ঢাকা, শুক্রবার 03 March 2017, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানুষ না জিন

আহমদ বাসির : আদিবের মনে যে ভয়টা এতক্ষণ দুরুদুরু করছিল, সেটা এখন ধুকপুক ধুকপুক করতে শুরু করেছে। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে সে। আসতে আসতে যে ভয়টা করছিল ঠিক তাই হল। ঠিক জায়গাটাতে এসে সে আর এগুতে পারছে না। কোন দিকেই কোন মানবসন্তানের সাড়া শব্দ নেই। আশে-পাশে কোন বাড়ি-ঘরও নেই। পিছে ফেলে আসা অমরপাড়া মসজিদটাও বড় একটা বাগানের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আদিবের সামনেই সেই অর্ধনির্মিত, জঙ্গলাকীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভূতুড়ে ভবনটি। ভয়ের পাশাপাশি মনের কোনো আশা ও সাহসের যেটুকু সঞ্চয় ছিল, ভবনটি চোখে পড়ায় সেটুকুও উঠে যেতে শুরু করেছে। আদিব আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কয়েক কদম পিছিয়ে আসে। থেমে যেতে হয় তাকে। ভয় যেন পেছনের বাগান থেকেও তাড়া করছে তাকে। গা’টা কাঁটা দিয়ে ওঠে। চোখ বন্ধ করে ফেলে আদিব।

তিন রাস্তার মোড়ের ওপাশে দাঁড়ানো ভূতুড়ে ভবনটির সামনে দিয়ে যেতে হবে আদিবকে। তারপরই ঘুরতে হবে ডানে। তখনও ভূতুড়ে ভবনটির একটি দেয়াল ওর ডান পাশেই থাকবে। বাম পাশে থাকবে আরেকটি ভবন। এটি একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটার মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। এখানে সেবা নেয়ার জন্য তেমন কেউ আসে না। তবে ডায়েরিয়া-কলেরা, জ্বর-মাথাব্যথা ইত্যাদি হলে কেউ কেউ এখান থেকে বিনামূল্যে ট্যাবলেট, মলম নিয়ে যায়। এই অন্ধকার ঘন সন্ধ্যায় এটিও একটি ভূতুড়ে ভবনে পরিণত হয়েছে। ভবন দু’টি, অতিক্রম করে কয়েক কদম সামনে বাড়ালেই রাস্তার ডানপাশে হিন্দুদের শ্মশানঘাট। পাশেই একটা বিশাল দীঘি, দীঘির ওপারে ঠাকুরবাড়ি। ভূতুড়ে ভবন দু’টির চেয়েও আদিবের কাছে বেশি ভয়ঙ্কর ঠাকুরদের এই শ্মশানঘাট।

এমন একটা বিশ্রী-ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি হবেÑ ভাবতে পারেনি আদিব। এতটা নির্জনতা সে মোটেও আশা করেনি। আশা না করলেও তার মনে আশঙ্কটা ঠিকই ছিল। ওই আশঙ্কাকে সে মোটেও পাত্তা দেয়নি। না দেয়ার কারণও গুরুতর। আশঙ্কাটাকে পাত্তা দিতে গেলেই আজ ওর মাগরিবের নামায কাযা হয়ে যেত। অবস্থা যত বিশ্রী আর ভয়ঙ্করই হোক না কেন, তার নামায যে কাযা হয়নি এবং জামাতের সঙ্গে আদায় হয়েছে এ জন্য সে পরিতৃপ্ত। 

রাস্তায় এমন একটা ভয়ের ব্যাপার থাকায় বন্ধুরা তাকে একা ফেলে এসেছে। ওরা বলছিল, বাড়িতে গিয়ে নামায আদায় করবে। আদিবের হিসেবে ব্যাপারটা সঠিক মনে হয়নি। বাড়ি যেতে কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক লেগে যাবে। অথচ আজান হয়ে গেছে। ওরা যে মসজিদটার সামনে দাঁড়িয়েছিল ওই মসজিদে তখন আকামাত চরছিল। এ অবস্থায় সামনে এগুনো মানেই নামায কাযা করা। আদিবের বন্ধু মহসিন বলল, ‘না ভাই, আমরা বাড়িতে যাইয়া নামাজ পড়ব, তোর সাহস বেশি, তুই থাক।’ খোকনও মহসিনের সাথে একমত হয়ে সামনে এগুতে থাকল। আদিব কিছুই না বলে দ্রুতগতিতে হাতের বইগুলো পাকা ঘাটে রেখে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল অযু করতে। নামায শেষে দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করেছিল আদিব। তার মনে হয়েছে এই গতিতে হাঁটলে সে মহসিন আর খোকনকে রাস্তাতেই পেয়ে যাবে। না, কাউকেই পায়নি সে। এমনকি এই একঘণ্টার পথে একজন মানুষেরও সাক্ষাৎ হয়নি তার সঙ্গে।

আদিব, মহসিন আর খোকন তিন বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ে। প্রায় দুই মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে ওদের স্কুলে যেতে হয়। একই গ্রামের দুই পাড়ায় ওদের বাড়ি। আদিব আর খোকনদের একই বাড়ি। ওদের বাড়ি ছাড়িয়ে আরও কুড়ি মিনিটের পথ মহসিনদের বাড়ি। প্রতিদিনই মহসিন আদিবদের বাড়িতে আসে এবং ওরা তিনজন এ বাড়ি থেকেই একই সঙ্গে স্কুলের উদ্দেশে রওয়ানা করে। আবার ফিরেও এক সঙ্গে। কুড়ি মিনিটের পথ মহসিনকে একাই যেতে হয়।

ওরা সাধারণত স্কুল মসজিদে আসরের নামায পড়ে রওয়ানা করে। এটাই প্রাত্যহিক নিয়ম। মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম হলেও সবসময় মাগরিবের আগেই ওরা বাড়ি ফিরে আসে। আজকের ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করেই স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে একটা ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়ে গেল। নবম-দশম শ্রেণির সঙ্গে ষষ্ঠ-সপ্তম-অষ্টম শ্রেণির ছাত্রদের প্রতিযোগিতা। টিম তৈরি হয়ে গেল। স্কুল ছুটি হলেই মাঠে নেমে যাবে সবাই। ম্যানেজার বানানো হলো আদিবকে। দুইপক্ষই একশ দশ টাকা করে জমা রাখল ওর কাছে। যারা জিতবে টাকাটা তারা নিয়ে যাবে। খেলা শুরু হয়ে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীরাও অনেকে মাঠে খেলা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছে। আদিব আসরের নামাজ আদায় করে খেলা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে। একপর্যায়ে এক শূন্য গোলে আদিবদের অষ্টম শ্রেণির নেতৃত্বাধীন টিমটি জিতে যায়। আদিব টিম লিডার বাদলের হাতে টাকাটা গছিয়ে দিয়েই সঙ্গীদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা করে। স্কুলের পাশের বাজারটি ডিঙিয়ে কিছুদূর এগুতেই শুরু হয় মাগরিবের আজান। হাঁটার গতি দ্রুত করে ওরা। তারপর পৌঁছায় ওই মসজিদটির কাছে। আদিব থেমে যায়Ñ আমরা নামাজ পড়ে যাই। বাড়িতে যাইতে যাইতে নামাযের ওয়াক্ত থাকবে না।’ ভয় পাওয়া গলায় মহসিন বলে ওঠেÑ ‘না, না, আমি রাইতের বেলা শ্মশানখলা দিয়া যাইতে পারব না। আমরা বাড়িতে যাইয়াই নামায পড়তে পারব।’ খোকনও সুর মিলায় মহসিনের সঙ্গে ‘চল আদিব, আমরা বাড়িতে যাইয়া নামাজ পড়ব। এইখানে নামাজ পড়লে যাইতে যাইতে আন্ধার নামব।’

‘অসুবিধা কী? আমরা তিনজন আছি না। মহসিনরে আমরা দুইজন আগাইয়া দিমু।’ আদিবের এ কথায় খোকন কিছুটা রাজি হয়। কিন্তু মহসিন যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে এগুতে থাকে তখন খোকনও ওর পথ ধরে।

আদিব চোখ বন্ধ করে ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করছিল। সঙ্গে মনটাকেও পিছিয়ে নিয়েছিল। ভাবনাটাকে সে ভয়ের ¯্রােতটার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। বেশ কয়েকটা কালাবাদুড়ের হঠাৎ ওড়াওড়িতে সেটা আর সম্ভব হল না। ওরা রাস্তার পাশের কলাগাছগুলো থেকেই পাখা ঝাঁপটিয়ে ওড়াওড়ি শুরু করল। চমকে উঠে চোখ খুলে ফেলল আদিব। তার রোমকূপগুলো আবার কাঁটা দিয়ে উঠল। সামনেই সেই ভূতুড়ে ভবনটি এবং বাদুড়গুলোর পাখা ঝাপটানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার নিস্তব্ধতা। আদিবের মন আপনাতেই আল্লাহ,আল্লাহ, আল্লাহ... জপনা শুরু করে দিয়েছে। এই জপনাই মনে হয় বেশ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আদিবকে অনেকটা স্বাভাবিক করে তোলে। অন্ধকার কিছুটা ফিকে মনে হয় ওর কাছে। আকাশে চাঁদ নেই। তারা আর জোনাকিদের মিটিমিটি আলোর কারণে হয়তো অন্ধকার কিছুটা ফিকে লাগছে। আদিব সামনের দিকে ডানে এবং বামে দৃষ্টিপাত করে। দু’দিকে থেকে রাস্তা এসে মিলেছে ওখানে। ওই রাস্তাগুলো দিয়ে কোন লোকজন আসে কিনা তাই দেখার চেষ্টা করে সে। কোন পথ দিয়েই কাউকে আসতে দেখা যায় না। ওর পিছন দিকে তাকায়। না সে দিক থেকেও কেউ আসে না। শ্মশানঘাটের দিকে যে সড়কটি চলে গেছে সেদিকেও নজর রাখার চেষ্টা করে আদিব। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো হঠাৎই ওর মনে পড়ে আজ অমাবশ্যা। মহসিন আর খোকন মাগরিবের আজান শোনার আগেই সে কথা জানিয়েছিল আদিবকে। অমাবশ্যার ব্যাপারটি এতক্ষণ একবারও আদিবের মনে আসেনি। এখন সে কথাটি মনে পড়ায় আরেকবার গায়ে কাঁটা দিল আদিবের। আবারও মনটা আপনাতেই আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ জঁপতে শুরু করল। আদিব চোখ-কান খোলা রেখে বেশখানিকটা শক্ত হয়ে দাঁড়াল এবার। মনের ভিতরের ধুকপুকানিটাকে আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ জিকিরের তালে তালে তলিয়ে দিতে চাইছে সে।

সামনের মোড় থেকে যে রাস্তাটি সোজা বাম দিকে চলে গেছে, সেদিকে শ’দুয়েক গজ এগুলেই একটি কবরস্থান। সেই কবরস্থানের একটি কবরে শুয়ে আছেন মৌলভী সাহেব। একবাক্যে লোকের কাছে তিনি এ নামেই পরিচিত। মৌলভী সাহেব একজন খাঁটি আল্লাহর বান্দা হিসেবে জীবন যাপন করেছেন। মৃত্যুর অনেক দিন পরও লোকেরা সেই সাক্ষ্যই দেয়। তার কবর থেকে নাকি এখনও কোন কোন রাতে কোরআনের তেলাওয়াত শোনা যায়। লোকেরা বলাবলি করে। অনেকে নিজেরা শুনেছে বলে সাক্ষ্য দেয়। মুরব্বীদের মুখে মৌলভী সাহেবের অনেক গল্প শোনা যায়। এসব গল্পের মধ্যে একটি গল্প আদিবকে খুব নাড়া দেয়। গল্প নয় আসলে ঘটনা। ঘটনাটির প্রত্যক্ষ সাক্ষী আদিবেরই বড় খালু খালেক মোল্লা। তার মুখেই আদিব ঘটনাটি শুনেছে। আদিবের খালু খালেক মোল্লা একবার তার বাড়িতে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে মিলাদও দোয়া পড়ানোর জন্য তিনি মৌলভী সাহেবকে দাওয়াত করবেন বলে ঠিক করেন। যথারীতি একদিন তিনি মৌলভী সাহেবের বাড়িতে হাজির হন। বেশ অনুনয় বিনয় করে তিনি মৌলভী সাহেবকে বলেন ‘হুজুর, অনেক দিন ধরে আমার খুব আশা, আপনি একদিন আমার বাড়িতে মিলাদ পড়াবেন, আমার আর আমার পরিবার পরিজনের জন্য দোয়া করবেন।’ মৌলভী সাহেব মনযোগের সঙ্গে খালেক মোল্লা সাহেবের আবেদন শুনলেন। তারপর গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন “আমিও তো বড় আশা নিয়ে প্রতিদিন মসজিদ থেকে পাঁচবার আল্লাহর নামে নামাজের জন্য আহ্বান করি। তোমরা তো আমার সে আশা পূরণ কর না। তাহলে কিভাবে আমি তোমার আশা পূরণ করব?’ এ কথা বলেই মৌলভী সাহেব হাঁটতে শুরু করেন। খালেক মোল্লা স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। লজ্জায় তিনি যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চান। এ গল্প তিনি বহুবার করেছেন। আদিবের কাছে সব মিলিয়ে মৌলভী সাহেবকে অনন্য মানুষ বলেই মনে হয়। এই ঘোর লাগা অবস্থায় আদিবের মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ে মৌলভী সাহেবের কাহিনি। এ কাহিনিও আদিবের শিরা-উপশিরায় ভয়ের আরেকটি উষ্ণ ¯্রােত ছড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে ক্বারী সাহেবের কথাও। তিনিও এ এলাকার প্রসিদ্ধ বুজুর্গ ছিলেন। শুয়ে আছেন আরেক কবরস্থানে। সেটি আদিবের বাড়ির কাছাকাছি। বাড়ি যেতে চোখে পড়বে, তবে পথে পড়বে না, এমন এক জায়গায়। ক্বারী সাহেব সম্পর্কেও এলাকায় অনেক ঘটনার কথা চালু আছে। তিনি সদা-সর্বদা দীনের প্রহরী হয়ে থাকতেন সমাজে। লাঠি হাতে নিয়ে চলতেন। অন্যায়কে শাঁশাতেন। ‘বদবখ্ত’ ‘কমবখ্ত’ শব্দ দু’টি দিয়ে তিনি সব সময় অপরাধীদের সাবধান করে দিতেন। তার ভয়ে অন্যায়কারীদের পক্ষে অন্যায় করা বেশ দুরূহ ব্যাপার ছিল কথিত আছে, তার কবর থেকে অনেক রাতে কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ শোনা যায়, ঠিক তিনি যেভাবে তিলাওয়াত করতেন বেঁচে থাকতে। মৌলভী সাহেবের ব্যাপারেও এ রকমটাই শোনা যায়। ক্বারী সাহেবের কথা মনে পড়ায় আদিবের ভয় আরও বেড়ে যায়। কারণ বাড়ি যাওয়ার পথে ঐ কবরস্থানটাই ওর চোখে পড়বেই। ভয়ে ভয়ে আদিব মনে হয় একখ- কাঠই হয়ে যেত। বুকের তলায় আল্লাহ্ আল্লাহ্ আল্লাহ্ ধ্বনিটি যদি ক্রমাগত না বাজত। সেই ধ্বনিই ওর মনে এক দুর্বার আকাক্সক্ষা জাগিয়ে রেখেছে। এখনও এশার আযান হয়নি, কারো না কারো দেখা নিশ্চয় মিলবে। আবার ভাবে, নাকি এশার আজান হয়ে গেছে, সে হয়তো শুনতে পায়নি। এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই। ব্যাটারীতে মাইক চলে। মসজিদগুলোও যথেষ্ট দূরে দূরে। সব মসজিদে মাইক নাই। অনেক সময় ব্যাটারীতে চার্জ থাকে না। এবার বেশ কিছুটা হতাশই হয়ে পড়ে আদিব। কী করবে? কোন উপায়ই খুঁজে পায় না। এমন সময় ঘটে যায় সেই কাক্সিক্ষত ঘটনাটি। বামদিকের রাস্তা দিয়ে কে জানি আসছেন। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা টুপি, সাদা দাড়ি। হ্যাঁ ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। আদিব গাছপালার ফাঁক দিয়ে ওদিকে গভীর মনোযোগে দাঁড়িয়ে আছে। ওই রাস্তার এ পাশটা খোলামেলা কোন গাছপালা নেই। ফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গ্রামের কোন মুরব্বি হবেন। পরিচিত অনেকের কথাই মনে পড়ল আদিবের। ওই পথে একটা বাজারও আছে। গ্রামের অনেকে সেখানে ব্যবসাও করে। একবার নিজের বড় জেঠার কথাও মনে পড়ল আদিবের। হয়তো সন্ধ্যা পার করে বাজার থেকে ফিরছেন। আদিব মনে মনে প্রার্থনা করে ‘আল্লাহ্ লোকটা যেন আমার দিকে না আসে, ডানদিকেও চলে না যায়। সে যেন আমার পথেই যায়, আমার পাড়ার দিকেই যায়। যেন আমি তার পিছু পিছু যেতে পারি।’ আদিবের প্রার্থনাই যেন কবুল হয়। লোকটা ওই ভবন দু’টির মাঝখান দিয়েই সামনের দিকে এগুতে থাকে। আদিব ভাবে, লোকটা যেই হোক না কেন, সে যেন বুঝতে না পারে আদিব ভয় পেয়েছে। ব্যাপারটা আদিবের জন্য লজ্জার হবে। এ অবস্থায় আদিব নিজেকে আড়াল করতে পারবে না। তার চোখে-মুখে জাজ্জল্যমান ভয় প্রকাশ পাবেই। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নেয়, চুপিচুপি লোকটার পিছু পিছু এগিয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে আদিব। শ্মশান ঘাটটা পার হলেই বড় একটা বাগান। সেই বাগানের শেষেই পথের পাশে মুন্সীবাড়ী। লোকটা যদি ওই বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাহলে তো সমস্যা থেকেই যাবে। এই ভাবনায় বিভোর হয়ে লোকটার পিছু পিছু এগুাতে থাকে আদিব। লোকটাকে সে চোখের আড়াল করতে চায় না। লোকটার দিকে চোখ নিবদ্ধ রেখে অতিচেনা পথে হাঁটছে আদিব। লোকটার হাতেও কোন টর্চ লাইট নাই। একহাতে মনে হচ্ছে একটা বাজারের কালো ব্যাগ ঝুলছে। এগুতে থাকে লোকটা, আদিবও। 

মুন্সীবাড়ীর দরজা পার হয়ে গেছে লোকটা। আদিব হাঁফ ছাড়ল। এগুতে থাকল স্বাভাবিক গতিতে। মুন্সীবাড়ীর পরেই পথের দু’পাশে ঘন বাগান, ঝোঁপঝাড়ে আকীর্ণ প্রায় একশ’ গজ রাস্তা। তারপরেই দু’পাশে খোলা মাঠ। মাঠ পার হলেই উল্টোদিকে মুখ করা গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটি একপাশে; আর অন্যপাশে একচিলতে বাগান। স্কুলের মাঠটি পার হয়েই ডানদিকে বাঁক নিয়ে চলে গেছে যে পথটি, সেটি আদিবদের বাড়ির পথ। আর যে পথটি সোজা চলে গেছে, সেটি ক্বারী সাহেবের কবরস্থানের সামনে গিয়ে বাম দিকে মোড় নিয়ে চলে গেছে। লোকটা যখন আদিবদের বাড়ির রাস্তা অতিক্রম করে ক্বারী সাহেবের কবরস্থানের দিকে এগুচ্ছে আদিব তখন স্কুল ঘরটা পার হয়ে এসেছে। স্কুলের এক চিলতে মাঠটি ব্যবধান। খুব বেশি নয়। মুন্সীবাড়ীর পরের বাগানটি পেরিয়ে আদিবের ভয় পুরেটাই কেটে গেছে। ফলে সে দ্রুত এগিয়ে এসে লোকটার সাথে দূরত্ব অনেকখানি কমিয়ে ফেলেছে। লোকটা স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটছে। আদিব লোকটাকে চোখে চোখে রাখছে এখনও। লোকটার অবয়বও তার নিকট আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। আদিব লোকটাকে চোখের নজরে রেখেই ক্বারী সাহেবের কবরস্থানটাকে চোখের আড়াল করে নিজেদের বাড়ির রাস্তায় ঢুকে পড়তে চায়। যেখান থেকে চোখ বন্ধ করে একটা দৌড় দিলে মাত্র এক মিনিটে সে নিজের ঘরে ঢুকে পড়তে পারবে। আদিব যখন সম্পূর্ণরূপে নির্ভয় হয়ে পড়ে ভয় থেকে ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় ভয়ঙ্কর ঘটনাটি। যে ঘটনা মনে পড়লে আদিবের শরীরের প্রতিটি রোমকূপ এখনও দাঁড়িয়ে যায়। হঠাৎই আদিবের চোখ থেকে উধাও হয়ে যায় সেই লোকটি। নেই কেউ নেই। কোন লোকই নেই এ পথে। কেউ নেই কোথাও। গোটা পথটিই ফাঁকা। সামনেই ক্বারী সাহেবের কবরস্থান। লোকটা যেখান থেকে উঠাও হয়ে গেল সেখান থেকে ক্বারী সাহেবের কবরস্থান কমপক্ষে এক মিনটের পথ, যে গতিতে হাঁটছিল লোকটা সে হিসেবে। এটা কি করে সম্ভব? মুহূর্তের মধ্যে নাই। কেউ নাই। তাহলে কার পিছু পিছু এসেছে আদিব। ভয়ে আদিবের শরীর হীম হয়ে যেতে চায়। মুখে সে চিৎকার করতে চায় কিন্তু দুঃস্বপ্নের মত কণ্ঠ ছেড়ে সে চিৎকার বের হয় না। পায়ে পায়ে ঠেকা লেগে যায়। আদিব নিজের সমস্ত চেতনাকে একাকার করে স্কুলের ছোট্ট মাঠটি কোনাকুনিভাবে পার হয়ে নিজের বাড়ির রাস্তা প্রাণপনে দৌড়াতে শুরু করে। মুহূর্তে সে পৌঁছে যায় তাদের বাড়ির আগের বাড়িটির উঠানে। এ বাড়ির পাশ দিয়েউ ওদের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা। কিন্তু আদিব এ বাড়িতেই ঢুকে পড়ে। তার বিদ্যুৎগতির আগমনে বাড়ির কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ কেউ পাত্তা দিচ্ছে না, নাকি টেরই পায়নি। আদিবের পা দু’টি অসাড় হয়ে যেতে চায়। উঠানের একটি খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কুকুরগুলোর ঘেউ ঘেউ বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আদিব ওই বাড়ির ভিতর দিয়েই নিজেদের বাড়ির দিকে এগুতে থাকে। পা চলতে চায় না। তাও এগুতে হবে। সবই সে পাড় হয়ে এসেছে, আরেকটু পথ নিজেদের বাড়ি। পাশের বাড়ির সীমানা অতিক্রম আবিদ আবারও রাস্তায় নামে। তারপর একই রকম গতিতে দ্বিতীয় দৌড়টি দিয়ে নিজেদের ঘরে গিয়ে সোজা বসে পড়ে বিছানায়। আব্বু আম্মু ভাই-বোনেরা ছুটে আসে, ছুটে আসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। আদিব ক্লান্ত, নিশ্চুপ, নিশ্চল। দুই চোখের পূর্ণ দৃষ্টি মেলে স্থির হয়ে শুয়ে থাকে, যেন আগামী একশ’ বছরেও তার মুখে কোন কথা ফুটবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ