৪০ টাকা। আজ খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ টাকা।’ তবে ইজিবাইককেও লাঠিসোঁটা নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা বাধা দিচ্ছেন জেলার বিভিন্ন জায়াগায়। ঝিনাইদহ শহরের আরাবপুর বাসস্ট্যান্ড ও বাস টার্মিনালে গিয়ে কোনো ধরনের যান দেখা যায়নি।

দিনাজপুর : গতকাল সকাল ১০টায় দিনাজপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। এসময় ছবি তুলতে গেল শ্রমিকরা তেড়ে আসেন। তারা ছবি তুলতে বাধা দেন। এ সময় কয়েকজন শ্রমিক চিৎকার করে বলতে থাকেন, সাংবাদিকদের লেখালেখির কারণে চালকদের সাজা হয়েছে।

সিলেট : মেয়েকে দেখতে এসে আটকা পড়েছেন বগুড়ার আফসানা বেগম। তার মেয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তিনি বলেন, দুশ্চিন্তাটা বিশেষত এ কারণে যে কবে ধর্মঘট শেষ হবে তা কেউ বলতে পারছেন না। চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। ধর্মঘটের কারণে তিনি টার্মিনাল থেকে আবার মেয়ের কাছে ফিরে যাচ্ছেন। আফসানা রেগে বলেন, কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকার অভ্যাস হয়েছে বাঙালির। সিলেট নগরীতে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো যান ছেড়ে যায়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অটোরিকশা ও হালকা যান চলাচল করতে দেখা গেছে। কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, হুমায়ুন রশিদ চত্বর ও চ-ীপুল এলাকায় পিকেটিং করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক জানান, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দুই চালকের সাজার প্রতিবাদে কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।

ময়মনসিংহ : ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকে মাসকান্দা কেন্দ্রীয় ও পাটগুদাম আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। অন্য কোনো বাসও ময়মনসিংহে আসেনি। হঠাৎ করে বাস বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। ঢাকাগামী যাত্রী সেলিম হোসেন বলেন, আমরা ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে টার্মিনালে এসে দেখি বাস বন্ধ। তাই বাসায় ফিরে যেতে হচ্ছে। মাসকান্দা বাস টার্মিনালের এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপক রতন প-িত জানান, পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকেই বাস চলাচল বন্ধ আছে।

বেনাপোল বাসচালক আব্দুল খালেক ও রতন মিয়া জানান, আদালতের দেয়া বাসচালকের যাবজ্জীবন কারাকা- বাতিল না করা পর্যন্ত পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জহির রায়হান বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে আলাপ-আলোচনা চলছে। খুব শিগগিরই সমাধান হবে বলে আশা করছি।”

যশোর : শহরের মুরলী মোড়, চাচড়া চেকপোস্ট এলাকা, পালবাড়ি-খয়েরতলা ও উপশহর ঘুরে দেখা গেছে, পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে যান চলাচলে বাধা দিয়েছেন। এখানে চার চাকার পাশাপাশি মোটরসাইকেল বা টেম্পোও চলতে দেয়া হচ্ছে না। শ্রমিকরা বিক্ষোভও করেছেন। এতে যাত্রীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। বিশেষত সোমবার ধর্মঘট প্রত্যাহারের খবর আসায় অনেকেই সকালে বাইরে এসেছেন। তারা জানেন না, ধর্মঘট চলমান রেখেছে শ্রমিকরা। যাদের গন্তব্যে ট্রেন যায় তারা হেঁটেই রেলস্টেশনে যাচ্ছেন। দূরের যাত্রীরা ফিরে যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ