ঢাকা, বুধবার 08 March 2017, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৮ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হলো না হুদা সাহেব

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : আমি আগাগোড়া বিশ্বাসী মানুষ। আবার মানুষকে বিশ্বাস করতে পছন্দ করি। তাতে যে সব সময় ন্যায্যতা পেয়েছি, এমন দাবি করতে চাই না। যাদের খুব বিশ্বাস করেছি, তারা নিভৃতে পেছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা করেছে। আবার এমন মানুষও দেখেছি, যাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু নীরবে কেবলই উপকার করে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।  আবার আমি মানুষকে বদলে যেতেও দেখেছি। চরম দুর্নীতিগ্রস্ত লোককে দেখেছি, জীবনের শেষ দিকে এসে চরম সততার পরিচয় দিয়ে গেছেন। সত্য, ন্যায়, ন্যায্যতা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মানুষের ভেতরে এই পরিবর্তনগুলো ঘটে। হয়তো এটাই মানুষের মানবিক মূল্যবোধ বা মানবিকতা। আবার এমন মানুষও দেখেছি, যাদের কল্ব একবারে সীল করা। এরা আমৃত্যু কেবলই শয়তানের দোসর হিসেবে কাজ করে গেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশন ও কমিশনারদের খুঁজে বের করার জন্য যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছিল, তখনই সে কমিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তারা সবাই ছিলেন সরকারের লোক ও সরকারের সুবিধাভোগী। এদের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। অনেকেই ভেবেছিলেন, যাক, এই সার্চ কমিটিতে অন্তত একজন নিপাট ভদ্রলোক তো আছেন, হোন না তিনি আওয়ামী ঘরানার শিক্ষক। কিন্তু দেখলাম, তার ভেতরেও সে ব্যক্তিত্ব নেই। যাকে এই সার্চ কমিটি সিইসি হিসেবে মনোনয়ন দিল, তিনি ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগার। সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী, ‘জনতার মঞ্চে’র লোক। শেষ পর্যন্ত চাকরিচ্যুত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তার চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে সচিবের মর্যাদা দেয়। কিন্তু যখন তাকে অবসর দেয়া হয়েছিল, তখন তিনি যুগ্ম-সচিব মাত্র ছিলেন। সিইসি হিসেবে মনজুরুল ইসলামও তাকেই সমর্থন দিয়েছেন। কারণ রাষ্ট্রপতি যখন সিইসি ও কমিশনারদের নিয়োগ দিলেন তখন মনজুরুল ইসলাম সে বিষয়ে তার কোনো ভিন্নমত ছিলÑ এমন কথা বলেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, সুশীল সমাজ থেকে কাউকে নিয়োগ না দেয়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন। অর্থাৎ  শিক্ষক হিসেবে অবসরের পর মনজুরুল ইসলামেরও সরকারের কাছে কিছু চাইবার আছে।
নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মুহাম্মদ নূরুল হুদা সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন যে, তিনি এখন থেকে আর কোনো দলের নন। আর কারও অধীনও নন। তিনি কাজ দিয়েই প্রমাণ করবেন যে, তিনি নিরপেক্ষ। কিন্তু গত ৬ মার্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ১৮টি উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, তাতে প্রমাণিত হয়নি যে, তিনি নিরপেক্ষভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এই নির্বাচনে কারচুবি, ভোট ডাকাতি, এজেন্টদের বের করে দিয়ে গণহারে সীল মারা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখানে রকিবউদ্দিন কমিশনের মতোই নির্বিকার ছিল নির্বাচন কমিশন। একেবারেই চুপ করে ছিলেন তারা। সে রকমই অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলের বিভিন্ন প্রার্থী। এ ক্ষেত্রে শুধু বিএনপিই নয়, সরকারে আসীন ১৪ দলের প্রধান শরীক দল জাতীয় পার্টিও একই ধরনের অভিযোগ করেছে।
এই নির্বাচন এতোটাই প্রহসনমূলক হয়েছে যে, সরকার সমর্থক মিডিয়া কার্যত নির্বাচনের খবর এড়িয়ে গেছে। ১৮টা উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচন কম তো নয়। কিন্ত সরকার সমর্থক মিডিয়া তার খবর প্রথম বা শেষ পাতায়ও প্রকাশ করেনি। তবে একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘ভোটারশূন্য বেশির ভাগ কেন্দ্র প্রকাশ্যে সীল/ নির্বাচন সুষ্ঠু, ভোটার কম : ইসি সচিব’। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের ১৪টি উপজেলা পরিষদ (উপনির্বাচনসহ) ও ৪টি পৌরসভা নির্বাচনে সোমবার বেশির ভাগ কেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য। এ ছাড়া বেশ কিছু কেন্দ্রে জাল ভোট, প্রকাশ্যে সিল, কেন্দ্র দখল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাল ভোট দেয়ার অভিযোগে তিন আওয়ামী লীগ কর্মীকে কারাদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাঁচ দিন আর ৭ দিন। এও যেন একটা লোক দেখানো ব্যবস্থা। নানা অনিয়মের অভিযোগ করে কয়েকটি স্থানে নির্বাচন বর্জন করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। সবচেয়ে বেশি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে। এখানে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের প্রকাশ্যে সীল মারতে দেখা যায়। এছাড়া পোলিং এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। অনিয়মের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ছবি মুছে দেয়া হয়।
ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কথা স্বীকার করে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। সার্বিক উপস্থিতি ৬০ শতাংশের কম। এ নির্বাচন উপলক্ষ্যে কমিশন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেছিল। তাই কোথায়ও কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। কোনো অভিযোগও আসেনি। এ জন্য নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য একেবারে গৎবাঁধা। প্রকাশ্যে সীল মারা হলো, এজন্টদের বের করে দেয়া হলো, তারপরও সচিব বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। রকিবরাও তাই বলতেন। তবে সিইসি বা কোনো কমিশনার ঝট করে যে এখনও কোনো মন্তব্য করে বসেননি, সেটাই ভাগ্যের কথা। দেখা যাক, তারাও রকিবউদ্দিনের মতো একই বক্তব্য নিয়ে এসে মিডিয়ার সামনে হাজির হন কিনা।
এর আরও চিত্র আছে। খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলা নির্বাচনে প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ভোট জালিয়াতি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি প্রার্থী। গৌরনদী উপজেলায় বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মনজুর হোসেন মিলন অভিযোগ করেছেন, তিনি ৪৫টি ভোটকেন্দ্রের সবগুলোতে এজেন্ট দিয়েছিলেন। রোববার রাতে ও সোমবার সকালে সরকারি দলের স্থানীয় ও বহিরাগত ক্যাডাররা তাদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দেয় ও ভয় দেখায়। হুমকি উপেক্ষা করে কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টরা যায়। কিন্তু সরকারি দলের ক্যাডাররা তাদের মারধর করে বের করে দেয়। বাবুগঞ্জ ও মুলাদি উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তিন শতাধিক ক্যাডার নিয়ে ৭টি ভোটকেন্দ্র দখল করে নৌকা মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে। দৈনিক যুগান্তর ও নয়াদিগন্তের সাংবাদিকসহ কয়েকজন সাংবাদিক দুপুর দেড়টার দিকে চন্দ্রহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে চাইলে দায়িত্বরত এএসআই কামাল তাদের বাধা দেন। এ সময় আওয়ামী ক্যাডাররা সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।
একই ধরনের খবর এসেছে পাবনার সুজানগর ও ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাচনের। এই দুই উপজেলায়ও সরকার দলীয় প্রার্থীর বাইরে আর কাউকে এজন্ট দিতে দেওয়া হয়নি। ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আগে থেকেই তাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। সরকার দলীয় প্রার্থীর সন্ত্রাসী ক্যাডাররা গত কয়েক দিন ধরে বিএনপি নেতাদের বাড়ি  বাড়ি গিয়ে হামলা চালিয়েছে। তারা কেন্দ্র দখল করে নিজেরাই দফায় দফায় জাল ভোট দিয়েছে। বিরোধী দলীয় সদস্য-কর্মীরা জীবনের ভয়ে মাঠেই নামতে পারেনি। আর এই ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ ভোটাররাও ভোট দিতে কেন্দ্রে হাজির হতে সাহস পায়নি। পটুয়াখালির রাঙ্গাবালিতেও ঘটেছে একই ধরনের ঘটনা। সেখানে চেয়ারম্যান পদে উপনির্বাচনে ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে সাংবাদিক সম্মেলন করে পুনঃনির্বাচন দাবি করেছেন বিএনপি প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন আকন।
সংবাদ সম্মেলনে জাহাঙ্গীর আকন বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের আশ্বাস পেয়ে আমি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেই। নির্বাচনি প্রচারণার শুরু থেকেই আমার কর্মী সমর্থকদের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। সাধারণ জনগণের সমর্থন থাকায় আমি নির্বাচনি মাঠ থেকে উঠে আসিনি। কিন্তু নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে দেখি, বহিরাগততে এলাকা ছেয়ে গেছে। বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। উপজেলার মোট ৩০টি কেন্দ্রের ২৯টিই আওয়ামী ক্যাডাররা দখল করে নেয়। এর আগে ৩ মার্চ মৌডুবি বাজারে নির্বাচনি পথসভায় আওয়ামী লীগের হামলায় আমার প্রায় ৫০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছে। এই ঘটনা নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো অন্যায়ভাবে তারা উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ ৭ জন কর্মী সমর্থককে আটক করেছে। এছাড়াও আমার লোকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তাই তিনি চলমান নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান।
ঘটনাগুলো প্রকাশ্যেই ঘটেছে। কেন্দ্র দখল হয়ে যাচ্ছে। সেখানে নির্বাচন কমিশনের লোক ছিল। তারা কেন নির্বাচন কমিশনকে জানায়নি? সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি? কিংবা কেন তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাননি? ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে সীল মারা হলেও কেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না? কেন ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হলো না? নাকি নির্বাচন কমিশন এসবই হতে দিতে চেয়েছে? তাই যদি হয়, তাহলে এই কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কিছুতেই আশা করা যায় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ