ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রতিদিন লোকসান ১০ কোটি টাকা ॥ বেকার হয়ে পড়বে ৫০ হাজার ট্যানারি শ্রমিক

* ট্যানারী বন্ধের নির্দেশ আদালতের

এইচ এম আকতার : সর্বশেষ আগামী জুন মাসের মধ্যে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরে সময় বেধে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ট্যানারি বন্ধের নির্দেশ দিল আদালত। আদালতের এ রায়ে বিপাকে পড়েছে ট্যানারি মালিকরা। হঠাৎ করে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন ১০ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হবে উদ্যোক্তাদের।

 এ দফায়ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও বরাদ্দকৃত জায়গায় এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে ৫০ ভাগ। বাকি কাজ চার মাসে শেষ করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে বেকার হয়ে যেতে পারেন ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক। পাশাপাশি হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে বিদেশী ক্রেতা। প্লট পায়নি এমন ৪৫ কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সব ট্যানারি বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশের পর এমন আশঙ্কা করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তরা। পাশাপাশি সাভারে প্লট বরাদ্দ না পাওয়া ট্যানারির মালিকরা আশঙ্কা করছেন বিপুল ক্ষতির।

হাজারিবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর নিয়ে সময় যত গড়িয়েছে, দূষণ থেকে বিষাক্ত হয়েছে তত বুড়িগঙ্গার পানি। তবে সমাধান হয়নি খুব একটা। সব শেষ হাজারিবাগে থাকা ট্যানারিগুলো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সাথে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নের আদেশ। হাজারিবাগে কার্যক্রম চালানো ২’শরও বেশি ট্যানারির মধ্যে সাভারের প্লট বরাদ্দ পেয়েছে ১৫৫টি। এর মধ্যে আংশিক কাজ শুরু করতে পেরেছে মাত্র ৪৫টি ট্যনারি কারখানা। এমন ধীর গতির জন্য সরকরকেই দুষছেন ট্যানারি মালিকরা।

ট্যানারি মালিকরা বলছেন,সরকার প্লট দিলেও এখনও রেজিস্ট্রেশন দেয়নি। এতে করে অনেকেই তাদের উন্নয়ন কাজ শুরু করতে পারেনি। এসব ট্যানারি মালিক কিভাবে তাদের কারখানা স্থানান্তর করবেন। আর যারা প্লট রেজিস্ট্রেশন পেয়েছেন তারা আবারও অনেকেই গ্যাস বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি। 

তাদের অভিযোগ আমরা কোন ভাবেই সরকারকে বুঝাতে পারছিনা। সরকার আমাদের কথা শুনতে নারাজ। এতে করে এ শিল্প স্বমূলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তারা বলেন,সাভারে যেতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সরকার আমাদের প্লট না দিয়েই গায়ের জোরে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি এর কি হবে।

আমরা বার বার সরকারের কাছে প্লট চেয়েছি। কিন্তু সরকার আমাদের কোন প্লট নিচ্ছে না। সরকার আদালতের মাধ্যমে আমাদের হাত পা বেঁধে দিয়েছে। তাহলে আমরা কি করবো। এ শিল্পকে বাচাতে হলে সরকারকে অবশ্য আমাদের কথা শুনতে হবে।

এ ছাড়া হাইকোর্টের রায় কার্যকর হলে, প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তরা। অথচ হাজারিবাগে ব্যবসা করছে এমন ৪৫টির মতো ট্যানারি প্লট পায়নি সাভারে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা থেকে মোট রপ্তানি হয়েছে ১১৬ কোটি ডলার।

আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এখাত থেকে মোট রপ্তানি আয় ৭৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি কমারও আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমন বাস্তবতায় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিকের চাকরি হারানোর।

এব্যাপারে ট্যানারি এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, বরাদ্দ পাওয়া প্লটের এখনও রেজিস্ট্রেশন পাইনি। যারা রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে তারা গ্যাস বিদ্যুৎ পায়নি। তাহলে আমরা কিভাবে উৎপাদনে যাবো। আদালত যে রায় দিয়েছে তাদের আর এখানে থাকার কোন সুযোগ নেই। এতে করে বাধ্য হয়েই আমাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। এতে করে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন,অনেক অর্ডার এখনও এলসি খোলার অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় আদালতের এমন রায় এ শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাছাড়া যারা সাভারে প্লট পায়নি তারা যাবে কোথায়। তাদের ব্যাপারে আদালতের কোন নির্দেশনা নেই।

চামড়া ও পাদুকা মেলায় বাণিজ্যমন্ত্রী সর্বশেষ আগামী জুন মাসের মধ্যে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরে সময় বেধে দেয়। এ দফায়ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও বরাদ্দকৃত জায়গায় এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে ৫০ ভাগ। বাকি কাজ চার মাসে শেষ করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। 

২০০৩ সালে সরকার সাভারের হেমায়েতপুরে একটি পরিকল্পিত চামড়া শিল্প নগরী তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও বরাদ্দকৃত জায়গায় এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নিতে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে দফায় দফায় আল্টিমেটাম দিলেও এখনো সবগুলো কারখানা সরিয়ে নেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের তরফ থেকে চাপ প্রয়োগ করা হলেও এখনো অবকাঠামো নির্মাণ কাজ চলছে। কোনটির ৫০ শতাংশ, কোনটির ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরোপুরি ভাবে এখনো কোন বিল্ডিং এর কাজ শেষ হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময় বেধে দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় রাজধানীর মধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পের পরিবেশ দূষিত হয়েই চলছে।

এ পর্যন্ত ১৫৪ টি ট্যানারি স্থাপনের জন্য জমি হস্তান্তর করা হলেও এর মাত্র ৪৩টি শিল্প তৈরির কাজ চলছে। মাত্র ৫৩ টি ড্রামের কাজ শেষ হয়েছে। ১৫৪ টি কারখানার মধ্যে বিদ্যুৎ চেয়ে ১৩০ টি আবেদন করেছে, এখনো বাকি রয়েছে অনেক কারখানা। ৭৭ টি ট্যানারি এখনো ডিমান্ড লোডই কাটেনি। তাহলে কিভাবে আগামী চার মাসে শতভাগ কারখানা সাভারে স্তানান্তরে করা সম্ভব হবে?

এরই মধ্যে হাজারীবাগে ট্যানারি সরাতে চূড়ান্ত রায় দেন আদালত। এতে করে বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টরা সরেজমিন পরিদর্শন না করে কেবল আমলাদের কথা শুনে একের পর এক আল্টিমেটাম দিচ্ছেন। এতে করে মন্ত্রী ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। তার পরেও একের পর এক আল্টিমেটাম দিয়েই যাচ্ছে।

ট্যানারি মালিকদের কাছে সমস্যার কথা জানতে চাওয়া হলে তারা বলেন, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং গ্যাসের সমস্যার কারণ উল্লেখ করে বলেন, সচিবালয় থেকে বলা হয়েছে ট্যানারি স্থানান্তরের পরপরই গ্যাসের লাইন দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো তা করা হয়নি।

চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। এখনও সিইটিপি নির্মাণ কাজ বাকি রয়েছে ৪০ ভাগ। এ কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে এক বছরের মত। তাহলে আগামী জুনের মধ্যে কিভাবে সাভারে চামড়া কারখানা স্থানান্তর সম্ভব।

সরকার বলছে হাজারিবাগ থেকে চামড়া শিল্প স্থানান্তর না হলে আন্তর্জাতিক বাজার হারাবে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সরকারকে চাপ দিয়ে আসছে। কিন্তু সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর গতি হওয়ার কারণেই ব্যবসায়ীদের সাথে চলছে রশি টানাটানি। আদালতে একাধিক রায়ও হয়েছে। তারপরেও বহাল তবিয়তে রয়েছে ট্যানারি মালিকরা। সর্বশেষ আদালত রায়ে বলেন, আর কোন ট্যানারি হাজারিবাগে থাকতে পারবে না। এখনই কারখানাগুলোর সব গ্যাস,বিদ্যুৎ ও পানি লাইন কেটে দিতে হবে। এখানে আর কোন চামড়া প্রবেশ না করাতে পুলিশ প্রধানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছেন। সর্বশেষ অবস্থা জানতে আদালত নির্দেশও দিয়েছে। আদালতের এমন নির্দেশনায় বিপাকে পড়েছেন ট্যানারি মালিকরা।

তারা বলছেন আমাদের ট্যানারি বন্ধ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। গ্যাস বিদ্যুৎ পানি ছাড়া তো আর কারখানা চালানো যাবে না। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত এ শিল্পের জন্য অশনি সংকেত। অবস্থার কোন পরিবর্তন না হলে আন্তর্জাতিক বাজার হারাবে সরকার। যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ