ঢাকা, বৃহস্পতিবার 09 March 2017, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্রিকেটে সন্ত্রাসী হামলা অনেক দেশে হলেও নিষেধাজ্ঞায় শুধুই পাকিস্তান!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হলো পাকিস্তানের লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর বন্দুকধারীর হামলার ৮ম বার্ষিকী। ক্রিকেট ইতিহাসে এটাই যে একমাত্র হামলার ঘটনা তা কিন্তু নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই এরকম হামলা হলেও গত বছর ধরে এর রেশ থেকে মুক্তি পায়নি পাকিস্তান। হামলার পর টেস্ট খেলুড়ে কোন দেশই পাকিস্তানের খেলতে যায়নি। যদিও জিম্বাবুয়ে স্বল্প সময়ের জন্য দেশটিতে খেলতে যায়। নিজেদের দেশে ক্রিকেট আয়োজনে কমতি ছিলনা পিসিবির। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই পাকিস্তানের খেলার আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে কেউ যায়নি। তবে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল পাকিস্তানে খেলেছে। জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত ৮ বছরের আগের সেই হামলার কারণে কেউ পাকিস্তানে যেতে চাচ্ছে না। এমনকি দেশটির ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতেও আপত্তি ক্রিকেটারদের। গত রোববার শেষ হওয়া সদস্য পিসিএল এ অনেক বিদেশী ক্রিকেটারই লাহোরে অনুষ্ঠিত ফাইনালে খেলতে যায়নি।
ক্রিকেটকে বলা হয়ে থাকে ভদ্র ছেলেদের খেলা। কিন্তু এই ভদ্র খেলাতেই বার বার নজর পড়েছে সন্ত্রাসীদের। বার বারই তারা চেষ্টা করেছে ক্রিকেটকে দমিয়ে রাখার জন্য। পৃথিবীতে ক্রিকেটে যত সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে পাকিস্তানকেই বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ২১ এপ্রিল, ১৯৮৭ সাল। শ্রীলঙ্কায় সফররত নিউজিল্যান্ড তিন ম্যাচ সিরিজের টেস্ট খেলছিলো তখন মাঠে। মাঠের বাইরে একটি গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ১০০ জনেরও অধিক মানুষ নিহত হয়। সেই সিরিজ এক ম্যাচ খেলার পরই শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনার কয়েকবছর পর আবারো হামলার শিকার হয় কলম্বো। ১৬ নভেম্বর, ১৯৯২ সাল। একজন তামিল টাইগার সফররত নিউজিল্যান্ডে দলের হোটেলের সামনে আত্মঘাতি বোমা হামলা করলে সেখানে চারজন নিহত হয়। ঘটনার সাথে সাথেই পাঁচজন খেলোয়াড় এবং দলের কোচ দেশ শ্রীলঙ্কা ত্যাগ করে নিজ দেশে ফেরেন। ১১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৬- কলম্বো। অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার বিশ্বকাপের খেলা এক সপ্তাহ পরেই। কিন্তু কলম্বোতে স্টেডিয়ামের কাছাকাছি জায়গায় বোমা হামলায় ৮০ জন মানুষ নিহত হওয়ায় উভয় দলই বিশ্বকাপে খেলতে অনীহা প্রকাশ করে। ২৪ জুলাই, ২০০১- কলম্বো। নিউজিল্যান্ড দল তখন শ্রীলঙ্কা সফরে। কিন্তু খেলা চলার দিনই বিমান বন্দরে এক তামিল টাইগারের আত্মঘাতি বোমা হামলায় ১৪ জন নিহত হয়। পরের দিনের খেলা অবশ্য নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
শ্রীলঙ্কাতে যখন একের পর হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে তখন দেশটির ক্রিকেট নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বোর্ড। তবে তাদের সেইসব ঘটনা আড়ালে নিযে আসে পাকিস্তানে হামলার পর। মে ২০০২, করাচি। ২০০২ সালের মে মাসে পাকিস্তান সফরে ছিলো নিউজিল্যান্ড দল। তাদের অবস্থানরত হোটেলের বাইরে বোমা বিস্ফোরণে ১১ জন ফ্রেন্স ইঞ্জিনিয়ার নিহত হয়। আগস্ট ২০০২, আমেরিকার ৯/১১ তে টুইন টাওয়ার হামলার জেরে অস্ট্রেলিয়া দল পাকিস্তান সফরে অনীহা প্রকাশ করে। পরে অবশ্য সেই ম্যাচটি আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হয়।
শুধু শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানেই নয়, ভারতেও হামলার ঘটনা ঘটে। ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮। নয়াদিল্লীর ব্যস্ত রাস্তায় পাঁচটি বোমা হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়। ৯০ জনের উপরে গুরুতর আহত হয়। এই ঘটনার পরই অস্ট্রেলিয়া দল ভারত সফর থেকে বিরত থাকে। মুম্বাই, ২৬ নভেম্বর ২০০৮। বন্দুকধারীর হামলায় মুম্বাইর হোটেল তাজে ১৭৮ জন মানুষ নিহত হয়। সফররত ইংল্যান্ড দল সাথে সাথেই ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায়।
ক্রিকেটে এত সাব হামলার পরও নিষেধাজ্ঞা আর অনাগ্রহ কেবল পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। দেশটির ক্রিকেট বোর্ড বলছে, তারা তাদের দেশে ক্রিকেট আয়োজনে মরিয়া। দেমটির সাবেক গ্রেটরা বলছেন, এভাবে পাকিস্তান যদি নিজেদের মাঠে সিরিজ আয়োজনে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশটিতে ক্রিকেটার পাওয়া যাবেনা। যতিও তার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। গত ৮ বছরে দেশটিতে তেমন নজরকাড়া কোন ক্রিকেটারের উত্থান ঘটেনি। যার কিংবদন্তি হয়ে আছেন শুধু তারাই ইতিহাস হয়ে থাকছেন। এখন পাকিস্তানে একজন ইমরান খান, জাবেদ মিয়াদাদ, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, ইন জামাম উল হক, রশিদ লতিফ, সাকলায়েন মুস্তাক, শোয়েব আখতারদের পাওয়া যাচ্ছেনা।
আট বছর আগের সেই হামলার রেশ এখনো রয়েই গেল। সম্প্রতি পিএসএল ফাইনালে বিদেশীদের খেলতে অনাগ্রহ দেখেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত পিসিএল এর ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় লাহোরে। এটা দিয়ে ক্রিকেট যেন নতুন করেই জীবন পেতে চলেছে পাকিস্তানের মাটিতে। ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট দলের বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নির্বাসনে গেছে পাকিস্তান থেকে। পিএসএলের ফাইনাল পাকিস্তানে হওয়া মানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফেরা নয়। তবে বিদেশি ক্রিকেটাররা থাকছেন বলে ক্রিকেটের জাঁকজমক অন্তত ফিরছে সেখানে। যে শহরে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর হামলা হয়েছিল, পিএসএলের ফাইনাল হয়েছে সেই লাহোরেই। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ক্রিকেট খেলার জন্য পাকিস্তান কি সত্যিই নিরাপদ? পাকিস্তান যে ক্রিকেট খেলার জন্য নিরাপদ তা প্রমাণ করতে মরিয়া পিসিবি। অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা এড়াতে রীতিমতো যুদ্ধ-প্রস্তুতি নিয়েই পাকিস্তান বোর্ডকে আয়োজন করতে হয়েছে এই ফাইনাল। যদিও যুদ্ধ-প্রস্তুতি মন ভরাতে পারেনি পিএসএল ফাইনালে ওঠা দুই দল কোয়েটা গ্ল্যাডিয়েটরস ও পেশোয়ার জালমির মূল বিদেশি ক্রিকেটারদের। এই ফাইনাল থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন কেভিন পিটারসেন, টাইমাল মিলস, লুক রাইট, নাথান ম্যাককালাম, ক্রিস গেইল, কুমার সাঙ্গাকারা ও কাইরন পোলার্ডের মতো তারকারা। চটজলদি নতুন বিদেশি ক্রিকেটাররা পূরণ করেছেন তাদের জায়গা। তবে সেটি লাহোরের বহুল-আলোচিত এই ফাইনালের গ্ল্যামার বাড়াতে খুব একটা কাজে আসেনি। কেবল বিদেশি খেলোয়াড়েরাই নন, লাহোরের ফাইনাল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে পিএসএলের মূল সম্প্রচার সংস্থাও। সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি ভেন্যু দুবাই, শারজা, আবুধাবি থেকে খেলা সম্প্রচারে তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু লাহোরের প্রসঙ্গ উঠতেই বেঁকে বসেছে তারা। পিসিবির অবশ্য বিকল্প পরিকল্পনা ছিল, তাই নতুন সম্প্রচার সংস্থা খুঁজে নিতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু হালের আধুনিক সম্প্রচারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি লাহোরের ফাইনালে ছিল না। যেভাবেই হোক লাহোরের ফাইনালটা হলো। পাকিস্তানের সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল এই ফাইনালকে ঘিরে। কয়েকদিন আগেই গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের সব টিকিট বিক্রি হওয়ায় মধ্য দিয়েই তা প্রমাণিত হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অতীতের সব রেকর্ডই ভেঙে দিয়েছে। সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য ও পুলিশ মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার নিরাপত্তারক্ষী পাহারায় ছিল পিএসএল ফাইনালে। নিরাপত্তারক্ষীদের পাশাপাশি লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়াম ঘিরে ৩০০ স্বাস্থ্য ও দমকলকর্মী ছিল সরব। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত কাজে লেগে যেতে তাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলেন আরও শ’ খানেক স্বেচ্ছাসেবক। এ ছাড়াও স্টেডিয়াম ঘিরে যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত ছিল ৩০টি উদ্ধারকারী দল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ