ঢাকা, রোববার 05 March 2017, ২১ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বাধীনতার মাস

সাদেকুর রহমান : সে সময়কার পূর্ববাংলার স্বাধীনতা-উন্মুখ সাড়ে সাত কোটি তেজোদীপ্ত মানুষের গহীন মনের স্পৃহাজাত উত্তপ্ত আন্দোলনের স্মৃতিবাহী মার্চ মাসের পঞ্চম দিন আজ রোববার। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে একাত্তরের এদিন সারা দেশে পূর্বঘোষিত পাঁচদিনের হরতালের তৃতীয় দিনের মতো সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সর্বাত্মক পালিত হয়। এদিকে এদিন রংপুরে কারফিউ ঘোষণা করা হয়। 

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল তার ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ শীর্ষক পুস্তিকায় বর্ণনা করেন, “জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হয়ে গেছে, এ ঘোষণাটি যখন রেডিওতে প্রচার করা হয়েছে, তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের সাথে কমনওয়েলথ একাদশের খেলা চলছে। মুহূর্তের মধ্যে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ঢাকা স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকান-পাট সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নেমে আসে, পুরো ঢাকা শহর দেখতে দেখতে একটি মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়ে যায়। মানুষের মুখে তখন উচ্চারিত হতে থাকে স্বাধীনতার স্লোগান : ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। বঙ্গবন্ধু ঢাকা এবং সারা দেশে মিলিয়ে ৫ দিনের জন্য হরতাল ও অনির্দিষ্টকালের জন্য অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। সেই অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারকে কোনোভাবে সাহায্য না করার কথা বলেছিলেন এবং তার মুখের একটি কথায় সারা পূর্ব-পাকিস্তান অচল হয়ে গেল। অবস্থা আয়ত্তে আনার জন্য কারফিউ দেয়া হলো- ছাত্র জনতা সেই কারফিউ ভেঙ্গে পথে নেমে এল। চারদিকে মিছিল, স্লোগান আর বিক্ষোভ, সেনাবাহিনীর গুলীতে মানুষ মারা যাচ্ছে তারপরেও কেউ থেমে রইল না, দলে দলে সবাই পথে নেমে এল।” 

আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন এক বিবৃতিতে যেসব সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়নি সেসব অফিসে ৫ ও ৬ মার্চ বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কাজ চালানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু ৫ মার্চ ভারতীয় রেডিও’র এক অপপ্রচারের প্রতিবাদ করেন। এদিন পূর্ব-পাকিস্তানের তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক এক বিবৃতিতে নিরপরাধ জনসাধারণকে হত্যা করার তীব্র নিন্দা করে যেসব ব্যক্তি অধিকার আদায়ের মহান সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন তাদের মাগফিরাত কামনা করেন এবং অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হ¯ন্তান্তরের দাবি জানান।

এদিকে ২ মার্চ সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর সৈন্যদের গুলীবর্ষণে ৫ তারিখ পর্যন্ত দেড় শতাধিক মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। টঙ্গী, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পুলিশের নির্বিচার গুলীতে শত শত লোক আহত হয়। বঙ্গবন্ধু ঢাকা সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানালে সামরিক কর্মকর্তা পিন্ডির নির্দেশে ৫ মার্চ সকল সৈনিককে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা না আসায় সাহেবজাদা জেনারেল ইয়াকুব খান সিগন্যালের (টেলিগ্রাম) মাধ্যমে রাওয়ালপিন্ডিতে ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দেন। সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার সপক্ষে বিভিন্ন সভা-মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার মেহনতী মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে।

স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত রণাঙ্গনের যোদ্ধা লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী তার ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১’ শীর্ষক গ্রন্থে একাত্তরের আজকের দিনের ঘটনাবলী সংক্ষেপে তুলে ধরেন এভাবে- “টঙ্গী শিল্প এলাকায় উত্তাল জনতার ওপর সশস্ত্র বাহিনী গুলী চালিয়ে ৪ জনকে হত্যা করলো, আহত হলো ২৫ জন। এই হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা শহরের সর্বস্তরের জনতা শহীদ মিনারে সমবেত হলো। ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ সেই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আগামী ৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি ঢাকা বেতার থেকে রিলে করার আহ্বান জানালেন। ঐ দিন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান শেখ মুজিবের সাথে তার ধানমন্ডির বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।”

এদিকে, ড. দেলোয়ার হোসেন অনূদিত ও সম্পাদিত ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বৃটিশ মিডিয়ার ভূমিকা’ শীর্ষক গ্রন্থে বহির্বিশ্বেও কীভাবে মুক্তিকামী জনতা একাত্তরের ৫ মার্চ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল তার আংশিক চিত্র পাওয়া যায়। গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়, “ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করে জাতীয় পরিষদ বসার তারিখ স্থগিত করে দেয়ার খবর লন্ডনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে হাজার ছাত্র, যুবক, চাকরিজীবী রাজনৈতিক কর্মী এদিন পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে মিলিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সমবেত জনতা সঙ্গতকারণেই সেদিন বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত ছিল। বিক্ষুব্ধ বাঙালি দূতাবাসে স্থাপিত পাকিস্তানী পতাকায় অগ্নিসংযোগ করে। সঙ্গতকারণে সেদিন থেকেই প্রবাসী বাঙালিদের সাথে পাকিস্তানের সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আন্দোলনের এ পর্যায়ে লন্ডনের প্রবাসী বাঙালি ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা রাখেন।”

অন্যদিকে ভারতীয় ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন তার “১৯৭১: অ্যা গ্লোবাল  হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ (নিউদিল্লী, পার্মানেন্ট ব্ল্যাক ২০১৩)” গ্রন্থে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি গভীর ও পান্ডিত্যপূর্ণ কায়দায় আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “১৯৭১ সালের মার্চজুড়েই শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন উদ্বিগ্ন। শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন সুজাত আলিকে মার্চের ১৪ তারিখে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছিল সংকটাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিশেষ সাহায্যের আবেদন নিয়ে। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আড়াই ডিভিশন সেনাবাহিনী উড়িয়ে এনেছিল পাকিস্তানের পশ্চিম ফ্রন্ট থেকে। ভারতীয় কূটনৈতিক নথিতে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তান যে পরিস্থিতিতে এখন আছে, সেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়। ভারতীয় নেতাদের কাছে একবার সাহায্যের আবেদন পাঠিয়েই মুজিব ক্ষান্ত হননি। ১৪ মার্চের আগে এবং পরে, বহুবার তিনি ভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ৫ এবং ৬ তারিখে ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূত কেসি সেনগুপ্তের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। সম্ভাব্য পাকিস্তানী আক্রমণের মুখে এবং স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় এবং অন্যান্য সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না তা খতিয়ে দেখেছিলেন (পৃ. ৫৫)।”

ভারতীয় নীরবতা মুজিবকে ভীষণ বিরক্ত করেছিল। নতুন দিল্লী প্রথম দিকে কেন মুজিবকে সহযোগিতা করছিল না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন রাঘবন। বইতে তিনি উল্লেখ করেন, “পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন তুঙ্গে ছিল, ভারত তখন ব্যস্ত ছিল নির্বাচন নিয়ে। নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগেই নির্বাচন দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এ ছাড়া পশ্চিম বাংলায় নকশাল আন্দোলন নিয়েও বিপাকে ছিল ভারত সরকার। ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব, ত্রিলোকি নাথ কাউল, একমত হয়েছিলেন, পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে উৎসাহিত করার প্রয়োজন নেই, স্বাভাবিকভাবেই এই বিচ্ছেদকে এড়ানো যাবে না। পররাষ্ট্র সচিবের মত যে অমূলক ছিল না তা বোঝা যায় সে সময়ে ভারতীয় অন্য কর্মকর্তাদের আলোচনা থেকেও। পররাষ্ট্রবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটির একটি সভায় বালরাজ মাধক উপস্থিত সবাইকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং পশ্চিম বাংলা ভারত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত আসামও ভারত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে... রাশিয়া এবং চীনপন্থীরা এদের মদদ দিচ্ছে। ভারতের গবেষণা সংস্থা ‘র’ তথ্য দিচ্ছিল পাকিস্তানের ভাঙনই অনিবার্য। মুজিবও এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর বাইরে ছয় দফা থেকে বেরোনের কোনো উপায় মুজিবের ছিল না। জাতীয় পরিষদের সভা বাতিলের পর আওয়ামী লীগের সদস্যরা ‘র’ এর কাছে তাদের চাহিদা মোতাবেক মেশিনগান, মর্টার, তিন মিলিয়ন টন খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ, যোগাযোগ উপকরণ, ভারতের ভেতরে দ্রুত যোগাযোগের পরিবহন, ছোট বিমান এবং হেলিকপ্টার, ব্রডকাস্টিং সুবিধাসহ রেডিও ট্রান্সমিটারের চাহিদার কথা জানিয়েছিল (পৃ. ৫৭-৫৮)।”

রাঘবনের মতে, বাংলাদেশীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছে, তাতে যুদ্ধকে জাতীয় মুক্তির লড়াই হিসেবে দেখা হয়েছে। এসব গ্রন্থে গল্প বলা হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ উদ্ভব ও বিকাশের। বেশির ভাগ ভারতীয় গ্রন্থে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে দেখা হয় তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে। এই গ্রন্থগুলোর মতে, যুদ্ধে ভারতীয় বিজয় শুধু পাকিস্তান ভেঙে টুকরোই করেনি, বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে যে আদর্শিক মন্ত্র ছিল তাও এ যুদ্ধ ভেঙে খান খান করে দেয়া হয়। এসব গ্রন্থের বয়ানগুলোই যে শুধু সমস্যাপূর্ণই তা নয়। এসব গ্রন্থে লেখকেরা যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবের কথা বলতে গেলে বিবেচনাই করেননি। এমনকি সবচেয়ে ভালো যে কাজ, সিশন ও রোসের বইতেও, যুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রভাবকে খাটো করে দেখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ভারতীয় এই ইতিহাসবিদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ