ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারত যেভাবে প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করছে তা জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী -বিএনপি

গতকাল শুক্রবার বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন -সংগ্রাম

 

স্টাফ রিপোর্টার: প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য ভারত বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুসংবাদ নয়। ভারত যেভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী ও নিয়মবহির্ভূত। গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। 

সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভারতের সাথে প্রতিরক্ষার চুক্তির বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তার প্রতি দেশবাসীর উদ্বেগের সাথে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। ভারত বাংলাদেশ সরকারকে প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য যে চাপ দিচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুসংবাদ নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার কী ভূমিকা রাখবে এটিও খুব স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, ভারত যেভাবে চাপ সৃষ্টি করতে চায় তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী ও নিয়ম বহির্ভূত। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ‘ মেড ইন ইন্ডিয়া’ ছাপ মারতেই এই চুক্তির জন্য ভারত চাপ প্রয়োগ করছে বলে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ দানা বেঁধেছে। সংবাদ পত্রে এমনও খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, তিস্তা চুক্তির টোপ দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এধরণের চুক্তি হলে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। শ্রীলঙ্কাও এধরনের চুক্তি করেছিল, যার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ।

বিএনপির এ মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারত যে প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বলছে তাতে বাংলাদেশের নাগরিকদের খুবই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন তো নয়ই বরং গোটা জাতিকে গভীর হতাশা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলেছে। যেখানে বাংলাদেশের সীমান্ত এখন সমাধানহীন সহিংসতার ছোবলে রক্তাক্ত, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তরঞ্জিত সীমান্ত, যেখানে প্রতিদিন বাংলাদেশী নাগরিকদের পাখির মতো গুলী করে হত্যা করা হয়, চলছে অবিরাম নরমেধ যজ্ঞ, ভারতের সাথে আমাদের অভিন্ন নদীর পানির আধা লিটারও ন্যায্য হিস্যা আমরা পায়নি, ভারতের পানি আগ্রাসনে বাংলাদেশের ১২’শ নদী এখন বিলীন হয়ে ধু ধু প্রান্তরে পরিণত হয়েছে, সেখানে ভারত বাংলাদেশের স্বার্থে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করবে এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা যার ওপর দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা ন্যস্ত তারাই যদি চুক্তির দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তা হবে স্বাধীন দেশের জনগণের সাথে ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা। এধরনের রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে জনগণ তা দেশের স্বার্থে সকল শক্তি দিয়ে প্রতিহত করবে। এদেশের জনগণ বাংলাদেশকে সিকিম বা করদমিত্র রাজ্যের স্ট্যাটাসে অবনমিত করতে দিবে না।

 দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রিজভী বলেন, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলেছে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খেয়ালখুশি মতো ও বেআইনী গ্রেফতার, গুম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নির্মমভাবে হস্তক্ষেপ, বাংলাদেশে মানবাধিকারের প্রধান অন্তরায়। তবে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ঘুষ আদায়ের জন্য খেয়ালখুশি মতো গ্রেফতার, গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকারের আরও লঙ্ঘন হচ্ছে। সুশীল সমাজের অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারকে সীমিত করছে সরকার। 

তিনি বলেন, এসব থেকেই দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ সেটি বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু হুমকিবাজ আওয়ামী নেতারা আলাদীনের প্রদীপের ম্যাজিকের মতো সবকিছু উড়িয়ে দিতে চায়, সবকিছু অস্বীকার করে। কারণ নিজেদের অনাচারকে ঢাকতে ওদের হুমকি ছাড়া বলার আর কিছুই নেই। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয় নিয়ে যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে এটিই দেশের স্বাভাবিক চিত্র।গণতন্ত্র নেই বলেই সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা এবং যখন যা খুশি করার নীতির ওপর তারা দেশ চালাচ্ছে। টার্গেট একটাই, যেনতেন প্রকারে ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখা, এটাই তাদের কমপালসারি সাবজেক্ট। আর সেজন্য বিরোধী কণ্ঠকে নির্বাক করতে সরকারি যন্ত্রকে নির্বিচারে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর সেজন্যই সংবাদ মাধ্যমের ওপর সরকারের ধারালো তরবারি ঝুলিয়ে রাখা হয়। পুলিশ ভুয়া ওয়ারেন্ট নিয়ে নিরীহ লোককে আসামী বানিয়ে ধরতে যায়। পুলিশ মামলার সত্যাসত্য যাচাইয়ের চেয়ে আসামী গ্রেফতার করতেই এখন বেশি উৎসাহী। 

রিজভী বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে এতো বেশি আস্কারা দেয়া হয়েছে যে, তারা এখন মানুষের পল্লীতেও আগুন লাগায়। আওয়ামী লীগের এই শাসনামলে নারকীয় হত্যাকাণ্ড, রক্তস্রোতে দেশের এখন ছিন্নভিন্ন অবস্থা। উল্লেখিত মানবাধিকার বিষয়ক স্টেটমেন্টটি বিএনপির স্টেটমেন্ট নয়, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেটমেন্ট। হুমকি দিয়ে এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে বিপন্ন মানবাধিকার পুনরুজ্জীবনের জন্য, হত্যা, রক্তপাত বন্ধ করতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য দলমত নির্বিশেষে সকলকে দৃঢ়পদে এগিয়ে আাসার আহবান জানাচ্ছি।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বিএনপির এ মুখপাত্র বলেন, বর্তমান সিইসি কুমিল্লা গিয়ে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বুলি শুনিয়ে আস্থা অর্জনের কথা বলেছেন। অথচ সামান্য মাত্র কয়টা উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে যেভাবে কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতি হয়েছে, যেভাবে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে, যেভাবে মারধর করে বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে তার উত্তর তিনি কি দিবেন? শুধু তাই নয় তিনি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো নির্বাচনেও সর্বনি¤œ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল। সুতরাং তিনি ব্যর্থতা দিয়েই যাত্রা শুরু করলেন। আসলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আস্থা অর্জনের জন্য, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য নয়। ব্রিফিংয়ে রিজভী আহমেদ পিরোজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে পুলিশ কর্তৃক হামলা ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ