ঢাকা, বুধবার 01 March 2017, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ০১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে হরতাল

 

স্টাফ রিপোর্টার : গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে আধাবেলা হরতাল করেছে বামদলগুলো। গতকাল মঙ্গলবার হরতাল চলাকালে সকাল ১০টার পর শাহবাগে বাম ছাত্রসংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মিছিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান থেকে পানি ছোড়ে। সংগঠনের নেতারা বলছেন, সেখানে তাদের ১৬জন আহত হয়েছে। এছাড়া পল্টনসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল করেছে হরতালকারীরা। হরতাল পালনকারী বাম জোটের নেতৃবৃন্দ বলছেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি গণবিরোধী একটি সিদ্ধান্ত। জনগণ এ সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেবে না। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১-১৪ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার বিক্ষোভ ও ১৫ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে বাম দলগুলো। এসব কর্মসূচির পরেও গ্যাসের দাম না কমালে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরা।

জানা যায়, গতকাল সকাল আটটার দিকে শাহবাগ মোড়ে টায়ার জ্বেলে ও ইট রেখে সড়ক অবরোধ করে হরতালকারীরা। এ সময় প্রায় ৪০ মিনিট শাহবাগকেন্দ্রিক এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল। ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন ছিল। পরে হরতালকারীরা মিছিল নিয়ে রূপসী বাংলা হোটেল ঘুরে আজিজ সুপার মার্কেটের দিকে চলে যায়। 

হরতালকারীরা আবার সাড়ে ১০টায় শাহবাগে অবস্থান নিতে গেলে পুলিশ টিয়ারশেল ও জলকামান দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সকাল ১০টার পর শাহবাগে বাম ছাত্রসংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্রজোটের মিছিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান থেকে পানি ছোড়ে। সংগঠনের নেতারা বলছেন, সেখান থেকে সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। আহত হয়েছেন ১৬ জন। সংগঠনের নেতারা বলছেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতা। তাঁদের মধ্যে দুজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন নাসিরউদ্দিন ও ভজন। আহত ব্যক্তিদের আশপাশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। 

হরতালকারীদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করেছে পুলিশ। সকাল ১১টার দিকে শাহবাগের ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল।

এ ছাড়া সকালে পল্টন, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও লালবাগে হরতালের সমর্থনে মিছিল হয়েছে। পুরানা পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ের সামনে রাস্তার একাংশ অবরোধ করে রাখে হরতালকারীরা। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। হরতালকারীদের অভিযোগ, মিরপুর এক নম্বরে মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল সীমিত ছিল। 

গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকার অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদে এই হরতাল ডেকেছি। আমাদের এই ডাকে সাড়া দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হরতাল পালিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিবহন কোম্পানিগুলো জোর করে রাস্তায় বাস বের করছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, মিরপুর এক নম্বরে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়েছে। 

হরতালের সমর্থনে সকাল থেকেই হরতালকারীরা মিছিল ও আলোচনার মধ্য দিয়ে সরগরম করে রাখেন শাহবাগ ও জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকা। হরতালের সমর্থনে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সোহেল প্রমুখ।

অন্যদিকে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার কর্মীরা সকাল থেকে পল্টন, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় খ- খ- মিছিল নিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ‘গণবিরোধী সিদ্ধান্ত’ বাতিলের দাবি জানান।

হরতালে আটক ১১: গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) হরতাল চলাকালে ১১ জনকে আটক করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। গতকাল শাহবাগ থানায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান।

পুলিশ কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে: গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) হরতালে টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, বাহিনীর সদস্যরা কঠিন ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে উল্লিখিত মন্তব্য করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান।

ডিসি বলেন, সকাল থেকে পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। শাহবাগ ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে দুটি হাসপাতাল রয়েছে। এটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার অন্যতম সড়ক। হরতাল সমর্থনকারীরা এ জায়গা অবরুদ্ধ করে রাখায় জনগণের ভোগান্তি হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বারবার রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তারা তা না মেনে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তখন পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।

প্রেস ক্লাবের সামনে সংঘর্ষ: হরতাল সমর্থনকারী ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজন আহত হয়েছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল সাড়ে ১১টায় এ ঘটনা ঘটে। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রেসক্লাবের সামনে হরতাল সমর্থনকারী বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক দল এবং হরতাল বিরোধী বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক লীগের নেতারা দুটি মানববন্ধন করছিলেন। এ সময় হরতাল সমর্থনকারীরা পরিবহন যাতায়াতে বাধা দেওয়ায় শ্রমিক লীগের নেতারা তাতে বাধা দেয়। এমন সময় দু পক্ষের মধ্যে বাকবিত-া চলে। বাকবিত-ার এক পর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ১০ মিনিট ধরে দুপক্ষের মধ্যে থেমে থেমে হাতাহাতি চলে। 

এ ঘটনার পরে পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আমরা মানববন্ধন করছি। কিন্তু হরতাল সমর্থনকারীরা আমাদের পাশে অবস্থান নিয়ে বাস যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। এর প্রতিবাদ করায় তারা আমাদের ওপর হামলা করেছে। তিনি আরও বলেন, শ্রমিক লীগের তিন কর্মী আহত হয়েছে। সিরাজ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ এবং হারুন উর রশিদ আহত হয়েছেন।

বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, হরতালের কারণে শ্রমিক লীগের নেতাদের সঙ্গে আমাদের কোনও সংঘর্ষ হয়নি। রাস্তা দিয়ে বাস যাতায়াত করছিল তখন বাসের হেলপারদের সঙ্গে শ্রমিক লীগের নেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধেছে। এখানে আমাদের কোনও সংশ্লিষ্ঠতা নেই।

১৫ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘেরাও করবে বাম দলগুলো: গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১-১৪ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে বাম দলগুলো। আর ১৫ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক পার্টি (বাসদ), বাংলাদেশ কমিনিউস্ট পার্টি ( সিপিবি) ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। এসব কর্মসূচির পরেও গ্যাসের দাম না কমালে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরা।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশে কমিনিউস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক দলের পক্ষে এ ঘোষণা দেন কমিনিউস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর আহমেদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার পক্ষে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি।

এসময় আবু জাফর আহমেদ বলেন, দেশেরর মানুষ লাভবান হবে না তারপরেও গ্যাসের দাম কেন বেড়েছে? কারণ উন্নয়নের নামে মানুষের পকেট কাটছে সরকার। এটা হতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, বুধবার থেকে যদি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে তাহলে ১-১৪ মার্চ লাগাতার আন্দোলন করবে সিপিবি। এরপর দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ১৫ মার্চ জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘেরাও করা হবে। এরপরেও যদি সরকারের টনক না নড়ে তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে ও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, সরকার লুটেরা গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করছে। যার বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না। তিনি বলেন, আমাদের আজকের হরতালে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে। তাদের সঙ্গে নিয়েই আমরা আন্দোলন সফল করবো। তিনি আরও বলেন, সরকারের লুটেরা বাহিনী ছাড়া সবাই এই হরতালের সমর্থন করছে।

সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে তারা খুব শক্তিশালী অবস্থানে নেই। অবিলম্বে গ্যাসের দাম না কমানো হলে সরকারের টনক নাড়িয়ে দেওয়া হবে।

বিক্ষোভ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কমিনিউস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাসদ নেতা আব্দুর রাজ্জাক, বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশিদ ফিরোজ প্রমুখ। 

উল্লেখ্য, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক সাংবাদিক সম্মেলনে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর প্রতিবাদেই রাজধানীতে মঙ্গলবার হরতালের ডাক দেয় বাম দলগুলো। এসএসসি পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষার সব কাজ এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, হাসপাতাল-অ্যাম্বুলেন্স, সংবাদপত্র-প্রচারমাধ্যম, জরুরি গ্যাস ও বিদ্যুতের কাজ হরতালের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম জানান, ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য দিতে হবে ৭৫০ টাকা। দুই চুলার জন্য দিতে হবে ৮০০ টাকা। মনোয়ার আরো জানান, জুনে দ্বিতীয় দফায় বাড়বে গ্যাসের দাম। ১ জুন থেকে এক চুলার জন্য দিতে হবে ৯০০ টাকা। আর দুই চুলার জন্য দিতে হবে ৯৫০ টাকা। তবে গতকাল হাইকোর্ট দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করে রুল জারি করেছেন।

গ্যাসের এই দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গতকাল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল পালন করে বামদলগুলো। হরতাল ডেকেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা ও গণসংহতি আন্দোলন।

বাম দলগুলোর ডাকা এই হরতালে সমর্থন দিয়েছে বিএনপিসহ কয়েকটি দল। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের একটি অনুষ্ঠানে হরতালের পক্ষে তাদের সমর্থনের কথা জানান। এছাড়া সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ সিপিবি-বাসদ আহূত হরতালের প্রতি নৈতিক সমর্থন দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ