ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল সমাচার

অনলাইন ডেস্ক: রাত হলেই ক্যাম্পাসের সব লাইট বন্ধ করে দেয়, অসামাজিক কার্যকলাপ করে, গাঁজার গন্ধে পুরো এলাকা ভর্তি হয়ে যায়। কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। আমরা একের পর এক তাদের হাতে লাঞ্ছিত হলেও কোনও বিচার পাই নাই, এখনও পাই না। আর বিচার করবে কারা? কলেজ অধ্যক্ষ ও হাসপাতালের পরিচালকও তাদের কাছে জিম্মি। এদের অনেক ক্ষমতা।

কথাগুলো বলছিলেন মীরপুর ১৪ নম্বরে অবস্থিত ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর তাদের এসব অভিযোগ কলেজের সরকারদলীয় ছাত্র নেতা ও ছাত্র সংসদের বিরুদ্ধে। শুধু তারাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরাও অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরেন তাদের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের ভেতরে মিছিল করা, রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া, অন্য কলেজের ইন্টার্নি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়ের মতো অভিযোগও রয়েছে এসব ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে।

বেশ কয়েকদিন ঘুরে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরো হাসপাতাল ও কলেজ ক্যাম্পাসের প্রতিটি মানুষ বতর্মান ছাত্র সংসদের কাছে জিম্মি। তাদের মর্জিমাফিক চলতে হয় সবাইকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে কেউ এখানে টিকতে পারবে না। পরিবার-পরিজনসহ আমাদের গুম হয়ে যেতে হবে। শুধু সম্মান ও প্রাণের ভয়ে আমরা মুখ বুজে সব সহ্য করি। সবকিছু করছে বর্তমান ছাত্র সংসদ। আর ওদের নেতৃত্ব দিচ্ছে একজন সাবেক শিক্ষার্থী, তার প্রভাবেই সবকিছু হয় এখানে।’

কলেজের সাবেক সেই শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতা আরিফুজ্জামান নাঈম। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপ-সম্পাদক। জানা যায়, কলেজ থেকে তিনি দুই বছর আগে পড়ালেখা শেষ করলেও পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিংয়ে ভর্তি হয়ে কলেজের ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি কলেজ ও হাসপাতালের সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।

হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক বলেন, ‘দেশের কোথাও বোধহয় হাসপাতালের ভেতরে মিছিল হয় না। এখানে হাসপাতালের তিনতলা, চারতলা পর্যন্ত মিছিল হয়।’ তারা বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসপাতাল উন্নয়ন কমিটির সভাপতি। তাকে বহুবার এ বিষয়ে বলা হয়েছে। তিনিও হাসপাতালের পরিচালককে বহুবার বলেছেন। কিন্তু কোনও কাজ হয় না। এমনও হয়েছে ওদের মিছিলে রোগী ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। কিন্তু মিছিল বন্ধ করা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। আর মিছিল হয় নাঈমের নেতৃত্বেই।’

এছাড়া, সরকারি হাসপাতালের রোগী ভাগিয়ে বাইরের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে ছাত্র সংসদের নেতাদের বিরুদ্ধে। জানা যায়, নুরুল আলম ওরফে সাগরসহ আরও কয়েকজন ছাত্র নেতা সিন্ডিকেট করে রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যান বাইরের ক্লিনিকগুলোতে। আর এসবের ভাগ পান নাঈম। এমনকি অন্য কলেজ থেকে যারা এখানে ইর্ন্টার্নশিপ করতে আসেন, তাদেরকেও মাসোহরা দিতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক বলেন, ‘ছাত্র সংসদের ভেতরে নিয়ে কর্মচারীদের মারধরের ঘটনা নৈমত্তিক। কিন্তু আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না, সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হয়।’

সর্বশেষ গত ৫ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের বাবুর্চির সহকারী হাবিবকে মারধরের ঘটনায় ছাত্র সংসদের হাতে ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি হওয়ার বিষয়েটি নতুন করে সামনে আসে। ‘তুই মরবি, তোর লাশও উধাও হয়ে যাবে’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে সেসময় সংবাদ প্রকাশিত হয়।

তবে এর আগেও কলেজের পরিসংখ্যান সহকারী মামুনুর রশীদ শিক্ষার্থীদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু মারধরকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই আপোষ করে ঘটনা ধামাচাপ দিতে হয়েছিল।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রথমে চুপ থাকলেও পরে বলেন, ‘হাসপাতালের কর্মচারী-কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। ঝামেলা তো আছেই। তবে সবকিছু বলাও যাবে না।’

কলেজ ও হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষক হয়েও ওদের সামনে মাথা নত করে থাকতে হয়। এসব বিষয়ে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং হলেও জয়ী হয় ওরাই। ওরাই তো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, ওরা ছাত্রলীগ, ওরা সরকারি ছাত্রসংগঠনের নেতা।’

তবে ছাত্র সংসদের সাবেক নেতা ডা. আরিফুজ্জামান নাঈম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন ‘ওরা (ছাত্র সংসদের বর্তমান কমিটি) আমার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেয়, আর কিছু না।’ তবে হাসপাতালের ভেতরে মিছিল করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসটি ছোট। যে কারণে ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে কলেজ থেকে হাসপাতালে চলে যায়। সেটাও সবসময় নয়।’

আবাসিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানিও এসবের নেতৃত্ব থাকার প্রসঙ্গে নাঈম বলেন, ‘একহাতে তালি বাজে না। আর সমস্যা থাকবেই। তা সমাধানে আমরা কাজ করছি। কিছু সমস্যা পরিবারেও হয়। সব ছাত্ররা তো একরকম না। কয়েকজন খারাপ আচরণ করে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে আমরা সেগুলো মাথায় রাখার চেষ্টা করব।’-বাংলা ট্রিবিউন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ