ঢাকা, বৃহস্পতিবার 09 March 2017, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের যাবজ্জীবনে আমি সন্তুষ্ট -খাদিজা

কবির আহমদ, সিলেট: দশে বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলায় শাবি ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম উরফে চাপাতি বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার দুপুরে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা বাংলায় এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশপাশি ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো দুই মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন উক্ত আদালতের বিজ্ঞ বিচারক। 

খাদিজার আউশা গ্রামে সাংবাদিকদের সাথে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে খাদিজা মহান আল্লাহপাকের শোকরিয়া আদায় করে বলেন তিনি এ রায়ে সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশ প্রশাসন ও সকল মিডিয়া কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান খাদিজা আক্তার নার্গিস।

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর পৈশাচিক কায়দায় খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় প্রদান করা হলো। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ পুকুর পাড়ে ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুলের হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। রায় প্রদানকালে বদরুলকে আদালতে হাজির করা হলেও অসুস্থতার কারণে খাদিজা উপস্থিত ছিলেন না। 

সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা ৩২ পাতা বাংলায় লেখা রায়ের আদেশে উল্লেখ করেন, “আসামী বদরুল আলম দঃবিঃ ৩২৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ইহার অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।’’ গত পহেলা মার্চ এই মামলা সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম সাইফুজ্জামান হিরোর আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

আদালতের পিপি এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ আদালতের রায় জানিয়ে বলেছেন, ঘাতক বদরুলকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন আদালাত। এছাড়াও তাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ২ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, মামলায় ৩৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বদরুলের অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

রায় ঘোষনার পর বদরুলের পক্ষের আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান জানান, এ রায়ের বিরুদ্ধে বদরুল উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

মামলার বাদী যা বলেন : বর্বরোচিত এ হামলার ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে বদরুলকে একমাত্র আসামী করে এসএমপির শাহপরাণ থানায় ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর মামলা দায়ের করেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতে তিনি উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বলেন, বদরুলের বিরুদ্ধে এমন রায়ে আমরা খুশি। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট। আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমরা আশা করছি, উচ্চ আদালতে যদি আসামীপক্ষ আপিল করে, তবে সেখানেও এই রায় বহাল থাকবে।

রায় দেয়া হলো বাংলায় : সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস হত্যাচেষ্টা মামলার রায় ইংরেজিতে নয়, বাংলায় দেয়া হলো। এমন তথ্যই জানিয়েছেন আদালতের পিপি এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তিনি জানান, এ মামলার রায় বাংলায় লিখলেন বিচারক। তিনি জানিয়েছেন, আদালতে বাংলার প্রচলন ঘটাতে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এ রায় বাংলায় লেখা হলো।

আদালতে উৎসুক জনতার ভিড় : কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস হত্যাচেষ্টা মামলার রায় শুনতে হাজারো মানুষ সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করতে থাকেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খেতে দেখা যায়। সিলেট মূখ্য মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে জমায়েত হন উৎসুক জনতা।

সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া : বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণায় নাগরিক জীবনে স্বস্তি নেমে আসে। এতদিন যারা তার নৃশংসতার শাস্তি নিয়ে নানা আশংকার দোলাচলে দুলছিলেন, তারা এখন খুশি। গতকাল বুধবার রায় ঘোষণার পরপরই আদালতপাড়ায় কয়েকজন সচেতন নাগরিক তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে স্বস্তির কথা প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ সুরমার বারখলা গ্রাম থেকে রায় শুনতে আসে ব্যবসায়ী বেলাল আহমদ। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, এ রায় শুনে আমি সন্তুষ্ট। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী তানজিনা আক্তার বলেন, আমাদের বোন খাদিজা আপুকে অন্যায়ভাবে আঘাত করেছে ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুল ওরফে চাপাতি বদরুল। মেধাবী তানজিনা বলেন, আমি আশা করছি উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে। সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কানাইঘাটের ষাটোর্ধ আব্বাস আলী আলাপকালে জানান, ন্যায়বিচার হয়েছে। তার নৃশংসতার উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছেন আদালত। এ রায় বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণেই কথা বলেন সমাজকর্মী হাসিনা বেগম (২৮)। তিনি বললেন, অসহায় মেয়েদের ওপর নানা ছলছুতায় যারা নৃশংসতা চালিয়ে নিজেদের পৌরুষত্ব জাহির করতে চায়, আশাকরি তারা এখন আরো সতর্ক হবে। একটি সুন্দর হানাহানিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন। স্কুল শিক্ষিকা এবং খাদিজার প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক নাদিরা বেগম এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের বখাটেদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত। তিনি বলেন, দুনিয়ার জমিনে আদালত বখাটে বদরুলের বিচার করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও যেন আখেরাতেও তার বিচার করেন। কোর্টে পত্রিকা বিক্রেতা আলী হোসেন এ রায়ে পুরোপুরি খুশি নয়। তার ধারণা ছিল বদরুলের ফাঁসি হবে। ‘কি কোপই না দিলো মেয়েটারে! ফাঁসি হলো না!’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর বিকেলে সিলেট এমসি কলেজে পৈশাচিক কায়দায় হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। খাদিজাকে কোপানোর দায়ে ঘটনাস্থল থেকে জনতা শাহজালাল বিশ্ববদ্যিালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলমকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। বদরুলের চাপাতির আঘাতে খাদিজার মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্কেও জখম হয়। খাদিজাকে কোপানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

হামলার পর প্রথমে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ও পরে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় খাদিজাকে। সেখানে ৪ অক্টোবর বিকেলে অস্ত্রোপচার করে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। পরে ১৩ অক্টোবর তার লাইফ সাপোর্ট খোলার পর ‘মাসল চেইন’ কেটে যাওয়া তার ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিন দফা অস্ত্রোপচারের পর শরীরের বাঁপাশ স্বাভাবিক সাড়া না দেয়ায় চিকিৎসার জন্য স্কয়ার থেকে সাভারের সিআরপিতে পাঠানো হয় খাদিজাকে। সিআরপিতে তিন মাসের চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরেন কলেজছাত্রী খাদিজা। এদিকে ঘটনার পরদিন খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩০৭, ৩২৪ ও ৩২৬ ধারায় বদরুলকে একমাত্র আসামী করে শাহপরান থানায় মামলা করেন। ওইদিনই বদরুলকে বহিষ্কার করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ৫ অক্টোবর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন বদরুল। ৮ নবেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর শাহপরাণ থানার এসআই হারুনুর রশীদ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ১৫ নবেম্বর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। ২৯ নবেম্বর আদালত বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। চলতি বছরের গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন খাদিজা। এর মাধ্যমে মামলার ৩৬ সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয় এবং আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গতকাল ৮ মার্চ বুধবার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ। গতকালই ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের যাবজ্জীবন রায় ঘোষণা করেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ