ঢাকা, মঙ্গলবার 07 March 2017, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সমঅধিকারের বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারী

কিদুদিন ধরে ফেইসবুক ভাইরাল চট্টগ্রামের নারী রিকশাচালক ‘জেসমিন আক্তার’। তিন সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে দৈনিক উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই পেশা। এই পেশা বেছে নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান যে, অন্যান্য পেশায় কাজ করে সঠিক সময়ে বেতন না পাওয়ায় সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিমর্মতা ও শ্রম বৈষম্যের বাস্তব প্রমাণ তিনি। যদিও সবার আলোচনার বিষয় এখন ভিন্ন কিছু। বিশেষ করে নারী ক্ষমতায়নের নামে যারা নারী-পুরুষের সমশক্তির দাবি করেন তাদের কাছে তিনি এখন অনন্য দৃষ্টান্ত।
রিকশাচালক জেসমিন আক্তারের কাজের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ রাখছি, কিন্তু এর পরবর্তী ধাপের কথা যখন ভাবতে হয় তখন মর্মাহত হতে হয়। ২০১৫ সালে ফেইসবুকে এ রকম আরেকটি ভাইরাল ছিল বাগেরহাটের ভ্যানচালক নাজমা আক্তার। নিজের চুল ছোট করে, আকৃতি পরিবর্তন করে, পুরুষের পরিচয় নাজমূল হাসান নাম নিয়ে ভ্যান চালাতেন তিনি। কিন্তু অবশেষে তার পরিণতি কি হলো?! পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবৈধ লালসার শিকার হয়ে মা তিনি। বিচিত্র সংবাদ হিসেবে সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পায় ঘটনাটি। পাঠরাও খুব আকর্ষণ নিয়ে পড়েন ‘পুরুষ ভ্যানচালকের বাচ্চার জন্ম’। নারীর সম্মান সেদিন হাসিঠাট্টার উপকরণ হয়েছিল।
এটা সত্য যে কিছু কিছু কাজ আছে যেটা নারীরা চেষ্টা করলে পুরুষের মতো করতে পারে। কিন্তু আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় তার যে নির্মম পরিণতি হয় তার দায়টা কাদের? যারা সমঅধিকার নিয়ে দাবি জানাচ্ছেন তারা কি এই পরিস্থিতির দায় নিবেন? নাকি যারা সমঅধিকারের স্বীকৃতি দিতে নিজের পাওনা আদায়ে নেমেছেন তারা এর জন্য দায়ী। প্রকৃত বিষয় হচ্ছে স্বাভাবিক চিন্তার বাইরে গিয়ে নারীকে সমান অধিকার দিতে এমনসব আজগুবি চিন্তা ও কাজ করা হচ্ছে যা সাধারণের মাঝে পড়ে না। নারী পুরুষের মতো সব করতে পারে, এটি প্রমাণ করতে ভারতীয় নায়িকা ‘ঋতুপূর্ণা’ জেন্ডার পরিবর্তন করেছেন, পুরুষের সন্তান জন্ম দেয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। নারীর স্বকীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে পুরুষের আদলে পুরুষের সমকক্ষ বানাতে বৃথা চেষ্টা করতেই ব্যস্ত নারীবাদী ও সমঅধিকার বাদীরা।কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা বিধানে তারা রীতিমতোই ব্যর্থ বলা যায়। চুল ছোট করে ফতুয়া প্যান্ট পরে পুরুষের রূপ ধারণ করার চেষ্টারত সমমনা বা সমঅধিকারবাদীরা ঘুরপাক খাচ্ছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মরীচিকার ফাঁদে।
১৩ মার্চ ২০১৬ গণমাধ্যমের চোখে তারকা হয়ে আসেন ‘শামসুন্নাহার শতাব্দী’। সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ‘ওবায়দুল কাদেরকে’ নারীদের জন্য আলাদা বাসের দাবি জানায় দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া, শতাব্দী। তার দাবির ভাষা ছিল- “বাসগুলোতে সিট নেই বলে নারীদের উঠতে দেয়া হয় না। কন্ডাক্টর বলেন, আপনাদের উঠতে দেয়া যাবে না। তখন স্কুলে আসতে দেরি হয়ে যায়। আবার একইভাবে বাসায় ফিরতেও দেরি হয়। কখনো কখনো ক্লাসও মিস্ হয় তাহলে মহিলাদের জন্য কী আলাদা বাসের প্রয়োজন নেই?” সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শতাব্দীর জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু শতাব্দীর দাবি ছিল ‘মহিলাদের জন্য আলাদা বাস’ কারণ তার মতো এই প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন হাজারো কর্মজীবী। স্কুল-কলেজগামী নারী ও শিক্ষার্থীরা। একই সময়ে একই কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে হলেও তার জন্য বাস দাঁড়ায় না। যদিও কিছু নারীরা প্রয়োজনের তাগিদে ঠেলাঠেলি সহ্য করে ওঠেন কিন্তু তাদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নানা ধরনের ইভটিজিং সহ্য করতে হয়। নারীর জন্য নয়টি বরাদ্দ আসন ড্রাইভারের পাশে এমন একটি স্থানে দেয়া হয়েছে যেখানে ইঞ্জিনের গরমে কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে বসা সম্ভব নয়। অনেক সময় সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া পুরুষদের নানারকম অশ্লীলতার মোকাবিলা করতে হয় তাদের।
অন্যদিকে দেখা যায় সমঅধিকারের বাস্তবতায় জীবনধারনের তাগিদে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর সম্পৃক্ত বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীর শ্রমকে অনেক সস্তায় কেনা যায়। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত বিশ্বে রফতানিমুখী শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলতে নারীর এই সস্তাশ্রম বিদেশী পুঁজিকে আকৃষ্ট করছে। বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ ও সস্তাশ্রমের জায়গায় নারী শ্রমিকের অন্তর্ভুক্তি লক্ষণীয়। পরিসংখ্যানে দেখা যয় ৭৫% গার্মেন্ট কর্মী নারী, এছাড়াও প্লাস্টিক পণ্য তৈরি, চামড়া শিল্প, জাহাজভাঙা শিল্পের মতো বিপজ্জনক কাজ, ইটভাটা, ইটভাঙা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এই ক্ষেত্রগুলোতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বেশি। কিন্তু প্রত্যেকটি কর্মক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষের সমান কাজ করেও পুরুষের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছেন একজন নারী শ্রমিক।
২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মৌলভীবাজারের চা বাগানে নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানতে পারি তাদের দৈনিক বেতন ৭৩ টাকা অপরদিকে একজন পুরুষ চা-শ্রমিক পায় ৮৩ টাকা। একই কাজ একই সমান চা-পাতা উত্তোলন কিন্তু বেতনে বৈষম্য।
হয়তো এটাই বলা হবে বিসিএস, প্রাইমারি শিক্ষিকা নিয়োগ নারীর জন্য আলাদা কোটা করেছে সরকার। কিন্তু সেখানেও ভিন্নরকম বৈষম্য লক্ষণীয়। সেটি হলো- জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বৈষম্য, লবিংসহ নানা কিছু। হিজাবধারী নারী নিজস্ব যোগ্যতায় ভাইভা পর্যন্ত গিয়ে আর অগ্রসর হয় না। কারণ কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি তাকে সৌন্দর্য ও বিতরণ করতে হয়। তাই চাকরি পান সুন্দরী ও সমঅধিকারমনা রুচিশীল বাঙালি নারী অথবা পুরুষের আদলে বেশভুষাধারী নারীরা। কপালে টিপ, শাঁখা-বালা, সিঁদুর পরে একজন হিন্দু নারী কাজ করার সুযোগ পেলেও হিজাবধারী মুসলিম নারী এখানে চক্ষুশূল ও বিরক্তির উদ্রেগকারী। বড় বড় পদগুলোতে নারীর আসন শূন্য। কারণ নারীদের তারাও কমবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মনে করেন।
নিউজরুমসহ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সম অধিকার, নারী পণ্যকরণ ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু যখন কোনো মন্ত্রী-এমপি বা বড় পর্যায়ের কেউ প্রতিষ্ঠানে আসেন তখন তাদের ফুল দিয়ে বরণ করতে প্রয়োজন ফুলের পাশাপাশি সুন্দরী নারী বা ছাত্রীদের সাজুগুজু করা হাসোজ্জ্বল চেহারা। নারী পণ্যকরণ ধারণাটা তখন একেবারেই মেকি হয়ে যায়।
নামী দামী ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলো পণ্যের মার্কেট করতে নারীর সৌন্দর্যকে ব্যবসার মূলধনের সাথে যোগ করেছেন। ক্লোজআপ ওয়ান, চ্যানেল আই, লাক্স সুপার স্টার ইত্যাদি নানা নামে নারীর সম্মান এখন নিলামে। কিন্তু কোনো সুন্দর পুরুষকে পণ্যের মডেল হতে দেখা যায় না। বরং শক্তিমত্তা দেখাতে হবে এমন পণ্য ইস্পাত, লোহা, রড, সিমেন্ট গাড়ির বিজ্ঞাপনে পুরুষদের দেখা যায়। শুধু সুন্দরীদের পণ্য করছেন তা কিন্তু নয়। কালোদের জন্য আরেকটা সুসংবাদ এনেছেন ‘লাক্স’ তাদের নতুন শ্লোগান ‘ফর্সা মানে সুন্দর নয়, ফ্রেশ মানেই সুন্দর’ সুন্দরের সংজ্ঞা পরিবর্তন হলেও মেয়েদের কিন্তু সুন্দর হতেই হবে। সমঅধিকারের এটাই নাকি বাস্তবতা।
এক স্কুলের বাচ্চার সাথে গতকাল রাস্তায় যেতে যেতে কথা হলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা-মা কি করেন? সে বললো বাবা ব্যবসা করেন, মা কিছুই করেন না। তাকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের জন্য কে খাবার বানায়, কে তোমাকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যায়? সে বললো আমার মা। তাহলে কি তোমার মা কিছুই করেন না? ছোট বাচ্চার পক্ষে এটি বোঝা কঠিন, এটি ঐ বাচ্চার নির্বুদ্ধিতা নয় বরং এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতা।
যারা সমঅধিকারের শ্লোগানে নারীর শ্রম সস্তায় কিনতে চায় তারা এটিই প্রমাণ করতে চায় যে, ‘শুধু কর্মক্ষেত্রে আসাই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের বাদবাকি নারীরা যারা কর্মক্ষেত্রে আসছে না তারা কোনো কাজ করেন না। অথচ উন্নত বিশ্বে ফ্যামিলি প্লানিং চাইল্ড কেয়ার, হেলথ্ কেয়ার খুবই ডিমান্ডেবল পেশা।
যদিও নারীরা গৃহের কাজকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে নারীবাদীরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। ‘ধ্রুপদী নারীবাদীদের দাবি ‘নারীর গৃহের কাজ অনুযায়ী নারীকে পারিশ্রমিক দেয়া হোক’ তাদের কথা হলো পুরুষ যেমন বাইরের কাজ করে পারিশ্রমিক পায়, নারী কেন ঘরের কাজ করে পারিশ্রমিক পাবে না।
তাদের এই দাবি তখনই যুক্তিযুক্ত হতো যখন পুরুষটি শুধুমাত্র তার একার জন্য উপার্জন করতো। যেহেতু সে পরিবারের সম্মিলিত ব্যয়ের জন্যই এই টাকা উপার্জন করে এবং নারী একই পরিবারের জন্যই শ্রম দেয় তাই আলাদা টাকায় এর মূল্যায়ন করা একটা জটিলতা বা অপ্রয়োজনীয় বিষয়। তবে জিডিপিতে এখনো নারীর গৃহের শ্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ ৮ কোটি নারীর প্রতিদিনের পারিবারিক কাজকে কোনো কাজ মনে করে না বাংলাদেশের অর্থনীতি।
অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের চিত্র ও ভিন্নরকম। নারীরা পাচ্ছে না মাতৃত্বকালীন ছুটি, যে কোনো সময় চাকরি চলে যাওয়ার ভয়, খারাপ কর্মপরিবেশ, যৌন হয়রানি, অত্যন্ত সীমিত দরকষাকষির মাধ্যমে কাজের সুযোগসহ নানারকম হয়রানি ও অমর্যাদার শিকার হন তারা।
নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীবাদীদের দাবি- ‘মূলধারায়’ নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তবে এটি স্বীকার করতেই হয় মূলধারায় নারীর অবস্থানে বাংলাদেশ এগিয়ে বিরোধীদল, সরকারিদল দুই জায়গায় নারী প্রধান। প্রত্যেক জেলা ইউনিয়নে নারীর অংশগ্রহণ অনেকটা এগিয়েছে বলতে হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নারীর উন্নয়ন ও নারীর মর্যাদা আদৌ কী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর কারণ নারীবিষয়ক প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত হয়েছে ইসলামকে বাদ দিয়ে। সমস্যাগুলো সবাই কমবেশি চি‎িহ্নত করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু সমাধানের সঠিক পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে সবাই ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন।তারা যেভাবে নারীকে পুরুষের মতো সমান ও সমান্তরাল ভাবতে চাচ্ছেন সেভাবে নারীর স্বকীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করে পুরুষতন্ত্র বা পৌরষত্বের জয়গান গেয়েছেন। সবার অলক্ষ্যে তারা নারীত্বের বৈশিষ্ট্যকে অপমানিত করছেন। জটিলতায় না গিয়ে নারীর প্রকৃত মর্যাদা, প্রকৃত অবস্থান উদঘাটন করার পাশাপাশি মর্যাদা প্রতিষ্ঠা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে সমঅধিকারবাদী ও নারীবাদীদের। কারণ তাদের পূর্বে নেয়া সকল পদক্ষেপ ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
লেখিকা: ফরিদা খানম ফাতিহা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ