ঢাকা, রোববার 05 March 2017, ২১ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রলম্বিত চার্জশিটে আটকে আছে বিচার

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকান্ডের পর কেটে গেছে চার বছর। মূলত: এই চার বছর পূর্তি হবে কাল ৬ মার্চ। ২০১৩ সালের এই দিনে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয় ত্বকীকে। তার হত্যাকা-ের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত এখনও কোন কিনারে দাঁড় করাতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই। অবশ্য, তদন্তকারী কর্মকতার দাবি, মামলার তদন্ত চলছে। তবে কোন গতিতে তদন্তকাজ চলছে, তার কোনো উত্তর মেলেনি। তদন্ত শেষ না হওয়ায় চার্জশিটও দেয়া যাচ্ছে না। ফলে বিচার কবে শুরু হবে, তারও সময়সীমা নেই। অভিযোগ উঠেছে, শীর্ষ মহলের অদৃশ্য সুঁতোর টানে মামলার অগ্রগতি থেমে আছে। ফলে চার বছরেও চার্জশিট আদালতে জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা র‌্যাব।

এ দিকে, ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চেয়ে দেশের ২১ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি পহেলা মার্চ বুধবার এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেন, নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে হত্যার ৪ বছরেও মামলার অভিযোগপত্র না দেয়ায় আমরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। সংবাদ মাধ্যমে আমরা জেনেছি এ হত্যার সঙ্গে জড়িত একাধিক ঘাতক ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দির মাধ্যমে হত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

অপরদিকে, ত্বকীর পরিবারও মনে করছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া এই হত্যা মামলার তদন্ত এগুবে না। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই হত্যাকা-ের সাথে ওসমান পরিবারের সদস্যরা জড়িত। প্রভাবশালী এই পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতেই র‌্যাব তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করছে।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ শহরের কালির বাজার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শহরের শীতলক্ষ্যা নদীর শাখাখাল কুমুদীনি থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামী করে মামালা দয়ের করেন। এ হত্যাকা-ের ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠে। ৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জে নাগরিক কমিটির ব্যানারে স্বতস্ফূর্ত হরতাল পালন করে নগরবাসী। ১৩ মার্চ পুলিশ সুপারের কাছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনকে অভিযুক্ত করে অবগতিপত্র দাখিল করেন রফিউর রাব্বি।

সূত্র জানায়, ত্বকীর মামলার তদন্ত নিয়ে পুলিশ গড়িমসি শুরু করলে হাইকোর্টে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেন। বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৮ মে উচ্চ আদালত মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। পরে র‌্যাবের কাছে মামলার আলামত ও কাগজপত্র হস্তান্তর করে পুলিশ। র‌্যাবের এএসপি রবিউল ইসলাম মামলাটি তদন্তভার পান।

হত্যাকা-ের পর পরই পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইউসুফ হোসেন লিটন, রিফাত বিন ওসমান ও সালেহ রহমান সীমান্তকে গ্রেফতার করে। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে র‌্যাব সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রোমর ও অয়ন ওসমানের সহযোগী সাইফুদ্দিন জ্যাকিকে গ্রেফতার করে। এরপর হতাকা-ের দায় স্বীকার করে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রোমর, সালেহ রহমান সীমান্ত ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। ২০১৩ সালের ১২ নবেম্বর আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে সুলতান শওকত ভ্রোমর স্বীকার করেন, রাত নয়টার দিকে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে চাষাঢ়া শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের সামনে থেকে ইউসুফ হোসেন লিটন, কালাম সিকদার ও আজমেরী ওসমানের ড্রাইভার জামসেদসহ তিনি ত্বকীকে উঠিয়ে শহরের কলেজ রোডে অবস্থিত আজমেরী ওসমানের উইনার ফ্যাশন নামের টর্চার সেলে নিয়ে যান। সেখানে রাতে আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে গজারির লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয় ত্বকীকে। এক পর্যায়ে ত্বকী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কালাম সিকদার ত্বকীর বুকের উপর বসে গলাটিপে তার হত্যা নিশ্চিত করে। পরে গভীর রাতে ত্বকীর লাশ একটি বস্তায় ভরে আজমেরী ওসমানের গাড়িতে তোলা হয়। গাড়িটি চালান জামসেদ। ড্রাইভারের পাশে বসেন ভ্রোমর, আর পেছনের সিটে বসেন ইউসুফ হোসেন লিটন, সীমান্ত ও কালাম সিকদার। কালিরবাজার এলাকায় গিয়ে নৌকায় তুলে কুমুদিনী খালে ফেলে দেয় ত্বকীর লাশ। পরে তারা আজমেরী ওসমানের অফিসে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে যার যার বাড়িতে চলে যান।

২০১৪ সালের ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার এক বছর পূর্তিতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে ওই সময়ে এই হত্যাকা-ের তদন্তের অগ্রগতি মিডিয়ার কাছে তুলে ধরেন র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ত্বকী হত্যার তদন্তের খসড়া অভিযোগপত্র তখন সংবাদকর্মীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। র‌্যাবের দাবি অনুযায়ী, আজমেরী ওসমানের নির্দেশে চাষাঢ়া শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের সামনে থেকে তুলে নিয়ে ত্বকীকে পিটিয়ে ও গলাটিপে হত্যা করে। পরে তার লাশ কুমুদিনী খালে ফেলে দেয়া হয়।

এদিকে সুলতান শওকত ভ্রোমর তথ্য গোপন করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান। যদিও পরবর্তী সময়ে তার জামিন বাতিল করেছেন উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ। একইভাবে সাইফুদ্দিন জ্যাকি ও রিফাত বিন ওসমান আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। এছাড়া ইউসুফ হোসেন লিটন ও সালেহ রহমান সীমান্ত কারাগারে। তবে কালাম সিকাদারের কোনো খোঁজ মেলেনি।

অদৃশ্য সুতোর টানে আটকে আছে ত্বকী হত্যার বিচার

ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি ধারণা করছেন, ত্বকীকে চাষাঢ়া সায়েম প্লাজা মার্কেটের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে তুলে নিয়ে যায় শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ। বিষয়টি মরহুম সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান ও আজমেরী ওসমানের কথোকপনে উঠে আসে। ওই কথোপকথন থেকে জানা যায়, নাসিম ওসমান আজমেরী ওসমানকে জিজ্ঞাসা করছেন, কাজটি কে করেছে? জবাবে আজমেরী ওসমান বলেন, ছোটজন। ছোটজন মানে অয়ন ওসমান। আজমেরী ও নাসিম ওসমানের কথোকপনের রেকর্ড তদন্তকারী সংস্থার কাছে আছে বলে দাবি করেন রফিউর রাব্বি।

রফিউর রাব্বি বলেন, ২০১৪ সালের ৬ মার্চ র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জয়িাউল আহসান সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন, ত্বকী হত্যার তদন্ত শেষ পর্যয়ে রয়েছে। শিগগির অভিযুক্ত আজমেরী ওসমানসহ দোষিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হবে। কিন্তু এ ঘোষণার পর র‌্যাবের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এ ঘোষণা দেয়ার পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও র‌্যাব হত্যাকা-ের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেনি।

রফিউর রাব্বি অভিযোগ করেন, মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রভাহিত করার জন্য আজমেরী ওসমানের দুই চাচা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সরকারের উচ্চ মহল থেকে র‌্যাবের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ত্বকী হত্যার তদন্ত থমিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, “শুধু তদন্ত বন্ধ রেখেই তারা ক্ষান্ত হননি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান বিভিন্ন সভা সমাবেশ ত্বকী হতাকা- সম্পর্কে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে তারা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন।” তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি মানুষ জানে কারা ত্বকীতে হত্যা করেছে।” 

রফিউর রাব্বি বলেন, “সংবাদ মাধ্যমে দেয়া খসড়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে রাত নয়টার দিকে চাষাঢ়া শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র থেকে ত্বকীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ত্বকী বিকেল চারটার দিকে বাসা থেকে বের হয়। বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত ত্বকী কোথায় ছিল তা তদন্তে স্পষ্ট উঠে আসেনি।” তিনি দাবি করেন, আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানকে গ্রেফতার করলেই এ সময় ত্বকী কোথায় ছিল তা বেরিয়ে আসবে। তিনি তাদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।

রাফিউর রাব্বি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করে বলেন, “ওনার নির্দেশ ছাড়া ত্বকী হত্যার তদন্ত আর সামনের দিকে এগুবে না।” এ হত্যাকা-ের তদন্ত দ্রুত শেষ করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কামনা করেন ত্বকীর বাবা।

২১ বিশিষ্ট জনের বিবৃতি

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চেয়ে দেশের ২১ জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি পহেলা মার্চ বুধবার এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা বলেন, গত ৩ বছর আগে ত্বকী হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ হত্যার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের একটি খসড়া অভিযোগপত্র প্রদান করেছেন। কিন্তু অদ্যাবধি সে অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করা হয় নাই। আমরা দ্রুত অভিযোগপত্র প্রদানের জন্য ও এ নির্মম হত্যাকা-ের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করার জন্য প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ প্রদানের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন, আহমদ রফিক, ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. সনজীদা খাতুন, কামাল লোহানী, অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক, অধ্যাপক যতীন সরকার, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. হায়াৎ মামুদ, ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ আবুল মকসুদ, অধ্যাপক শান্তনু কায়সার, ড. সফিউদ্দিন আহমদ, ডা. সারোয়ার আলী, ড. মালেকা বেগম, অধ্যাপক শফি আহমেদ, মামুনুর রশীদ, আয়েশা খানম, মফিদুল হক, অধ্যাপক এম এম আকাশ ও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ