ঢাকা, বৃহস্পতিবার 02 March 2017, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৩, ০২ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ডায়াবেটিস, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর রোগ

ডায়াবেটিসের সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর রোগের একটি জোরালো সম্পর্ক বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন।

* হৃদযন্ত্র ও রক্তনালীর রোগ হলো ডায়াবিটসের একটি প্রধান জটিলতা, শুধু তাই নয়, ডায়াবেটিস যাদের আছে এদের আগাম মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হলো হৃদরোগ। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ডায়াবেটিক রোগীর ৬৫% শতাংশ মারা যান হৃদরোগ ও স্ট্রোকে।

* পূর্ণ বয়স্ক লোক যাদের ডায়াবেটিস আছে এদের হৃদরোগ হবার সম্ভাবনা বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি, যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদের চেয়ে দুই থেকে চারগুণ বেশি।

* পূর্ণ বয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী যাদের রক্তে গ্লুকোজ উঁচুমানে তাদের হার্ট এ্যাটাক, এনজাইনা, স্ট্রোক ও করোনারি ধমনী রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

* টাইপ-২ ডায়াবেটিস যাদের তাদের মধ্যেও রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির মান ও স্থূলতার সমস্যা বেশি-এসব উপাদান হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী রোগেরও কারণ।

* ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ধূমপান, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় দ্বিগুণ। ডায়াবেটিস থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া এবং এতে মৃত্যুবরণ করার সমস্যা হ্রাস করতে এগিয়ে এসেছেন আমেরিকার ন্যাশনাল ডায়াবেটিস এডুকেশন প্রোগাম এবং এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অনেকগুলো অংশীদার সংস্থা।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের ডায়াবেটিস এডুকেশন প্রোগ্রামও এই বড় সমস্যাকে এর কার্যক্রমের

গুরুত্বপূর্ণ প্রাধিকার হিসেবে নিয়েছেন। ন্যাশনাল ডায়াবেটিস এডুকেশন প্রোগ্রামের (এন.ডি.ই.পি.) যে এডুকেশন প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছেন তা হলো “সারা জীবন ডায়াবেটিস থাকুক নিয়ন্ত্রণে।” এই শিক্ষাদান অভিযান স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের এবং তাদের রোগীদেরকে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের নানা রকম ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই কর্মসূচী ডায়াবেটিক রোগীদেরকে ডায়াবেটিস জনিত কিডনি, চোখ ও স্নায়ুরোগের ঝুঁকি হ্রাস করার পদ্ধতিও শিক্ষাদান করছে। এই অভিযানের লক্ষ্য হলো ডায়াবেটিসের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ এবং সেজন্য (A1C)  (গড় রক্ত গ্লুকোজ পরিমাপ), রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের উত্তম ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিয়েছেন। এই এবিসি চিকিৎসা লক্ষ্যটি প্রয়োগ করা হবে ডায়াবেটিক সব রোগীদের জন্য।

এবিসি চিকিৎসা লক্ষ্যটি হলো-

A-A1C (রক্তগ্লুকোজ) ৭% শতাংশ কম। B-Blood Pressure ১৩০/৮০ মিমি পারদ চাপ মানের কম। C- কোলেস্টেরল- এলডিএল ১০০ মিলিগ্রাম/ডিএলএর কম।

যাদের ডায়াবেটিস তারা এবিসি নিয়ন্ত্রণ করলে কি কি সুফল পান

এ নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ডায়াবেটিস সংক্রান্ত উঁচু মানের কয়েকটি সংস্থা এবং তাদের অভিমত তুলো ধরা হলো:-

* গ্লুকোজ মানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ করলে যে কোনও হৃদযন্ত্র রক্তনালী রোগের ঘটনার ঝুঁকি কমে ৪২ শতাংশ এবং হার্ট এ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকি এসব রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে ৫৭ শতাংশ।

* সাধারণভাবে A1C রক্ত পরীক্ষায় প্রতি শতাংশ হ্রাস পেলে (যেমন ৮.০ শতাংশ থেকে কমে ৭.০ শতাংশ হলে) ডায়াবেটিস, কিডনি, চোখ ও স্নায়ুরোগের ঝুঁকি কমে ৪০ শতাংশ।

* রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলে ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে হূদযন্ত্র ও রক্তনালী রোগের ঝুঁকি কমে ৩৩-৫০ শতাংশ, এবং ডায়াবেটিক কিডনি, চোখ স্নায়ুরোগের ঝুঁকি আনুমানিক কমে ৩৩ শতাংশ। সাধারণভাবে সিসেটালিক রক্তচাপ ১০ মিলিমিটার কমলে, ডায়াবেটিস জনিত যে কোনও জটিলতার ঝুঁকি কমে ১২ শতাংশ।

* কোলেস্টেরল ও রক্তের অন্যান্য লিপিডের (এইচডিএল, এলডিএল ও ট্রাই গ্লিসারাইড মান) উন্নত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী সম্পর্কিত জটিলতা কমে ২০-৫০ শতাংশ।

ডায়াবেটিস ও হূদযন্ত্র ও রক্তনালীর রোগের মধ্যে সম্পর্ক হূদযন্ত্র ও রক্তনালীর রোগের  ঝুঁকি হ্রাসের জন্য ডায়াবেটিক রোগীরা কি কি করতে পারেন। যেমন-ডায়াবেটিক রোগী স্বাস্থ্য পরিচর্যা টিমের সঙ্গে একত্রে মিলে এবিসি লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। এমন কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করলে, স্বাস্থ্যকর  ওজন অর্জন করা যাবে এবং এটি বজায় রাখা যাবে। শরীর ভারি হলে বা স্থূল হলে এটি হলো হার্ট এ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি। অন্তত: ৩০-৬০ মিনিট শরীর চর্চা করতে হবে। দ্রুত হাটা বা সে ধরনের ব্যায়াম, সপ্তাহে প্রায় দিন করলে, ওজন হ্রাস করা সম্ভব হবে, রক্তচাপও কমানো যাবে। এমন খাবার খাবেন যা হবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্যান্স ফ্যাট, কোলেস্টেরল বা নুন ও বাড়তি চিনি থাকবে কম, এমন খাবার। বেছে নেবেন কচি মাংস, পোলট্রি, মাছ, বাদাম, চর্বিহীন বা ননীকম দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য। বেশি আঁশযুক্ত খাবার খাবেন। যেমন- গোটাশস্য, ফল, শাক সবজি, শুকনো মটরশুঁটি ও বীনস্। ধূমপান ছাড়তে হবে। ধূমপান হলো হার্ট এ্যাটাক ও স্ট্রোকের বড় ঝুঁকি। গ্রহণ করতে হবে ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শও।

-অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী, পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস, বারডেম, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ