ঢাকা, বৃহস্পতিবার 09 March 2017, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৩, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একই জমি দুই ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ!

খুলনা অফিস : খুলনার সোনালী জুট মিলের ব্যবস্থাপক পরিচালক এস এম এমদাদুল হক বুলবুল ঋণের জন্য আবেদন করার আগেই সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তার ঋণ মঞ্জুর করে। ঋণের কাগজপত্র না দিয়ে টাকা উত্তোলনে বাধা প্রদান করায় ওই সময় দুইজন ডিজিএম পদ মর্যাদার কর্মকর্তাদের খুলনা থেকে বদলি করা হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ২২ ফেব্রুয়ারি খানজাহান আলী থানায় সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৮৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে সোনালী জুট মিলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার পর তদন্তে এ সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
সানালী ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখা থেকে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সোনালী জুটমিলের মালিক ও ৫ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খুলনার উপসহকারী পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বাদি হয়ে খানজাহান আলী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলেন, সোনালী জুটমিলের চেয়ারম্যান এস এম ইমদাদুল হোসেন বুলবুল, সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার ডিজিএম নেপাল চন্দ্র সাহা, এসিসটেন্ট অফিসার কাজী হাবিবুর রহমান, প্রিন্সিপ্যাল অফিসার শেখ তৈয়ুবুর রহমান এবং প্রাক্তন ডিজিএম সমীর কুমার দেবনাথ।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, সোনালী জুট মিলটি উত্তরা ব্যাংকের ঋণ খেলাপী থাকার পরও সেই একই মর্টগেজ সোনালী ব্যাংকে দেখিয়ে ২য় দফায় ৮৫ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়। যা সাধারণত ব্যাংকের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা বিরল। কারণ, উত্তরা ব্যাংকে মিলের জমি জামানত হিসেবে রয়েছে। সেই একই জামানত আবার সোনালী ব্যাংককে দেখানো হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরো বলা হয়, বিধি অনুযায়ী আবেদন না করেই ঋণ মঞ্জুর কর হয়। এর আবেদন করার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন পরিচালকরা ২০১০ সালে খুলনা সোনালী জুট মিল পরিদর্শন করেন। অথচ পরিদর্শনের আগে সোনালী ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখার কর্মকর্তারা কিছুই জানতেন না। আর পরিচালনা পর্ষদ সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঋণ প্রদানের ঘটনা খুলনা ব্যাংক পাড়ার ইতিহাসে এই প্রথম ঘটনা। অথচ পরিচালনা পর্ষদের কাউকেই এই মামলায় আসামী করা হয়নি।
দুদক খুলনার উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল হাই জানান, মামলার তদন্তকালে যাদেরই নাম আসবে এই মামলায় তাদের নামেই চার্জশিট দাখিল করা হবে। এজাহারভুক্ত আসামীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি জানান আসামীরা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেছেন।
মামলার বিবরণে আরো উল্লেখ করা হয়, সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের পরিচালক মো. লুৎফর রহমান, কে এম জামাল রোমেল, সাইমুম সরওয়ার কমল, এডভোকেট সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত, মোছা. জান্নাত আরা হেনরী এবং সুভাষ চন্দ্র সিংহ রায়ের সমন্বয় গঠিত একটি কমিটি ২০১০ সালের ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি সরেজমিনে মিল পরিদর্শন করেন। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী চলতি মুলধন বাবদ বিশ কোটি টাকা প্রথম ঋণ মুঞ্জরী দেয়া হয়। এই ঋণ মঞ্জুরীর প্রথম শর্ত ছিল ঋণ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং সম্পাদনা করতে হবে। কিন্তু সেটি সম্পাদনা না করেই টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়ায় এই মামলায় আসামী করা হয় তৎকালীন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নোপাল চন্দ্র সাহা, এসিস্ট্যান্ট অফিসার কাজী হাবিবুর রহমান, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ তৈয়েবুর রহমান ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সমীর কুমার দেবনাথকে। তবে রহস্যজনকভাবে যাদের সুপারিশে এই ঋণ প্রদান করা হয় তাদের বিষয়ে কোন অভিযোগ আনা হয়নি।
তবে তদন্তে ধরা পড়েছে কোন কাগজপত্র ছাড়াই ঋণ উত্তোলনের সুযোগ না দেয়ায় তৎকালীন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার বর্তমান জিএম মোশারেফ হোসেন এবং ড. এজিএম সাকলাইন হোসেনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে অন্যত্র বদলি করা হয়। পরে ডিজিএম নেপাল চন্দ্র সাহাকে খুলনায় বদলি করে আনা হয় এবং এই এমদাদুল হক বুলবুল তদবির করে নেপাল চন্দ্র সাহাকে পদোন্নতির সুপারিশ করে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে খুলনাতে পোস্টিং করান।
সোনালী ব্যাংকের বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার মোশারফে হোসেন স্বীকার করে বলেন, সোনালী জুট মিলের ঋণের টাকা কাগজপত্র জমাদানের আগে টাকা প্রদান না করায় তিনি এবং ড. সাকলাইনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। যে আদেশ ছিল স্ট্যান্ড রিলিজ।
জানা গেছে, সোনালী জুট মিলের ঋণের টাকা গ্রহণ করতে এস এম এমদাদুল হক বুলবুল কোনদিন খুলনার এই ব্যাংকেই আসেননি। তার প্রতিনিধিরাই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন টাকা গ্রহণ করার পর। টাকা নিয়ে পাট ক্রয় করে গুদামে মজুদ করার কথা থাকলেও তিনি আসলে কিছুই করেননি। বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংক খুলনা করপোরেট শাখার বদলি হয়ে আসা ডিজিএম আবু হোসেন শেখ এর সোনালী জুট মিল সরেজমিনে পরিদর্শনের পর।
দুদকের মামলায় বলা হয়েছে, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবু হোসেন শেখ, সহকারী জেনালের ম্যানেজার মো. শহীদুল আলম, এসপিও অভিযুক্ত শেখ তৈয়েবুর রহমান, সিনিয়র অফিসার সেরাফিন মন্ডল ও অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে মিলের গেটম্যান/ নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়া কাউকে উপস্থিত পাননি। নিরাপত্তা রক্ষীরা এই টিমকে অবহিত করেছিলেন অনেকদিন থেকে মিল বন্ধ আছে। এই টিম আরো উল্লেখ করেন যে, প্রেজকৃত ঋণের বিপরীতে যে বিপুল পরিমাণ পাট মিল গুদামে আছে বলে ব্যাংকে কাগজপত্রে রক্ষিত রয়েছে, বাস্তবে সেই গুদামে কোন পাটই নেই। এই টিম সরেজমিনে তদন্ত রিপোর্ট দেবার পর টনক নড়ে উর্ধ্বতন মহলের। এই সময় দুদক সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখায় সোনালী জুট মিলের ঋণের কাগজপত্র চেয়ে পাঠালে সোনালী জুট মিলের চেয়ারম্যান এস এম এমদাদুল হক উচ্চ আদালতে রীট করে ব্যাংক হতে কাগজপত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা আনেন। পরে দুদক উচ্চ আদালতের কাগজপত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেন।
সোনালী জুট মিলস মিল লিঃ কে সোনালী ব্যাংকের যে পরিচালনা পর্ষদ ঋণ প্রদানের সুপারিশ করেছে সেই একই পরিচালনা পর্ষদ বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপকে ঋণ প্রদান করেছিল। সোনালী জুট মিলের চেয়ারম্যান এস এম এমদাদুল হককে ব্যাংকপাড়ার অনেকেই মিনি হলমার্ক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জহুরুল ইসলাম গ্রুপের কাছ থেকে মিলটি ক্রয়কালে উত্তরা ব্যাংকের ৫৬ কোটি টাকা দেনা নিজের দায়িত্বে নিয়েছিলেন। সেই টাকা বর্তমানে সুদ আসলে ১০০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
অপরদিকে স্থানীয় বাজারে পাট গ্রহণ বাবদ তার ঋণ রয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকার ওপরে। উত্তরা ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকের ঋণ খেলাপীর পর বর্তমানে কুষ্টিয়ার রসিদ গ্রুপের কাছ থেকে ১২ হাজার মণ পাট গ্রহণ করে মিলটি চালু রেখেছেন।
সোনালী জুট মিলের ডিজিএম দেলোয়ার হোসেন ব্যাংক ঋণ এবং গুদামে পাট না থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কুষ্টিয়ার রসিদ গ্রুপের কাছে মিলটি ভাড়া দেয়া হয়েছে। তারা পাট সরবরাহ আনছে এবং সেই পাট দিয়ে উৎপাদন করে উৎপাদিত পণ্য নিজেরা নিয়ে যাচ্ছে।
দুদকের মামলায় বলা হয়েছে, সোনালী ব্যাংক, খুলনা করপোরেট শাখা থেকে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সোনালী জুটমিল কর্তৃপক্ষ প্রথম দফায় ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ, দ্বিতীয় দফায় ১৫ কোটি টাকা, তৃতীয় দফায় ৮ কোটি ৪৯ লাখ, পরবর্তীতে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ও ৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মামলা দায়ের পর্যন্ত সুদে-আসলে ১২৬ কোটি ৮২ লাখ ৯৩ হাজার ২৮২ টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ