ঢাকা, বুধবার 01 March 2017, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ০১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাসায়নিকের সাথে বসবাস পুরান ঢাকাবাসীর ॥ জীবনঝুঁকি সরাতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু আজ থেকে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল: অপরিকল্পিত নগরায়নের ফসল রাজধানীর ‘পুরান ঢাকা’। এ গিঞ্জি পরিবেশ গড়ে উঠেছে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবেই। সেখানকার জীবনমানও তেমন একটা সুউচ্চ নয়। তবুও গড়ে উঠেছে একের পর এক আবাসিক আর বাণিজ্যিক ভবন। এসব ভবনের ফাঁক গলে চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্যভাব নেই বিভাগীয় নজরদারীর অভাবেই। সকল স্তরে বৈধ-অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আধিক্যে আবাসিক মান বজায় রাখতে পারেনি পুরান ঢাকা। তাই মৃত্যু এসে হানা দেয় বারবার। ছোটবড় দুর্ঘটনা সেখানকার নিয়তি যেন। কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই আপাত টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের, জনসচেতনতা কিছুদিন, তারপর সব ভুলে বিপন্ন মানবতা।

এই পুরান ঢাকার অলিগলিসহ প্রধান প্রধান সড়কে যুগ যুগ ধরেই গড়ে উঠেছে রাসায়নিক পণ্যের বৈধ-অবৈধ গুদাম। সেসব গুদাম নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর এক হিসেব, আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর অন্য হিসেব। বাস্তবিক অর্থে কারও সাথে কারো হিসেবের মিল নেই। হিসেবের দুস্তর ফারাকের মধ্যেই বৈধ-অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম নিয়ে বছরের পর বছর বাণিজ্য করেছে সুবিধাবাদীরা। এ অবস্থার মধ্যেই জনদাবীর প্রেক্ষিতে পুরান ঢাকার মানবতা ফেরাতে আজ বুধবার পহেলা মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম অপসারণের কাজ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ এই উচ্ছেদ অভিযানে একযোগে মাঠে নামবে ৫টি সংস্থা। এর আগে তালিকার কাজ শেষ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। তারাই রাসায়নিক ব্যবসা ও গুদাম বৈধ করার বৈধ কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলে সেসব গুদামজুড়ে। 

জানা গেছে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকা-ে ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এছাড়া দগ্ধ হয়েছে আরো শতাধিক মানুষ। এ ঘটনার পর নিমতলী থেকে কিছু গুদাম ও কারখানা সরানো হলেও পুরান ঢাকার অন্য এলাকা থেকে খুব বেশি সরেনি।

পুরান ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ ভয়ংকর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা। ফলে পুরান ঢাকার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে রাসায়নিক সংশ্লিষ্ট কারণে রাজধানীতে যতগুলো অগ্নিকা- ঘটেছে, তার সব কটিই ঘটেছে পুরান ঢাকায়। সর্বশেষ গত শনিবার ইসলামবাগে একটি প্লাস্টিকের গুদামে অগ্নিকা-ে তিনজন পুড়ে মারা গেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, নিমতলীর অগ্নিকা- স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘটনা। এই ঘটনার পরেও পুরান ঢাকায় অগ্নিকা-জনিত প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিন সেখানকার কোন না কোন রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে কর্মরত শ্রমিকরা দগ্ধ হয়ে বান ইউনিটে আসেন। এদের মধ্যে প্রতিদিন একাধিক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মৃধা বেনু বলেন, আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি আমাদের দীর্ঘদিনের। আমরা চাই দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এবারের উদ্যোগ সফল হোক।

পুরান ঢাকার নিমতলী, বংশাল, আগা সাদেক লেন, আলাউদ্দিন রোড, চকবাজার, লালবাগসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বহুতল ভবনের গাড়ি পার্কিং স্পেস বা নিচতলায় রাসায়নিক গুদাম রয়েছে। এসব ভবনের অন্যান্য ফ্লোরে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকছেন মধ্যবিত্তরা। এদের অনেকেই ছোট চাকরি অথবা ব্যবসা করেন। এছাড়া ছোট-বড় কোম্পানির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিছু ফ্লোর। একাধিক ভবনে উপরের বিভিন্ন ফ্লোরে প্লাস্টিকের কারখানা দেখা গেছে।

জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, ইসলামপুরসহ আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুুত করেছে। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই।

গত ১৯ জানুয়ারি থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২৪ জন সদস্য ৪টি ইউনিটে ভাগ হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অনুসন্ধান করে এ তালিকা তৈরি করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ডিডি-অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। মাত্র দুই ভাগ গোডাউনের অনুমোদন রয়েছে। সেসব গোডাউন রয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপারে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস চাইলেও এসব গোডাউন উচ্ছেদ করতে পারে না। উচ্ছেদ করতে হলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও বিস্ফোরক পরিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।

বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে পুরান ঢাকায় নতুন করে কোনো কেমিক্যাল গোডাউনের লাইন্সেস দেয়া হচ্ছে না। পুরনো লাইন্সেসও নবায়ন করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী কেরানীগঞ্জের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গোডাউন তৈরি করেছেন। বাকি যেসব ব্যবসায়ী এখনও পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় আছেন, তাদের সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রামকে জানান, মেয়র সাঈদ খোকনের ইচ্ছাতেই পুরান ঢাকা থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম উচ্ছেদের পরিকল্পনা। এজন্য মেয়র সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমন্বিত বৈঠক করে একটি তালিকা তৈরির নির্দেশ প্রদান করেন। সেমতে ফায়ার সার্ভিস কিছুদিন আগে ৪ শতাধিক দোকান ও গুদামের তালিকা তৈরি করে মেয়রের কাছে পাঠায়। কিন্তু সেখানে কিছু গড়পড়তা থাকায় পুনরায় তালিকা করার জন্য বলেন। সেই তালিকা ধরেই আজ থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হচ্ছে। এর আগে আজকের উচ্ছেদের দিনক্ষন ওই সমন্বিত সভায় নির্ধারন করার পর তা অভিযানের আগেই সরিয়ে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে মেয়র আহ্বানও জানিয়েছিলেন ।

ফায়ার সার্ভিসের তালিকা প্রসঙ্গে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল বলেন, গতকাল বিকেলেই তাদের যাচাইবাছাইকৃত চূড়ান্ত তালিকা পাঠায়। তালিকায় ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম ঘরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ দোকান ও গুদামের সংখ্যা হচ্ছে ২১ টি। সিটি কর্পোরেশন ও ফায়ার সার্ভিস থেকে যাদের কোন বৈধ অনুমোদন নেই। এ ছাড়া মোটামুটি ঝুঁকিপূর্নের তালিকায় রয়েছে ৭৪ টি। যাদের মধ্যে কিছু অংশের ট্রেড লাইসেন্স আছে, কিছু অংশের নেই। আবার কারও ফায়ার লাইসেন্স আছে, কারও আবার নেই। তালিকায় দেখা গেছে, কারও এই লাইসেন্স আছে তো ওই লাইসেন্স নেই। তাই এগুলোকে উচ্ছেদ করা হবে। তাদের অনেকেরই যে সকল রাইসেন্স আছে, সেগুলোরও মেয়াত উত্তীর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগেই ।তাই তাদেরকে অবৈধই বলা চলে বলে জানান কামরুল ইসলাম। তিনি ফায়ার সার্ভিসের পূর্বের দেয়া তালিকার সংশোধনের পর তা চার শতাধিক থেকে নেমে ২৭০টিতে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডেও অবৈধ রাসায়নিকের দোকান ও গুদাম আছে সেগুলোর তালিকা চূড়ান্ত করে পরবর্তীতে সেখানে অভিযান চালানো হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে পুরান ঢাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাবে ডিএসসিসিসহ সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ