ঢাকা, শুক্রবার 10 March 2017, ২৬ ফাল্গুন ১৪২৩, ১০ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রক্ষক যখন ভক্ষক

বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হওয়ার কারণে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে অনেক উপলক্ষেই। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, আটক বাণিজ্য এবং মাদকসহ অবৈধ পণ্যের ব্যবসা। এক শ্রেণীর পুলিশ সদস্য ফুটপাথের দোকানমালিক থেকে শুরু করে রিকশা ও ভ্যানগাড়ি চালক এবং ক্ষুদে ব্যবসায়ী পর্যন্ত সকলকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে চলেছে। পাশাপাশি রয়েছে আটক বাণিজ্য। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের গ্রেফতার করার এবং তাদের নামে মিথ্যা মামলা দেয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে সারাদেশেই। মাত্র কয়েকদিন আগে খোদ রাজধানীর গুলশান এলাকায় এরকম একটি ঘটনায় মোবাইল ফোনের কথোপকথনের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে সংবাদপত্রেও। সে ঘটনায় থানার উচ্চ ডদস্থ কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন। পুলিশের এই চাঁদাবাজির কবল থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও বাদ যাচ্ছেন না। কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও যেখানে সেখানে ওয়ারেন্ট ছাড়াই আটক করা হচ্ছে তাদের। পুলিশের হাতে আটক হওয়া ব্যক্তিরা মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেই তাদের কাছে মুক্তিপণের মতো নগদ টাকার দাবি জানানো হচ্ছে। ‘সেটিং’ বা দরকষাকষি শেষে মিটমাটও হচ্ছে টাকার পরিমাণের বিষয়ে। সে অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করে তবেই মুক্তি মিলছে আটকজনদের। কারো সঙ্গে নগদ টাকা না থাকলে তাদের স্বজনদের আনা হচ্ছে খবর দিয়ে। অনেককে আবার সময় বেঁধে টাকা দিয়ে যাওয়ার স্থান সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। বন্দুকযুদ্ধে জীবন হারানোর মতো ভয়ের কারণে যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। এভাবেই আটক বাণিজ্য চলছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলকায়। এর ফলে জনমনে প্রচ- আতংক আর ভয়-ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। 

মঙ্গলবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, নিজেদের এসব কার্যক্রমে পুলিশ সোর্স নামে পরিচিত ব্যক্তিদের ব্যবহার করছে। এই সোর্সরা শুধু নেশায় আসক্ত নয়, বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত অপরাধীও। তাদের নিয়েই পুলিশ টার্গেট বাছাই করে এবং পরে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বড় অংকের টাকা আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে মুখের প্রস্তাবে রাজি না হলে সোর্সদের সহযোগিতায় পুলিশ টার্গেট করা ব্যক্তিদের বাসা, দোকান বা অফিসে ইয়াবা জাতীয় নেশার সামগ্রী লুকিয়ে রাখে। পরে সময় ও সুযোগ বুঝে ঘেরাও করে সেগুলো উদ্ধারের নাটক মঞ্চায়ন করে। সেই সাথে গ্রেফতার করা হয় টাকা দিতে অসম্মত ব্যক্তিদের। এভাবেই সারাদেশে পুলিশের চাঁদাবাজি চলছে বলে রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে। রাজধানীর এবং অন্য কিছু এলাকার কয়েকটি ঘটনার উল্লেখও রয়েছে রিপোর্টে। সমাজের বিশিষ্টজনেরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় পুলিশের রাশ টেনে ধরার এবং এ ধরনের ঘটনায় দোষী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রকাশিত রিপোর্টে এক শ্রেণীর পুলিশের কথা বলা হলেও বাস্তবে সব মিলিয়েই পুলিশ বাহিনীতে অপরাধ প্রবণতা মারাত্মক আকার নিয়েছে এবং সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশের ব্যবহার। কারণ, পুলিশকে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই পুলিশও পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে যথেচ্ছভাবে। পুলিশের মধ্যে এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাদের দিয়ে যেহেতু সংবিধান ও আইন নির্দেশিত কর্তব্যের বাইরে সংকীর্ণ উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে সেহেতু তারা কোনো অপরাধে জড়িত হলেও শাস্তি দেয়ার নৈতিক বল ও অধিকার সরকারের থাকবে না। বাস্তবেও পুলিশের এই ধারণা সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচির কথাই ধরা যাক। হরতাল, মিছিল-সমাবেশ, পিকেটিং, মানব বন্ধন প্রভৃতি মানুষের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার হলেও পুলিশকে দিয়ে এসব কর্মসূচি ভ-ুল করে দেয়া হচ্ছে। অথচ এ ধরনের কর্মসূচিতে বাধা দেয়া গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার লংঘনের শামিল এবং বাধা দেয়াটা পুলিশের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু সরকারের সংকীর্ণ উদ্দেশ্যের কারণে পুলিশ দমন অভিযানে অংশ নিচ্ছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধাইয়ে বেড়াচ্ছে। বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গাড়িতে তুলেছে। নারী নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও পুলিশ চরম দুর্ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত এসব ছবি দেখে লজ্জায় মুখ ঢেকেছেন জনগণের সচেতন অংশ। মনে হয়েছে, দেশে গণতন্ত্র বা আইনের শাসন নেই। বাংলাদেশ বরং ফ্যাসিস্ট ও পুলিশ-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। 

নামে এক শ্রেণীর বলা হলেও পুলিশের প্রায় সব সদস্যই সরকারের দমন ও নির্যাতনের অভিযানে অংশ নিচ্ছে। এসবের পাশাপাশি পুলিশ কেবল বেআইনী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেই জড়িয়ে পড়ছে না, পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্বও নষ্ট হচ্ছে। সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পুলিশকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হলে জনগণের সেবক এই সংস্থার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। পুলিশকে জনগণ কখনো বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

এমন অবস্থা নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। আমরা মনে করি, পুলিশ বাহিনীকে তার সংবিধান ও আইন নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করতে দেয়া দরকার। ক্ষমতাসীনদের উচিত পুলিশকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দেখা এবং সেভাবেই তাদের ব্যবহার করা। পুলিশকে যদি দলীয় গু-া ও কর্মীর মতো ব্যবহার করার কার্যক্রম চলতে থাকে তাহলে পুলিশ শুধু তার পেশাদারিত্বই খুইয়ে ফেলবে না, একই সাথে জনগণের প্রতিপক্ষেও পরিণত হবে। দেশ ও জাতির জন্য এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আমরা তাই আশা করতে চাই, সরকার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখবে। কারণ, পুলিশের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জান-মালের হেফাজত করা এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। অন্যদিকে পুলিশকে সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে বলেই একদিকে এক শ্রেণীর পুলিশ সদস্য বেপরোয়া হয়ে উঠছে, রক্ষক হলেও তারা নিজেরাই ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে দেশে বেড়ে চলেছে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ও খুনসহ ভয়ংকর সব অপরাধ। এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। সরকারের উচিত পুলিশকে তার নিজের কাজ করতে দেয়া এবং অভিযোগের তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। তাহলেই পুলিশ সদস্যরা সংযত হবেন, দেশের অপরাধ পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে না

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ