ঢাকা, শুক্রবার 03 March 2017, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা

আব্দুর রাজ্জাক রানা : খুলনা মুলত খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরার সমাহার। এখানকার মানুষ এখনো এই তিন জেলাকে ঘিরেই নিজেদের বৃহত্তর খুলনা জেলার বাসিন্দা ভেবে থাকে। তাই এ অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্য এই জনপদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।  

১৯৪৭ সালের আগে খুলনাঞ্চলে তেমন কোন সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার বিকাশ ঘটেনি। তবে দু’চারজন যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার চেষ্টা করেননি তা নয়। শত বছর আগে খুলনায় মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মনন চর্চার একমাত্র স্থান ছিল ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’। ১৯৩১ সালে খুলনা মুসলিম ক্লাব ও লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয় পুরাতন যশোর রোডে। এই লাইব্রেরীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এডভোকেট দেলদার আহমেদ, আবদুল হাকিম, আব্দুল হক, খান সাহেব সামছুর রহমান, ডা. আবুল কাশেম প্রমুখ। সে সময় এই লাইব্রেরী থেকে পাঠকদের বই পড়ার জন্য বিলি করা হতো। কিন্তু এই উদ্যোগ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। 

এরপরেই খুলনার সংস্কৃতি চর্চায় নতুন জোয়ার আনে ‘মনিমেলা’। এই মনিমেলা ছিল আনন্দবাজার পত্রিকার সাপ্তাহিক আয়োজন। এর পাঠক ঘিরেই তখনকার ছোট্র জেলা শহর খুলনার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে শাখা উপ-শাখা। এ সব জায়গাগুলো ছিল তরুণদের সংস্কৃতি চর্চার প্রধান ক্ষেত্র। এই সাহিত্য  ও মনন চর্চার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বাবু শিবানী বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন রবীন্দ্র ভারতীয় প্রকাশনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তার বাড়ীর কাছেই ছিল মনিমেলার কার্যালয়। নৃত্য গীতের নিয়মিত অনুশীলন চলতো সেখানে। পুলিশ লাইনের পূর্বে লাগোয়া সড়কের দক্ষিণ মাথায় সাব জজ কে, কে সেনের বাড়ীতেও একবার মনিমেলা প্রযোজিত নৃত্যনাট্য চন্ডালিকার মহড়া চলে দীর্ঘ দিন ধরে। মনিমেলার অনুষ্ঠানের অন্যতম আর্কষণ ছিল শিবদাস বন্দোপাধ্যায়ের (‘গঙ্গা আমার মা’ খ্যাত গীতিকার)  আরতি। ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় এর ধারাবাহিকতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তখন প্রয়োজন দেখা দেয় রাজনৈতিক ভিত্তিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার। 

বৃটিশ আমলে খুলনার বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে জমিদারদেরই প্রভাব ছিল বেশী। সে সময়ে বিত্তবান জমিদারদের দিয়েই বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালিত হতো। অবসর বিনোদনের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় এইসব বিত্তবানদের দ্বারাই।

দক্ষিণ বাংলার সংস্কৃতি চর্চার চারণভূমি বলা হয়ে থাকে খুলনাকে। এ ঐতিহ্যের ধারা একশ’ বছরের বেশী সময় ধরেই চলে আসছে। এর আগেই যে,  ছিটে-ফোটা একটু-আধটু সংস্কৃতির কথা জানা যায়, তা সঠিক নাও হতে পারে বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করে থাকেন। তবে আমরা বিশেষ করে ১৯০০ সাল থেকেই ধরতে পারি খুলনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এটা আবার কোন সময় উচ্চারিত আবার কোন কোন সময় অনুচ্চারিতভাবে কেটেছে। যদি আমরা দীর্ঘ একশ’ বছরকে তিনটি ভাগে ভাগ করি তাহলে খুলনার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রের বিচার বিশ্লেষণে সুবিধা হবে। ১৯০০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত, আর  ১৯৪৮  সাল থেকে ১৯৭১  সাল পর্যন্ত এবং ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই তিনভাগে ভাগ করেই সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংগঠনের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ১৯০০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে খুলনায় তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। এক কথায় বলা যেতে পারে ১৯৪৮ সাল থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির নতুন ধারার বিকাশ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ তৎকালীন পাকিস্তান সৃষ্টির পরে। তবে জানা যায়, পাকিস্তান সৃষ্টির পরে খুলনার সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বেশ কিছুটা ভাটা পড়েছিল। ১৯৪৭ সালের আগে সাহিত্য ক্ষেত্রে যতকিছু কর্মকা- হয়েছে তার পিছনে হিন্দুরাই নেতৃত্ব দিতেন বেশী। পাকিস্তান হওয়ার পর অনেক হিন্দু অর্থাৎ  যারা একটু সাহিত্য সংস্কৃতিমনা হিন্দু ছিলেন তাদের অধিকাংশেই ভারতে চলে যান। এ শূন্যতা কেটে উঠতে কিছুটা হলেও সময় লাগে। 

খুলনার আহসান আহমেদ রোডে ১৯৪০ সালে ‘শ্রী অরবিন্দ সংঘ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশ্ব নাথ নাগ। এ সংঘের একটি লাইব্রেরীও ছিল। প্রতিদিন বিকেল ৬টা-৯টা পর্যন্ত রিডিং সেকশনের ব্যবস্থা ছিল। যা আজ ‘অরতীর্থ’ নামে পরিচিত। তাছাড়া এই প্রতিষ্ঠান নববর্ষ, জাতীয় দিবস, কবিতা পাঠের আসর, সাহিত্য আলোচনা ও মাঝে মধ্যে সঙ্গীনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সংঘের সভাপতি দেবেন চন্দ্র পাল ও সেক্রেটারি অধ্যাপক অসীত বরণ ঘোষ।

তমুদ্দুন মজলিস: পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ১৫ দিন পর ১৯৪৭ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর ‘তমুদ্দুন মজলিস’ নামে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ভাষা সৈনিক ও সাংবাদিক আব্দুল গফুর। এ সংগঠনের জন্মের কিছুদিন পর সভাপতি মনোনীত হন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। এর কয়েক বছর পর তমুদ্দুন মজলিসের খুলনা শাখা গড়ে ওঠে। তবে এ সংগঠনের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তারা বেশীদিন এটা ধরে রাখতে পারেননি। কারণ সংগঠন করার মত কর্মীর দারুন অভাব ছিল। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ আমজাদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এডভোকেট মোমিন উদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়স্থ হোটেল গোল্ডেন কিং এর নিজ অফিসে সভাপতি সাবেক মেয়র শেখ সিরাজুল ইসলাম কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। 

নয়া সাংস্কৃতিক সংসদ: ১৯৫১ সালে খুলনায় ‘নয়া সাংস্কৃতিক সংসদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গড়ে ওঠে। এটি সাহিত্য ভিত্তিক সংগঠন হলেও এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক কর্মকা-। এই সংগঠনের যখন জন্ম হয় তখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট  ছিলেন ভাষা সৈনিক তোফাজ্জেল হোসেন, মালিক আতাহার উদ্দিন, আবদুল গফুর এমপি, আবদুল বারী প্রমুখ। এ সংগঠনের রবিবাসরীয় সাহিত্য আসর বসতো বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশের একটি পুরাতন বাড়ীতে। তাছাড়া এই সংগঠনের প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ব্যাপকভাবে নীলা সিনেমা বর্তমান পিকচার প্যালেস হলে অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া একটি রেডিও কৌতুকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নয়া সাংস্কৃতিক সংসদের একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী পরিষদ গঠন হয়েছিল। এ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তৎকালিন দৌলতপুর কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক বাবু অমূল্য ধন সিংহ। সভাপতি অধ্যাপক শামসুল আলম, সেক্রেটারি জেনারেল তোফাজ্জেল হোসেন, সাহিত্য সম্পাদক শেখ মোতাহার হোসেন, সঙ্গীত সম্পাদক সাধন সরকার, বিতর্ক সম্পাদক মালিক আতাহার উদ্দিন, আর্ট সম্পাদক উদয় সরকার। আরো ছিলেন তবিবুর রহমান ও নারায়ণ চন্দ্র দাশ প্রমুখ। 

স্টুডেন্ট কালচার এসোসিয়েশন: ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জনমত গঠনের মিমিত্তে সাহিত্য ও সাংস্কৃতির ধারাকে রাজনীতি ক্ষেত্রে সফল করে তোলার আশায় ছাত্ররা তখন জাতীয় চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলে। ১৯৫৫ সালে  তারা ‘স্টুডেন্ট কালচারাল এসোসিয়েশন’ নামে একটা সংগঠন গড়ে তোলে। এর সেক্রেটারি জেনারেল মোফাজ্জেল হোসেন। খুলনার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ সংগঠনও ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। এর পর বহু দিন বিভিন্ন সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ১৯৬২ সালের পর থেকে আবার নতুন করে কিছু সাহিত্য সংগঠন গড়ে ওঠে। 

খুলনা সাহিত্য পরিষদ: ১৯৬৩ সালের পয়লা জুলাই শুক্রবার খুলনা মহানগরী নূরনগরস্থ প্রেমকানন প্রাঙ্গণে এএফএম আবদুল জলিলের উদ্যোগে সূধী, কবি ও সাহিত্যকদের এক সভায় ‘খুলনা সাহিত্য পরিষদ’ এর প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন উপাধ্যক্ষ আবদুল ওয়াহেদ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কাজী মাহবুুবুর রহমান, দৈনিক জনবার্তার সম্পাদক সৈয়দ সোহরাব আলী, ডা. আবুল কাশেম, সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী এম. মনসুর আলী, কাজী আবদুল খালেক, কাজী নজরুল ইসলাম, বিকাশ চন্দ্র রায়, এসএ জব্বার প্রমুখ। সাহিত্য পরিষদের গঠনের আগে প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাহিত্য পরিষদ গঠনের প্রস্ততি চলতে থাকে। তারই ফলশ্রুতিতে খুলনার কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে ১২ জুলাই প্রেমকাননে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই সভায় একটি কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়েছিল। যার সভাপতি হন এএফএম আবদুল জলিল, সহ-সভাপতি ডা. আবুল কাশেম, সম্পাদক এসএম জলিল, সহ-সম্পাদক সৈয়দ সোহরাব আলী, সদস্য যথাক্রমে মোজাম্মেল হোসেন, আমির বিন আফতাব, শেখ আব্দুল জাব্বার, বিকাশ চন্দ্র রায়, নেসার উদ্দিন, কাজী নজরুল ইসলাম, মো. সিরাজুল ইসলাম, ডা. আবদুল হাকিম। এই সংগঠনের উদ্যোগে খুলনায় প্রথম সাহিত্য সম্মেলনসহ একাধিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে খুলনা সাহিত্য পরিষদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নগরীর শহীদ হাদিস পার্কে। এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন এডভোকেট আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চু ও অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন। বর্তমানে এর নিজস্ব কার্যালয় নগরীর শান্তিধাম মোড়ে অবস্থিত।   

সন্দীপন সাংস্কৃতিক সংসদ: খুলনা সাহিত্য পরিষদের জন্মের পর খুলনায় জন্মলাভ করে ‘সন্দীপন সাংস্কৃতিক সংসদ’। এ সংগঠনের কর্ণধার কেউ এখন আর বেঁচে নেই। তারা সবাই ছিলেন বিত্তবান। সেদিক দিয়ে তারা অন্য ক্ষেত্রে পদচারণা করলেও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তারা ছিলেন ভিন্ন ধরণের। সন্দীপনের প্রতিটি কাজের পেছনে যে সকল ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক খালেদ রশীদ (গুরু), সাধন সরকার, নাজিম মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান, হাসান আজিজুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, অসিত রায় চৌধুরী, নাজিম সেলিম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। খুলনা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কোন আন্দোলন হলে এদের নাম সবাই স্মরণ করবে। এ সংগঠনটি বেশ প্রশংসার দাবীদার। অধ্যাপক খালেদ রশীদ তিনি গুরু বলেই ছাত্র-ছাত্রী মহলে বহুল পরিচিত ছিলেন। তিনি খুলনা গার্লস কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তিনি সন্দীপন মাসিক পত্রে ‘আলকেমী’ ছদ্ম নামে বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখতেন। তাছাড়া নাটকের মহড়ার মঞ্চায়নে তিনি ছিলেন একজন নিরলস পরিচালক।

পারাবত: ১৯৬৪ সালে খুলনায় গড়ে উঠেছিল ‘পারবত’ নামে একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এ সংগঠনটি এ অঞ্চলের সাহিত্য অঙ্গনে মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। এর অফিস ছিল শান্তিধামের মোড়ে। এই সংগঠনটির পরিচালক ছিলেন অধ্যক্ষ রুহুল আমিন। বেশ কয়েক বছর ধরে এর কার্যক্রম সুন্দর ও সার্থকভাবে চলেছিল। এর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করেছে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে সংগঠনটি কেমন করে বন্ধ হয়ে যায়। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ