ঢাকা, বুধবার 01 March 2017, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ০১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার মাস

সাদেকুর রহমান: “দুপুর ১২-১ টার দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রেডিওতে ভাষণ দেন। ভাষণের পরপরই দ্রুত পাল্টে যায় রাজধানীর পরিস্থিতি। জাতীয় সংসদের অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা যে ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাঞ্জাবী শাসকদের ষড়যন্ত্র’ তা পূর্ববাংলার জনগণ সহজেই বুঝতে পারলেন। পূর্ববাংলার সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় উঠল। ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংক্ষিপ্ত ভাষণে ইয়াহিয়ার কঠোর সমালোচনা করেন এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান গ্রহণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।”- মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের প্রথমদিনটির ঘটনাবলীর সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন তৎকালীন অন্যতম শীর্ষ আমলা এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ.টি. ইমাম হোসেন (তাওফীক ইমাম)। তার এ স্মৃতিচারণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘উত্তরণ’-এর ‘১ ডিসেম্বর ২০১৪’ সংখ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি : মার্চ ১৯৭১’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। 

সংগ্রামী চেতনায় ভাস্বর ঐতিহাসিক মার্চের সূচনা হলো জাতির এক সংকটাপন্ন সময়ে, যখন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র বিপন্ন। আজ বুধবার পহেলা মার্চ। বছর ঘুরে আবার এলো মহান স্বাধীনতার মাস, উত্তাল-আগুনঝরা মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শোষিত ও ক্ষুব্ধ জনগণ ন্যায়সঙ্গত ও প্রাপ্য অধিকার প্রশ্নে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। এ ভূখ- তখন ছিল আন্দোলনমুখর, জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। নিঃসংকোচে, বিরামহীন নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জনগণ বাংলাদেশ নামক একটি মানচিত্র আঁকতে সক্ষম হয়। দুর্বিনীত সাহসিকতার সাথে লড়াইয়ে পরাজিত করে পাক-হানাদার বাহিনীকে ভৌগোলিক সীমারেখার সাথে নিজের করে পায় একটি লাল-সবুজ পতাকা। প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার ছিচল্লিশ বছর পরও একাত্তরের ‘চেতনা’ বাস্তবায়ন, রূপায়ণের মুখর দাবিতে নানামুখী আন্দোলন চলছে। এসব আন্দোলনের প্রভাবেই কি-না মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী-সুধী তথা জাতি আজ স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত।

ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল পটভূমি রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর ১৯৭০’র সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের পাঁচটি প্রাদেশিক পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদ নির্বাচন একযোগে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার দাবিতে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নির্বাচন বর্জন করে। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। প্রদেশের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬৭টি। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ৮৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় প্রধান দল হিসেবে স্বীকৃতি পায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর ২০ ডিসেম্বর ভুট্টো জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের আসনে বসতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। 

রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর মহল এবং সেনাবাহিনীর সমর্থনে ভুট্টো ক্রমেই পরিস্থিতি জটিলতর করে তোলেন। শোষিত, নিষ্পেষিত ও অধিকারহারা পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের হাতে ক্ষমতা দেয়া হবে না এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় মওলানা ভাসানীসহ প্রদেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জোরালো সমর্থন জানান। আওয়ামী লীগের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। এ সময় ভুট্টো পরিষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পরিষদকে ‘কসাইখানা’ বানানো হবে বলে হুমকি দেন। সেই সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান প্রণয়নকালে পিপিপিসহ পশ্চিম পাকিস্তানী দলগুলোর বক্তব্য ও পরামর্শ বিবেচনা করার আশ্বাস দেন। 

কেবল পূর্ববঙ্গে (তৎকালীন সাংবিধানিক পূর্ব পাকিস্তান) নয়, বহির্বিশ্বেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন প্রবাসীরা। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ব্যাপার চূড়ান্ত হলে লন্ডনে বসবাসকারী বাঙ্গালী ছাত্র জনতা সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলে। পহেলা মার্চ থেকে ৭ মার্চ তারা একটানা আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল পহেলা মার্চ থেকে লন্ডনস্থ পাকিস্তানী দূতাবাসের সামনে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শন।

এদিকে পাকিস্তানের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে একাত্তরের পহেলা মার্চ এক বেতার ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। স্থগিতাদেশ দাবিটি ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। সেই সময় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন সফল করতে ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া তৈরিতে নেতৃবৃন্দ ব্যস্ত ছিলেন। সেই মুহূর্তে অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে মেনে নেয়া অসম্ভব ছিল। বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ওই দিন দুপুরে খবর শোনার সঙ্গেসঙ্গে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে করতে নেমে আসে। বাংলার জনতা আর বঞ্চনা সহ্য করতে পারছে না। এ সময় হোটেল পূর্বাণীতে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ পূর্ববঙ্গব্যাপী হরতাল আহ্বান করেন। তার এই আহ্বানের মধ্য দিয়েই একাত্তরের উত্তাল মার্চের প্রথম দিবসে স্বাধীনতা সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এদিনই প্রথমবারের মতো মুক্তিকামী জনতা স্লোগান তুলে- ‘আর নয় ৬ দফা এবার চাই স্বাধীনতা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ইত্যাদি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রকাশিত ‘স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থে’ বলা হয়, “১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে জেনারেল ইয়াহিয়া খান আমেরিকা যাওয়ার পথে ক্ল্যারিজেস হোটেলে অবস্থান করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লন্ডন আওয়ামী লীগ হোটেলের সামনে এক বিক্ষোভের আয়োজন করে। ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেশ্যাম প্লেসে অবস্থিত পাকিস্তানী ছাত্রাবাসে বাঙ্গালী ছাত্র ও যুবকরা এক সভায় নির্বাচনের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য মিলিত হয়। প্রস্তাবিত গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দেবে না বলে সভায় অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা করেন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ নবনির্বাচিত পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা প্রস্তাবিত অধিবেশন ‘বয়কট’ করবে বলে ঘোষণা করে।”

অন্যদিকে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী তার ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পরপরই ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সব শহরেই উত্তাল জনতা ক্রোধে ফেটে পড়লো। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই শহরের সব দোকান-পাট বন্ধ হয়ে গেলো। সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক, কলকারখানার শ্রমিক এবং আদালতের আইনজীবীগণ ও সর্বস্তরের জনসাধারণ রাস্তায় নেমে আসেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মতো গোটা শহর স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়।”

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়- “১ মার্চ ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর পদ থেকে ভাইস এডমিরাল আহসানকে সরিয়ে সামরিক প্রশাসন লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুবকে গবর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন। ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণে প্রতিক্রিয়া হয় দ্রুত। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। ঐদিন পূর্বাণী হোটেলে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু মঙ্গলবার ঢাকা শহরে হরতাল, বুধবার সারাদেশে হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার কথা ঘোষণা করেন।”

এদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হলেও তার অধিকাংশই যতো না বস্তুনিষ্ঠ তার চেয়ে অনেক বেশি আবেগাক্রান্ত এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড লুডেন। তিনি নির্মোহ দৃষ্টিতে ইতিহাস সম্মত বিশ্লেষণে ‘ফরগটেন হিরোস (বিস্মৃত বীরেরা)’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেন, যাতে যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং প্রেক্ষাপট তৈরিকে অনিবার্য করে তুলেছিল, সেসব বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর এটি বিশেষ নিবন্ধ হিসেবে ছাপা হয়েছিল ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনের ২০০৩ সালে জুলাই-আগস্ট সংখ্যায়।

উক্ত নিবন্ধে বলা হয়, “১৯৪৭ সালের পর, তখনকার পাকিস্তানে একেবারেই নতুন একটি রাষ্ট্রীয় সীমারেখা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পুরনো আকাক্সক্ষাটি নবরূপে আবিভূর্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তান নতুন একটি জাতীয় সত্তা লাভ করে। ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকেই ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সর্বপ্রথম একটি নতুন জাতির আত্মপ্রকাশের গণআকাক্সক্ষাটি ভাষা পায়। ১৯৬০’র দশকে এসে এর মধ্যকার রাজনৈতিক অভিলাষটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে সমসাময়িক রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নামক যে ধারণাটি জন্মলাভ করে তা কিন্তু ওই সময় থেকেই সুস্পষ্ট দুটি রূপরেখা অনুসরণ করে এগুচ্ছিল।

একটি রূপরেখা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্ত্বশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। এটি অনেকটা ১৯৪১-পূর্ববর্তী মুসলিম লীগের ধারণার মতোই। স্বাধীনতার এই সাংবিধানিক রূপরেখাটি জন্মলাভ করেছিল নির্বাচনী রাজনীতির আবহে এবং তাতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল। ধারণা করা হয়েছিল এই রূপরেখাটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে।

অন্য রূপরেখাটি জন্ম নিয়েছিল সাংবিধানিক রাজনীতির বাইরে, যার একটি ঋজু প্রকাশ লক্ষ্য করা গিয়েছিল ছাত্রদের মধ্যে। এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়, ১৯০৫ সালে বৃটিশ ভারতের কাছ থেকে পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষাটির সাথে। এছাড়া ১৯৪১ সালের পর মুসলিম লীগ স্বাধীনতার ডাকে দ্বি-জাতিতত্ত্বের যে রূপরেখা তুলে ধরেছিল তার সাথেও এটির মিল লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীনতার প্রশ্নে জনপ্রিয় এই রূপরেখাটিই নতুন বাঙালি জাতিসত্তার জন্য একটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার জন্ম দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে সেই বাস্তবতাই দৃশ্যমান হলো।

স্বাধীনতার প্রশ্নে এই দুই রাজনৈতিক রূপরেখা- একটি যুক্ত রাষ্ট্র এবং সার্বভৌমত্ব- দু’টিরই উদ্ভব আলাদা আলাদাভাবে এবং দু’টিরই আবেদন তৈরি হতে থাকে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তদুপরি উভয়পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হতে থাকে এবং বৃটিশ-ভারত সময়কার মতোই পাকিস্তান আমলেও নিজেদের মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষে তারা অভিন্নতা রক্ষা করে চলছিল। ১৯৫২ সালে ছাত্ররা ভাষা আন্দোলন করে এবং এর মধ্য দিয়ে সাংবিধানিকতার বাইরে বাঙালি হিসেবে রাজনীতি করার জনপ্রিয় একটি ভিত্তি তৈরি হয়।”

অধ্যাপক ডেভিড লুডেনের বিশ্লেষণ মতে, “আজকের দিনে পেছন ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের প্রথমদিককার ঘটনাগুলোই বস্তুত একটি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান টিকে থাকার সব ধরনের বাস্তব সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি সে সময় এতটা নিশ্চিত বলে মনে হয়নি। এমনকি শেখ মুজিবের কাছেও তা সেভাবে ধরা পড়েনি। তিনি তখনো তার ফেডারেশন পরিকল্পনায় স্থির ছিলেন, যেটি সাংবিধানিক নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত নির্বাচনী বিজয় ও বিপুল জনসমর্থনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে। সব দিক বিবেচনায় তখনো তার আশাবাদী থাকার কথা। কিন্তু দ্রুতই হতাশার নতুন কারণ হাজির হতে শুরু করলো।.....অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাপক গণআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগ পরিষদীয় দলের সভা চলাকাল বাইরে সমবেত হাজার হাজার মানুষ অতিদ্রুত সার্বভৌম জাতীয় স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য শেখ মুজিবের প্রতি দাবি জানাতে থাকে। বিক্ষুব্ধ জনতা পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে ফেলে। ছাত্র নেতারা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগাম পরিষদ নামে একটি উচ্চ পর্যায়ের সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। এর নেতা নূর-ই আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনে যৌথ নেতৃত্ব প্রদানের ঘোষণা দেন। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণাটি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেই প্রথম রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ