ঢাকা, শুক্রবার 03 March 2017, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পানি আর নদী রক্ষা হয় যদি

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : ‘নদীর একূল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা- সকালবেলায় আমীর রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা’। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯৯৬-৯৭ সালের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের নদী অঞ্চলের আয়তন ৯,৪০৫ কিলোবাইট। বাংলাদেশের নদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। নদীবহুল দেশ বলে স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নদীর প্রভাব ব্যাপক। অনাদিকাল হতে এদেশের নদী প্রকৃতি ও পরিবেশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের জীবনবৈচিত্র্যে নদীর প্রভাব অনেকটাই বেশি। বিগত ১০০ বছরে এশিয়া মহাদেশের বঙ্গোপসাগরের পাদদেশের এই বাংলায় নদী ভাঙ্গনের ফলে ভূখণ্ডের মানচিত্র অনেক রদবদল হয়ে গেছে। লাখ লাখ পরিবার বন্যায় নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে হারিয়েছে বসতভিটা, বাড়ি-ঘর, জমি-জমা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, নিঃস্ব হয়ে নদী সিকস্তি ছিন্নমূল বস্তু হারা মানুষ খোলা আকাশের নিচে মাসেরপর মাস কাটিয়ে উপায়ন্তর না পেয়ে আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধের ওপর, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে বা পরিত্যক্ত জমিতে। সহায় সম্বল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে রুটি রুজির সন্ধানে অসংখ্য বেকার মানুষ পাড়ি জমিয়েছে শহর ও নগরে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ডাকবাংলো, হেলিপ্যাড ও আশ্রয় কেন্দ্র। 

বাংলাদেশের ভাঙনপ্রবণ নদীর মধ্যে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্র‏হ্মপুত্র ও তিস্তা অন্যতম। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়, বিগত ৪০ বছরে নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর ফসলী জমি, বাস্তুহারা হয়েছে ৪০ লাখ মানুষ, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রাক্ষুসে যমুনা, পদ্মা, তিস্তা ও ব্র‏হ্মপুত্র নদ-নদীসহ উপ-নদীর ভাঙনের শিকার হয়ে অন্তত ১৯ জেলার নদী উপকূলীয় বাসিন্দারা। জেলাগুলো হচ্ছে- সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও পাবনা। 

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশের মধ্যে ২য় স্থানে। ১ম স্থানে রয়েছে হন্ডুরাস, এবং ৩য় থেকে ১০ম স্থানে রয়েছে সোমালিয়া, ভেনিজুয়েলা, নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম, ডেমিনিকান, প্রজাতন্ত্র ফান্স, ভারত, চীন। প্রকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙন, বৃষ্টিপাাত, খরা, ঘুর্ণিঝড় টর্নেডো, হ্যারিকেন, কালবৈশাখী সুনামী, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা নামে প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংজ্ঞায়িত। 

নদী ভাঙনের ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২৫ হাজার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে উদবাস্তু হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বিভিন্ন সংস্থার হিসেব মতে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রায় ৪০ লাখ লোক নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। সেইসাথে ২ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস এন্ড রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইএফআরসিএস) এর দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বব ম্যাকরো গত ২০১৫ সালে নদী ভাঙনকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা চি‎হ্নিত করেছেন। নদী ভাঙন এদেশে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে যে কোনো দুর্যোগের চেয়ে বেশি মাত্রায় ধ্বংস করছে, কিন্তু এ নিয়ে খুব কম সংখ্যক লোকই মাথা ঘামায়। তার ভাষায় এটি একটি ‘Slow, Slient Disaster’.

বিশিষ্ট ভূগোলবিদ প্রফেসর কে মউদুদ ইলাহীর মতে, প্রতিবছর নদী ভাঙন এলাকা থেকে ২০-৩০ শতাংশ বাস্তুহারা জনগোষ্ঠী নিকটবর্তী শহরে এবং বড় শহরে অভিগমন করে থাকে। ঢাকা শহরের বিপুল সংখ্যক বস্তিবাসীর প্রায় ২৫ শতাংশ নদী ভাঙনজনিত কারণে রাজধানী শহরে ছুটে এসেছে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপকহারে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে।

 দৈনিক কালের কণ্ঠ; ৩ জুলাই ২০১৫ সংখ্যায় “জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল, ৭ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার।” এ অর্থ ব্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনে আশানুরূপ ফল দেখা যাচ্ছে না।

দৈনিক সংগ্রাম ২০ এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় “হুমকির মুখে বাংলাদেশ” শিরোনামে আখতার হামিদ খানের লেখায় জানা যায় দ্বিতীয় ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিডিএফ) এর বৈঠকে সবচেযে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশের প্রতিনিধিরা ২০০৯ সালে নবেম্বরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে প্রথম বৈঠক করেন। এতে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দারিদ্র্যদের দুঃখ-দুর্দশা দিন দিন বাড়ছে। শুধু এর প্রভাবে গত বছর অতিরিক্ত তিন লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু ঘটে এবং ১৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি সম্পদ বিনষ্ট হয়, সময়মতো পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে না পারলে ক্ষতি আরো বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের আইপিসিসি প্রতিবেদনে জানা যায়- ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণাঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। সুপেয় পানি পাওয়া যাবে না এবং জমি অনুর্বর হবে।

গত ২২ জুন ২০১৬ খ্রিঃ দৈনিক জনবাংলায় প্রকাশিত সেবিকা রানীর লেখা পিআইডি ফিচারের তথ্য মতে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উপকুলীয় জেলাগুলো দেশের নিম্নাঞ্চল তথা বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটে হওয়ায় প্রতিবছর এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ২শ’ বছর ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে এসব দুর্যোগের কারণে গত ৫০ বছরে সংঘটিত ৯টি বড়ো ঘুর্ণিঝড়ে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ৮ হাজার ৯শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকার জনগণ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে বলে এক গবেষণায় জানা গেছে। 

যমুনা, ব্র‏হ্মপুত্র, মেঘনা এবং দেশের অভ্যন্তরে আরো ৫০টির বেশি নদী উপকূলীয় এলাকার মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিলক্ষিত হলেই উপকূলীয় জনপদে এর প্রভাব পড়ে যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। 

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিগত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ে উপকূলীয় জনপদে কমপক্ষে ৭০টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যায় মধ্যে গত শতকে অর্থাৎ ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ৪০টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করে। এমনকি ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে এসব এলাকায় ১১টির বেশি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। 

গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে দুর্যোগে। এর আগে ১৯৬৫ সালে ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ে ১৯ হাজার ২৭৯ জনের প্রাণহানি হয়। একই বছর ডিসেম্বরে ২১৭ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ৮৭৩ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৬৬ সালের অক্টোবরের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৮৫০ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৮৫ সালের মে মাসের ঘুর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার। আর এর আঘাতে ১১ হাজার ৬৯ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ২২৫ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ৬ থেকে ৭.৬ মিটার। এই দুর্যোগে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৯৭ সালের মে মাসে ২৩২ কি.মি. বেগে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৫৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। 

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সৃষ্ট প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিগত ৮০ বছরে সোনার বাংলায় নদী সিকস্তি চরবাসীদের জীবন সংগ্রামের নানা রকমারিতা রয়েছে। উপর্যুপরি ভয়াবহ বন্যার কারণে নাব্যতা কমে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার বালুকারাশিতে ধূ ধূ বালুচর পড়ায় খরা সৃষ্টি হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে লাখ লাখ একর ফসলী জমি আবাদযোগ্যতা হারিয়েছে। অভাব, দারিদ্রতা, বেকারত্ব, ব্যাপকভাবে বেড়ে জনদুর্ভোগ চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যায় বহুল চাষাবাদে চাষিরা চাষকার্য ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। বারবার বন্যায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বসতবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে চরাঞ্চলের মেহনতি মানুষ বাঁচার তাগিদে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু এলাকায় কিংবা বেড়িবাঁধের ওপর। মৌমাছিরা দলবেঁধে সৈনিকের ন্যায় সাজ সাজ রবে ছুটে বেড়ায় নিরাপদে নতুন মৌচাক নির্মাণকল্পে। তেমনি একশ্রেণীর কর্মক্ষম যুবকরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা বাদ দিয়ে জীবিকার তাগিদে শহরাঞ্চলে পাড়ি দিয়ে ছোটাছুটি করে কর্মসংস্থানের সন্ধানে। বেড়ে যায় বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, মাদক সেবন, হাইজাক, ডাকাতি, গুম, খুন। 

এবারের বর্ষার পর দেশের উত্তরাঞ্চলের ৭টি জেলার অন্তত ১৫শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালুচর পড়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে নৌযাগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ১৯৯০ সালের পর যমুনা নদীর নাব্য সংকটের কারণে ফেরি সার্ভিসগুলো বন্ধ হওয়ায় অল্প সময়ে স্বল্প ব্যয়ে যাত্রী পারাপার, কৃষিপণ্য সামগ্রী, ডিজেল, সার সরবরাহসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন করা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ জেলা থেকে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলা পর্যন্ত যমুনা নদীতে নৌকা ঘাট ছিল প্রায় দেড় শতাধিক। পানির স্বল্পতাহেতু চর ও ডুবোচর পড়ায় নৌকা চলাচল করতে না পারায় ঘাটগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে নদী উপকূলীয় ১৪ জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সাথে নদীপথে যাতায়াত ও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছে। জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট ও গাইবান্ধার বালাসীঘাট এবং জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জঘাট ও সিরাজগঞ্জ ঘাটের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে ফেরি চলাচল প্রায় ১৫ বছর যাবৎ বন্ধ রয়েছে। শুকনো মওসুমে লঞ্চ-ফেরি তো দূরের কথা, এসব এলাকায় এখন নৌকাও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে নৌপথে পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেড়েছে চরম ভোগান্তি। 

ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে যমুনা নদীতে জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট ও গাইবান্ধার তিস্তামুখঘাট এবং জামালপুরের জগন্নাথগঞ্জঘাট ও সিরাজগঞ্জ ঘাটের মধ্যে ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা করেছিল। ফলে দেশের পূর্বাংশে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট বিভাগের সাথে দেশের পশ্চিমাঞ্চল রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের সাথে রেলপথে অল্প খরচে নিরাপদে স্বল্প সময়েই মালামালসহ যাত্রী সাধারণের যাতায়াতের পথ সুগম হয়েছিল।

যমুনা সেতু নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত এদেশের ৪৫টি জেলার মানুষ রেলওয়ের সুবিধা ভোগ করছিল। কালের বিবর্তনে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারণে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদীপথে সহজলভ্য পরিবহন ও যোগাযোগ অনেক অংশে পরিসমাপ্তি ঘটার পথে। স্মরণকালের বিলাসবহুল রেলওয়ে ও স্টিমার যাত্রা এখনো কোটি মানুষের অন্তরে দাগা দেয়।

* ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পদ্মার, গজলডোবা বাঁধ দিয়ে যমুনার, টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে মেঘনার পানি প্রবাহ বন্ধের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে ভারত। অথচ এ তিনটি নদী বাংলাদেশের প্রাণ। ভারতের বাঁধ ও পানি আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত মরুকরণ হয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে। পদ্মা নদীতে হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে ১৫টি পিলারের মধ্যে ১২টি দাঁড়িয়ে আছে শুকনো বালুর চরে। যমুনা ব্রিজের অবস্থা বর্তমানে অনেকটা এ রকমই। 

ভারতকে প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালে ১৬ মে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন সেটি “মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি” নামে পরিচিত। সে চুক্তির ধারাবাহিকতায় ফারাক্কা বাঁধ চালু করার ব্যাপারে বাংলাদেশের সম্মতি পেয়েছিল ভারত। এই চুক্তির অজুহাতে সুকৌশলে ভারত আমাদের বাংলাদেশকে একবার পানিতে মারে, একবার শুকিয়ে মারে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মার পানি প্রবাহ যেখানে ছিল ৬৫ হাজার কিউসেক সেখানে ১৯৭৬ সালে তার পরিমাণ নেমে এসেছিল মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে। এর প্রধান কারণ ছিল ফিডার ক্যানেল দিয়ে ভারতের পানি প্রত্যাহার। এককভাবেই ভারত পানির অপরাজনীতি শুরু করেছিল। বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করেই মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ১৬ মে ১৯৭৬ সালে হয়েছিল ঐতিহাসিক লংমার্চ ফারাক্কা মিছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই মিছিলের ব্যাপক প্রচারণা ও প্রভাবের সদ্ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে ফারাক্কা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন। জাতিসংঘও ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের ৫ নবেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘ফারাক্কা চুক্তি’। এর মাধ্যমে গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবি ও অধিকার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে একটি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল, যার কারণে ভারত ইচ্ছামাফিক কম পানি দিতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে ৩০ বছর গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ঐ চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ না থাকায় ভারত পানি বণ্টনে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশকে পানিবঞ্চিত করছে অপরদিকে বর্ষা মওসুমে ফারাক্কাসহ অন্যান্য অন্তত ১৫টি নদীর গেট একসঙ্গে খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বন্যার পানিতে ডুবিয়ে মারছে। 

নদী একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে অভিশাপ ও দুঃখ বেদনার উৎস। নদীর পানিতে পলিমাটি ভেসে এসে বিস্তীর্ণ এলাকার জমি উর্বর করে। সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলে ভরে উঠে বিস্তর প্রান্তর। তেমনি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার বর্ষা মওসুমে নদীর দু’কূল ছেয়ে পানি উপচে পড়ায় তলিয়ে যায় মাঠ-ঘাট পথ-প্রান্তর জনপদ। 

গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক নদী শুকিয়ে গেছে। প্রায় ১৩ শ নদীর মধ্যে শুকিয়ে এখন ৬ শতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের গবেষণা প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। এ নিয়ে দীর্ঘ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা দৈনিক আনন্দ বাজার। ঢাকার সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিট মিলনায়তনে নদ-নদী রক্ষায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী করণীয় শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে নদী বাঁচাও আন্দোলন। এতে প্রকৌশলী জাবের আহম্মেদ ও মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে ১৩০০টি নদ-নদী থেকে এখন মাত্র ৭০০তে নেমে এসেছে। এছাড়া বেঁচে থাকা নদ-নদীর মধ্যেও প্রবহমান নদীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। নদী রক্ষায় সরকারের নিকট এই সংগঠন মোট ১৬টি সুপারিশ তুলে ধরেছে।

দৈনিক প্রথম আলো ২৬ নবেম্বর ২০১৬ সংখ্যার “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে রাষ্ট্রপতির আহ্বান জানিয়েছেন।” রাজধানী রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে এক সম্মেলনে “পরিবেশ ও জলবায়ু” শীর্ষক দক্ষিণ এশিয়া জুডিশিয়ান কনফারেন্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের এক ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ এ আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন- যেসব দেশ প্রথম প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ দিয়ে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল গঠনকারী প্রথম দেশ। 

এমতবস্থায় খন্ডিত চাঁদ-তারার বদলে লাল সবুজের বাংলাদেশে সুদিনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, গত ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিঃ দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশিত “নৌপথে নাব্য বাড়ানো ২২ লাখ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা” শিরোনামে জানা যায় সারাদেশে নদ-নদী খাল, পুকুর খননের মাস্টারপ্লান চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সরকার। পদ্মা ও মেঘনাসহ মোট ৪০৫টি নদী ৬ হাজার ৫৩৬টি খাল, ১৮ হাজার ৪০৩টি পুকুর খনন করা হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে ঐ প্রতিবেদনে। এতে ধরা হয়েছে ২২ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭ গুণ। আগামী ১৫ বছরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে নদীগুলোর ২৪ হাজার কিলোমিটার নাব্যতা বাড়বে। ফলে নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন গতিশীল হবে। মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং সুপেয় পানির চাহিদা মিটবে। সমুদ্র সীমানার মানচিত্রের আকার কলেবরে বৃদ্ধির অসাধারণ সফলতা অর্জনকারী বর্তমান সরকারকে এবার নদীর নাব্যতা পাল্টানোর অসাধারণ সফলতা অর্জনে মহাকর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে হবে। জাতি আজ সে আশায় প্রহর গুনছে।

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

ইমেইল dr.mizanur470@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ