ঢাকা, সোমবার 06 March 2017, ২২ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মতো এলএনজিতে কার্যকর হচ্ছে ‘দায়মুক্তির বিশেষ বিধান’

 

কামাল উদ্দিন সুমন : রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মতো এবার দায়মুক্তির বিশেষ বিধান কার্যকর হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস’র (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে। এতে করে বেশী মূল্যে গ্যাস কেনা নিয়ে কোন ধরনের আপত্তি করার সুযোগ থাকছে না। আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে এ নিয়ে কেউ ‘টু’ শব্দও করতে পারবে না। এলএনজির ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান কার্যকর হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রায় ১১টাকা থেকে শুরু করে ২৪ টাকা বেশী ধরে ক্রয় করতে হবে। ভ্যাট ও শুল্ক যুক্ত হলে প্রতি ঘনমিটার এলএনজি গ্যাসের বিক্রিমূল্য পড়বে ১৭ থেকে ৩২ টাকা। অথচ বর্তমানে দেশে গ্যাসের গড় বিক্রিমূল্য ছয় টাকা ৯৬ পয়সা।

সূত্র জানায়, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সর্ব মহলের আপত্তি থাকার পরও গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হয়েছে। এ বিষয়টি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে একই সাথে দুই ধাপে বাড়ানো হয়েছে আবাসিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতের গ্যাসের দাম।

এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক চড়া দাম। বর্তমানে এর মূল্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থারমাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ৭-১০ ডলার। যদিও উচ্চদামের কারণে এলএনজি নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি উঠেছে। এজন্য উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানিতে দেওয়া হচ্ছে দায়মুক্তির বিশেষ বিধান। এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হবে রেন্টাল ও কুইট রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রযোজ্য ২০১০ সালের আইনটি। এলএনজি আমদানির পুরো প্রেক্ষাপট পরিকল্পিতভাবে তৈরি এমন মন্তব্য করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি করে তা মেটানোর জন্য উচ্চমূল্যের রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। এখন গ্যাসের ক্ষেত্রেও প্রায় একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর হতে চললেও এখনও গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি। অথচ এ সময়ের মধ্যে প্রচুর সংযোগ দিয়ে চাহিদা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। এখন তা মেটানোর জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এলএনজি আমদানিতে এ ধরনের দায়মুক্তি এ খাতে প্রতিযোগিতা হ্রাস করবে। এতে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দরে গ্যাস কেনা হবে। অথচ কোনো ধরনের জবাবদিহি থাকবে না। আর জনগণকে এর বোঝা বহন করতে হবে। উচ্চদামে গ্যাস কিনতে হবে, যার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানো শুরু হয়ে গেছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে এলএনজির মূল্য নির্ধারণ কৌশল গত শনিবার স্টেকহোল্ডার মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে নুন্যতম ১৭ টাকায় গ্যাস কেনার বিরোধিতা করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সঙ্গে বাহাসে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

সূত্র জানায়, এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে জ্বালানি বিভাগ। ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি কেনায় এরই মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের এক্সিলারেট এনার্জি দৈনিক সরবরাহ করবে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর বেসরকারি কোম্পানি সামিট জোগান দেবে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৮ সালে এ গ্যাস যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে।

এর বাইরে কাতার থেকে এলএনজি আমদানির জন্য সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। কাতার সরকার মনোনীত রাসগ্যাসের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি সম্পাদন করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশে এলএনজি রফতানির জন্য ওমানের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি, ইন্দোনেশিয়ার পেট্রোমিনাসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা প্রস্তাবে বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।

বৈঠকে জানানো হয়, এলএনজি চাহিদার একটি অংশ স্পট মার্কেট থেকে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর আওতায় কেনা হবে। এর অধীনে জরুরি ভিত্তিতে কেনা এ গ্যাসের জন্য কোনো জবাবদিহিতা করতে হবে না। এছাড়া এলএনজি আমদানির জন্য আদালতে কোনো ধরনের মামলার সম্মুখীন হতে হবে না।

সূত্র বলছে, ২০১০ সালে দায় মুক্তির আইনটি দু’বছরের জন্য প্রণয়ন করা হয়। পরে এর সময়কাল কয়েক দফা বাড়ানো হয়। মূলত এ আইনের অধীনেই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যতীত প্রতি ঘনমিটার দেশী প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় চার দশমিক ৩০ টাকা। শুধু ভ্যাট যোগ করলে এর মূল্য পড়ে পাঁচ টাকা ২৫ পয়সা। এর সঙ্গে এসডি যুক্ত করে প্রতি ঘনমিটারের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ৯ টাকা ৫৫ পয়সা। ভর্তুকি প্রদানের পর গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি হয় গড়ে ছয় টাকা ৯৬ পয়সায়। জুনে তা বেড়ে দাঁড়াবে সাত টাকা ৬৪ পয়সা।

সূত্র মতে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে জাতীয় গ্রিডে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি যোগ হবে। ১০ ডলার দরে এলএনজি কেনা হলে ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে ১৪ টাকা ৩২ পয়সা। এর সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে এলএনজির কর ও ভ্যাট যুক্ত হয়ে এর বিক্রিমূল্য দাঁড়াবে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা। আর সাত ডলার দরে এলএনজি কেনা হলে ঘনমিটার প্রতি গ্যাসের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে ৯ টাকা ২১ পয়সা। এর সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে এলএনজির কর ও ভ্যাট যুক্ত হয়ে বিক্রিমূল্য দাঁড়াবে ১৭ টাকা ৪৩ পয়সা।

সালমান এফ রহমান বলেন, বর্তমানে ছয় টাকা ৯৬ পয়সা দরে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। এলএনজির জন্য তা আড়াইগুণ হয়ে গেলে শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। আর ১৭ টাকা দরে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই গ্যাস কিনতে রাজি হবে না। এমনকি কোনো ফাইভস্টার হোটেলও এ দরে শেয়ার কিনবে না।

সালমান এফ রহমান বলেন, বর্তমানে সরকার প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে তিন টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। আর এলএনজি আমদানির পর তাও তুলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এলএনজিতে ভর্তুকি না দিলে কেউ এ গ্যাস কিনবে না। এছাড়া ভারত বা পাকিস্তানে গ্যাসের ওপর কোনো আমদানি বা সম্পূরক শুল্ক নেওয়া হয় না। বাংলাদেশে কেন এটা নেওয়া হচ্ছে, তাও বোধগম্য নয়।

তবে এ বক্তব্যের জবাবে জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, এলএনজির দাম কম রাখার জন্য গ্যাসের ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে এনবিআরের সঙ্গে শিগগিরই বৈঠক করা হবে। আর ভর্তুকির বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে। এজন্য অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআরকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করা হবে। তার নির্দেশনা ছাড়া এলএনজিতে ভর্তুকির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, আগামী বছরই জাতীয় গ্রিডে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে এলএনজি থেকে। এজন্য এখনই সম্ভাব্য দাম নির্ধারণ করে রাখতে হবে। তা না হলে এলএনজি এনে বিপাকে পড়তে হবে। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ