ঢাকা, শনিবার 11 March 2017, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পুলিশের গাড়ি চাপায় মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু ॥ গাড়িতে আগুন ॥ জনতার হাতে এক কর্মকর্তাসহ চার পুলিশ আটক

কুমিল্লায় পুলিশের গাড়ি চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহতের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ইনসেটে নিহত যুবক ও তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল

 

কুমিল্লা দক্ষিণ সংবাদদাতা : কুমিল্লায় পুলিশের গাড়ি চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী আবু তাহের (২৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে জেলার সদর থানার বালুতোপা এলাকার চাঁপাপুরে ভারত সীমান্তমুখী একটি রাস্তায় অন্য একটি থানা পুলিশের গাড়ি চাপায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা পুলিশের ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাসে আগুন দিয়েছে। এসময় স্থানীয়রা এক কর্মকর্তাসহ চার পুলিশ সদস্যকে আটক করে। পরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই জহিরুল ইসলাম পালিয়ে গেলেও কনস্টেবল মিজান, খোরশেদ ও কামাল নামে তিন জনকে সকাল ৯টায় সদর মডেল থানা পুলিশে সোপর্দ করা হয়। নিহত মোটরসাইকেল আরোহী আবু তাহের উপজেলার সীমান্ত এলাকার শাহপুরের আবুল কাশেমের পুত্র।

পুলিশ জানায়, সদর দক্ষিণ মডেল থানার এএসআই জহিরের নেতৃত্বে পুলিশ রাস্তায় টহল দিয়ে ভোরে থানায় ফেরার পথে সদর উপজেলার চাঁপাপুর এলাকায় এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ধাওয়া করলে তিনি রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে নিহত হন। এ সময় পুলিশের ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে আটকে যায়। এ ঘটনায় সকালে উত্তেজিত জনতা ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কনস্টেবল কামাল ও খোরশেদ ও মিজানকে আটক করে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক পুলিশ কনস্টেবলদের উদ্ধার করেছে। পুলিশের আরেকটি সূত্র বলছে, ভোর বেলা পুলিশের গাড়ির চালক ঘুমঘুমভাবে থাকায় মোটরসাইকেলটিকে দেখতে পায় নি। এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকাল হয়ে যাওয়ায় লোকজন চলে আসায় তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকে জনতার কবল থেকে উদ্ধার হওয়া দুই পুলিশ সদস্যকে ঘটনার বিষয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানা পুলিশের একটি মাইক্রোবাস এক মোটরসাইকেল আরোহী যুবককে ধাওয়া করে। এ সময় বালতুপা চাঁপাপুর এতিমখানার আমান ম্যানশনের পাশের মোড়ে মোটরসাইকেলটিকে মাইক্রোবাস চাপা দিলে রাস্তার পাশে পড়ে গিয়ে ওই যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ সময় পুলিশের গাড়িটি রাস্তার পাশে গাছের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে পাশে পড়ে যায়। পুলিশ সদস্যরা মুঠোফোনে গাড়ি তোলার জন্য ‘র‌্যাকার’ আসতে বলে এবং নিহত যুবকের লাশ অন্তত ২০০ ফুট দূরে ফসলি জমিতে নিয়ে ফেলে দেয়। এ ঘটনা দেখে এলাকাবাসী ছুটে আসলে পুলিশ তাদেরকে হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দূরে সরে যেতে বলে। ‘র‌্যাকার’ এসে মাইক্রোবাসটি তোলার পর পুলিশ সদস্যরা চলে যেতে চাইলে বিক্ষুব্ধ মানুষ পুলিশকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে আটক করে। এ সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা পালিয়ে যায় এবং পুলিশের তিন সদস্যকে আটক করে জনতা। খবর পেয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের হাতে পুলিশ সদস্যদের সোপর্দ করা হয়।

ঘটনার পর কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর সালেহীন ইমন, পিবিআই পুলিশ সদস্য, র‌্যাব-১১ এর সদস্যরা, ফায়ার সার্ভিস এবং ৬নং জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মামুনসহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। উত্তেজিত সাধারণ মানুষ পুলিশের সামনেই তাদের ব্যবহৃত মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

৬নং জগন্নাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, প্রায়ই পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে আসছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে অনেক বার জানিয়েছি।

সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: নজরুল ইসলাম জানান, লক্ষীপুর এলাকায় আমাদের পুলিশ সদস্যরা এএসআই জহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ওয়ারেন্টের আসামী ধরার অভিযান ছিল। অভিযান শেষে আসার পথে গাড়ির চালক কুয়াশার কারণে এবং ঘুমঘুম ভাব থাকায় ভালভাবে দেখতে পায়নি ফলে মোটরসাইকেল ও পুলিশের ব্যবহৃত গাড়িটি রাস্তা থেকে নিচে পড়ে যায়। মৃত ব্যক্তিটি দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ২শ হাত দূরে ইরি ক্ষেতে গিয়ে পড়ে যায়। স্থানীয় জনতা পুলিশের ব্যবহৃত গাড়িটি পুড়িয়ে ফেলে। পুলিশের ৪ সদস্যের মধ্যে তিনজন পুলিশ সদস্য কোতয়ালি মডেল থানায় আছে। পুলিশের অফিসার এএসআই জহিরুল ইসলাম সামান্য আহত হন এ কারণে তিনি হাসপাতালে চলে যান। তিনি কুমেক হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

পুলিশের এ বক্তব্য প্রসঙ্গে স্থানীয় লোকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যদি দুর্ঘটনা হয় তাহলে পুলিশ সদস্যরা মোটরসাইকেল আরোহীকে উদ্ধার না করে দুই শত গজ দূরে ধান ক্ষেতে ফেলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে কেন? তারা তো যুবকটিকে উদ্ধার করার কথা। আসলে পুলিশ যুবকটিকে ধাওয়া করে মোড়ে এসে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। স্থানীয়রা আরো বলেন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সদর দক্ষিণ থানা পুলিশের সদস্যরা সব সময় বেপরোয়া মনোভাব দেখায়। তারা স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িয়ে অনেক সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে।

 জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ঘটনার পর-পর পুলিশের অন্যান্য সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। পুলিশ সদস্যদের টহলকৃত গাড়ির চাপায় যে ব্যক্তি মারা গিয়েছে তাকে আমরা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করেছি। এদিকে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোন পুলিশ সদস্য এই ঘটনায় দোষী প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাদের কঠিন বিচার করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ