ঢাকা, বৃহস্পতিবার 02 March 2017, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৩, ০২ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পিএসএল-এর ফাইনাল নিয়ে হৈচৈ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ২০০৯ সালে লাহোরে সফররত শ্রীলঙ্কা দলের বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এক রকম বন্ধ। তারপরও নানাভাবে দেশটিতে ক্রিকেট আয়োজনে কমতি নেই পিসিবির। আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অংশ হিসেবে দেশটিতে খেলেছে বেশ কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলও খেলেছ। এছাড়া জিম্বাবুয়েও সিরিজ খেলেছে দেশটিতে। এছাড়া দেশটির ঘরোয়া ম্যাচে বেশ কয়েকজন বিদেশী খেলোয়াড়ও অংশ নিয়েছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড চেষ্টা করছে তাদের দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের। এ নিয়ে তাদের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে দেশটির ক্রিকেট কর্তারা এবার পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) ফাইনাল দেশেই আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। জানুয়ারিতে রয়টার্সের কাছে ফাইনালের ভেন্যু নিশ্চিত করেন পিসিবি’র নির্বাহী কমিটির প্রধান নাজাম শেঠি। “আমরা ৭ মার্চ লাহোরে ফাইনাল আয়োজন করবো। সব জায়গা থেকে সবুজ সংকতে পেয়েছি, আমরা পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি।” তবে পিসিএল এর ফাইনালে নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে খেলা সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানে যাবেনা বলে জানিয়েছে। পিএসএলের প্রথম আসর সংযুক্ত আরব আমিরাতে হয়। এবারও ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় টুর্নামেন্ট। ফাইনাল ছাড়া বাকি সব ম্যাচ হবে সেখানেই। পিএসএলের দ্বিতীয় আসরে পেশওয়ার জালমি দলে আছেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। এছাড়া খেলছেন মাহমুদদুল্লাহ রিয়াদও। লাহোরে পিএসএল ফাইনাল আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানা আলোচনা-সমালোচনা। যদিও সেখানে বেশ কিছুদিন এই টুর্নামেন্টের শিরোপা নির্ধারণী খেলাটির আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু প্রাদেশিক সরকার সবুজ সঙ্কেত দেওয়াতে সেটি আর থাকছে না। ফলে টুর্নামেন্টের ফাইনাল সেখানেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর এমন সিদ্ধান্ত আসার পরেই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এর সমালোচনা করেছেন দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান। পাকিস্তানে টুর্নামেন্ট ফাইনাল আয়োজনকে কা-জ্ঞানহীন বলেই মন্তব্য করেছেন কিংবদন্তি এই ক্রিকেটার, ‘আমার মনে হয় এই মুহূর্তে যেই ঝুঁকি রয়েছে সেটা উঁচু মাত্রার। বর্তমানে যেই পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে এরকম ঝুঁকি নেওয়া সঠিক নয়।’

বেশ কয়েক দিন ধরেই অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল যে পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার এ নিয়ে হয়তো সবুজ সঙ্কেত দেবে না। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই সেখানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছিল। লাহোরেই সর্বশেষ এমন দু’টি ঘটনা ঘটেছে। এই অবস্থার কথা উল্লেখ করে ইমরান খান বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতিতে কেমন শান্তির বার্তা পৌঁছাবে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন লাহোরে ফাইনাল না হলে পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য সেটা তেমন ভিন্ন কিছু বয়ে আনবে না। বিশেষ করে তারকা বিদেশি ক্রিকেটারদের ছাড়া এখানে এই আয়োজন পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য সুখকর কিছু বয়ে আনবে না বলেই মনে করছেন তিনি। ইমরান খান আরও যোগ করেছেন, ‘যদি আশঙ্কাজনক কিছু হয়েই যায় তাহলে পাকিস্তানের ক্রিকেট আরও দশ বছর পিছিয়ে যাবে।’

অনেকেই বলছেন, পাকিস্তানে ফাইনাল বিদেশি অনেক তারকা ক্রিকেটার যাবেন না লাহোরে। তারপর অনেক আলোচনার পর চূড়ান্ত হয়েছে পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) ফাইনাল হবে লাহোরেই। কিন্তু নিরাপত্তার সমস্যা দেখিয়ে ফাইনাল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে প্রতিযোগিতাটির টেলিভিশন সম্প্রচারের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান সানসেট অ্যান্ড ভাইন। যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বেশ কয়েকজন ধারাভাষ্যকারও জানিয়ে দিয়েছেন, তারা লাহোরে যাবেন না। ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতাগুলোর ধারাভাষ্যকক্ষে নিয়মিত ও জনপ্রিয় মুখ নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার ড্যানি মরিসন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত পিএসএল’র লিগ পর্যায়ের ম্যাচগুলোতে জম্পেশ ধারাভাষ্য দিলেও লাহোরে যাওয়ার কোনো আগ্রহই নেই তার। মরিসন ছাড়াও অ্যালান উইলকিনস, মেল জোনসকারওরই ইচ্ছা নেই লাহোরে উড়ে যাওয়ার। সাবেক ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলার ইয়ান বিশপ লাহোরে যাবেন না, সেটি নিশ্চিত ছিল আগেই। সানসেট অ্যান্ড ভাইনের সঙ্গে তাঁর চুক্তিই ছিল লিগ পর্যায়ের ম্যাচ পর্যন্ত।

সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের সহায়ক সংস্থাও লাহোরে যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। যেটি মূলত হক আই প্রযুক্তি ও স্পাইডার ক্যামেরা সরবরাহ করে থাকে। ফাইনালে ড্রোন ক্যামেরাও থাকছে না। সানসেট অ্যান্ড ভাইনের বদলে যে সংস্থাটির সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) কথা বলছে তারা এসব ছাড়াই লাহোরের ফাইনাল সম্প্রচার করবে। লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে পিএসএলের ফাইনাল অনুষ্ঠানের ব্যাপারে গতকালই সবুজ-সংকেত দিয়েছে পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার। তবে নিরাপত্তা-ইস্যুতে সিদ্ধান্তটিকে খুব ভালো চোখে দেখছেন না পাকিস্তানের অনেক সাবেক ক্রিকেটারই। ইমরান খান, আমির সোহেল ও শোয়েব মোহাম্মদরা বিষয়টিকে পিসিবি ও পাঞ্জাব সরকারের ‘পাগলামি’ বলছেন। 

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরের জনবহুল এলাকায় এক বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনায় পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা নতুন করে সামনে চলে আসে। পিএসএলে প্লে-অফে খেলা চার দলের বেশির ভাগ বিদেশি খেলোয়াড়ই অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, দল ফাইনালে উঠলেও লাহোরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা          তাঁদের নেই। সূত্র: ক্রিকইনফো।

পাকিস্তানের হোমগ্রাউন্ড হয়ে গেছে আরব আমিরাত। এমনকি ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি২০ আসর পাকিস্তান সুপার লীগও (পিএসএল) সেই মরুর দেশেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার বিশ্বের অন্যতম অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান খেলেছেন পেশোয়ার জালমির হয়ে। এবার এ আসরের ফাইনাল হবে লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে। অবশ্য দলের হয়ে ফাইনাল খেলতে পারবেন না সাকিব। কারণ জাতীয় দলের হয়ে এখন তিনি শ্রীলঙ্কায়। কিন্তু ভবিষ্যতে পাকিস্তানের মাটিতে খেলার আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশী এ অলরাউন্ডার। তিনি প্রত্যাশা জানিয়েছেন অচিরেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং সব দেশের ক্রিকেটাররা সেখানে খেলতে যাবেন। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে পাকিস্তানের মাটিতে বড় কোন জাতীয় ক্রিকেট দল সফর করেনি। ২০০৯ সালে পাকিস্তান সফররত শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর লাহোরে বন্দুকধারীদের হামলায় অন্যতম ব্যাটসম্যান থিলন সামারাবীরাসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তারপর থেকে আর কোন টেস্ট খেলুড়ে দলই শুধু নয়, কোন বিদেশী ক্রিকেট দলকেই নিজেদের দেশে নিতে পারেনি পাকিস্তান। অবশ্য, অনেক চেষ্টার পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি জিম্বাবুইয়ে ক্রিকেট দলকে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলার জন্য দেশে নিতে পেরেছিল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। এরপরও কোন বড় টেস্ট খেলুড়ে দল পাক সফরে যেতে রাজি হয়নি। এ কারণে পিএসএল টি২০ অনুষ্ঠিত হচ্ছে আরব আমিরাতে। এ বিষয়ে সাকিব বলেন, ‘আশা করি আবার পাকিস্তানের পরিবেশ ভাল হবে, আবারও পাকিস্তানে খেলতে চাই।’ সর্বশেষ ২০০৮ সালে পাকিস্তানে খেলেছিলেন সাকিব। পিএসএল’র প্রথম আসরের মতো, চলতি দ্বিতীয় আসরও হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

গত আসরেও পিএসএল খেলেছিলেন সাকিব। সেবার পুরো আসর আরব আমিরাতে হলেও এবার পিসিবি জানিয়ে দিয়েছে, যা কিছুই ঘটুক, আগামী ৫ই মার্চ লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে পিএসএলের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য, সাকিবের দল পেশোয়ার জালমি ফাইনালে উঠলেও দলের সঙ্গে থাকবেন না সাকিব। কারণ এরই মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছে। ৭ মার্চ শ্রীলঙ্কার সঙ্গে টেস্ট খেলবে দল। তাই পিএসএল থেকে ফিরে ইতোমধ্যেই দলের সঙ্গে ঢাকা ছেড়েছেন সাকিব। পাকিস্তানে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করে সাকিব পাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সর্বশেষ ২০০৮ সালে পাকিস্তানের মাটিতে খেলেছি। সেটা আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল। ওদের মাঠ, দর্শক, পরিবেশ, সমর্থক আর আবহাওয়া সবকিছুই দারুণ। যদি সবকিছু ঠিক হয়ে যায়, আমি সত্যিই আবার পাকিস্তানের মাটিতে খেলতে যেতে চাই।’ যদিও সেবার ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু একটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন সাকিব এবং ম্যাচসেরার পুরস্কারও জেতেন একটি ম্যাচে। বর্তমানে ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা ২৯ বছর বয়সী এ অলরাউন্ডার মনে করেন পাকিস্তানের মাটিতেই পিএসএল হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘যদি পাকিস্তানে পিএসএল হতো, তাহলে আমিরাতের থেকেও বেশি জমজমাট হতো। বর্তমানে পাকিস্তানের অবস্থা কিছুটা নাজুক কিন্তু আমি আশা করি এমনটা বেশিদিন থাকবে না। পাকিস্তানের পরিবেশ ভাল হবে আর সেখানে আরও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং সিরিজ আয়োজিত হবে। পিএসএলই পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরাতে সাহায্য করবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ